Somoy TV
নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলে বোরো ফসলের গলার কাঁটা এখন ফসল রক্ষা বাঁধ। শতশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব বাঁধেই দেখা দিয়েছে নানা বিড়ম্বনা। শেষ রক্ষা হচ্ছে না কৃষকের। উল্টো দিনে দিনে ভরাট হয়েছে জলাশয়। ফলে অল্প বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের পানিতেই দেখা দিচ্ছে ফসল ডুবির শঙ্কা।কৃষক ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু খনন করা হয়নি কোনো জলাশয়। এতে কিছু মানুষ লাভবান হলেও অপচয় হয়েছে সরকারি অর্থ। উল্টো ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে কৃষকরা এখন দিশেহারা।অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, সমীক্ষা চলছে। পাশাপাশি নদ-নদী, খাল-বিল খননের তালিকা প্রণয়নের কাজও চলছে।জেলার ১০ উপজেলার অধিকাংশ এলাকা হাওড়বেষ্টিত। এর মধ্যে ৬টি উপজেলা হাওড়াঞ্চলের আওতায়। মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা, আটপাড়া ও কেন্দুয়ার হাওড়গুলোতে মূলত বোরো ফসল উৎপাদিত হয়। এসব ফসল রক্ষায় বন্যা নিয়ন্ত্রণে বেড়িবাঁধের প্রয়োজন হয়। সে কারণেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১১ বছরে মোট ১ হাজার ৫৭৬ দশমিক ২২৯ কিলোমিটার বাঁধে ১ হাজার ২৪০টি পিআইসির মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে ১৭৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। বছর বছর বেড়েছে পিআইসির সংখ্যাও।এছাড়া চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার হাওড়াঞ্চলে ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯১টি পিআইসির মাধ্যমে ১৪৬ দশমিক ১২ কিলোমিটার বাঁধের কাজ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।পরিবেশ গবেষণা সংস্থা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩০টি পিআইসির মাধ্যমে ১২ দশমিক ৯৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২১২ দশমিক ১ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত ও নির্মাণ করা হয়। পরের বছর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পিআইসি বেড়ে ৪১টি হয়ে ২৬৬ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার বাঁধে ব্যয় হয় ১৮ দশমিক ৭৮৭ লাখ টাকা।সে বছরই পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন হাওর অসময়ে তলিয়ে যায়। কিন্তু কেন এমনটি ঘটল, তার কোনো সমীক্ষা না করেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শনের পর কাবিখা প্রকল্পে বাঁধের বরাদ্দ কোটিতে উন্নীত করা হয়।এরপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭৩টি পিআইসির মাধ্যমে ১০৫ দশমিক ১৬৯ কিলোমিটার বাঁধে ব্যয় হয় ১৪ কোটি ৭৮ দশমিক ৭৬ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০৬টি পিআইসি হয়ে ১১২ দশমিক ৫৪৯ কিলোমিটার বাঁধে ব্যয় হয় ১৫ কোটি ৬১ দশমিক ৩৯ লাখ টাকা।এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১২২টি পিআইসির মাধ্যমে ৮০ দশমিক ৪১১ কিলোমিটার বাঁধ দেখিয়ে ব্যয় হয় ১৪ কোটি ৩৩ দশমিক ৬ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১২৪টি পিআইসির মাধ্যমে ১০১ দশমিক ২১ কিলোমিটার বাঁধে ব্যয় হয় ১৪ কোটি ৫১ দশমিক ৬৫ লাখ টাকা।আরও পড়ুন: হাইমচরে খেলার মাঠ ও নদী রক্ষা বাঁধ গিলে খাচ্ছে অবৈধ ড্রেজার২০২১-২২ অর্থবছরে ১৬৬টি পিআইসির মাধ্যমে ১৮১ দশমিক ৫৩ কিলোমিটার বাঁধে ব্যয় হয় ২৫ কোটি ৩১ দশমিক ৪৯ লাখ টাকা। ওই বছর আবারও ভয়াবহ বন্যা হয়। শুধু ফসল নয়, ডুবে যায় নগরও। সিলেট অঞ্চলসহ কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার গ্রাম-শহর পানিতে একাকার হয়ে পড়ে।তবে এরপরও নদী খনন বা দখল উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।এদিকে, একজনকে সভাপতি করে ৭ সদস্যবিশিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন চলতেই থাকে। এসব কমিটি নিয়ন্ত্রণ করেন দলীয় নেতাকর্মীরা। নামে-বেনামে চলে কাজ, বাড়তে থাকে বাঁধের খরচও।২০২২০-২৩ অর্থবছরে ২০৬টি পিআইসির মাধ্যমে ২১৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার বাঁধে ব্যয় হয় ৪৩ কোটি ৮ দশমিক ৬৯ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৮১টি পিআইসির মাধ্যমে ১৫৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার বাঁধে ব্যয় হয় ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৯১টি পিআইসি করে ১৪৬ দশমিক ১২০ কিলোমিটার বাঁধে ব্যয় হয় ৩১ কোটি ৭৮ দশমিক ৮৯ লাখ টাকা।পরিবেশকর্মী ও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, হাওড়ের যে উঁচু-নিচু ভূমির বৈশিষ্ট্য ছিল, তা এখন আর নেই। জলাশয়ও সমতল হয়ে গেছে। এতে কৃষকেরই বেশি ক্ষতি হয়েছে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এ পর্যন্ত বাঁধের কারণে ফসল রক্ষা হয়েছে। তবে এখন জলাবদ্ধতাও তৈরি হয়েছে। সমীক্ষা চলছে। আগামীতে ফসল রক্ষা বাঁধের খরচ কমে আসবে। পাশাপাশি নদ-নদী, খাল-বিল খননের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। আমরা চেষ্টা করছি অর্থ ব্যয় কমিয়ে আনতে।’
Go to News Site