Collector
সাইয়েদ জামালুদ্দিন আফগানির জীবন ও চিন্তাধারা | Collector
সাইয়েদ জামালুদ্দিন আফগানির জীবন ও চিন্তাধারা
Jagonews24

সাইয়েদ জামালুদ্দিন আফগানির জীবন ও চিন্তাধারা

ইলিয়াস মশহুদ আধুনিক মুসলিম রেনেসাঁ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন আফগানি। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই মহান দার্শনিক, সমাজসংস্কারক ও রাজনীতিবিদ প্যান-ইসলামিজমের প্রবক্তা হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে ইসলামি চিন্তাধারার সংস্কারই ছিল তার জীবনের মূল লক্ষ্য। জন্ম ও শৈশব সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন আফগানি ১৮৩৮ সালে আফগানিস্তানের কাবুলের নিকটবর্তী আসাদাবাদ নামক স্থানে এক সম্ভ্রান্ত সাইয়্যেদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সাইয়্যেদ সফদর হুসাইন ছিলেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁর বংশপরম্পরা ওমর ইবনে আলী ইবনে জাইনুল আবেদিন ইবনে হুসাইন ইবনে আলী ইবনে আবু তালিব পর্যন্ত পৌঁছায়। (হাকিকাতু জামালিদ্দীন আফগানি, আব্দুন নাঈম হাসানাইন: ৯৫) শিক্ষাদীক্ষা তার প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা ইরানের কাজবিন শহরে। এরপর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি তেহরান ও ইরাক সফর করেন। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই আফগানি কোরআন, হাদিস, ফিকহ, মানতিক (তর্কশাস্ত্র), দর্শন, গণিত এবং চিকিৎসাবিদ্যায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। আরবি ও ফারসি ভাষায় তাঁর দখল ছিল অসাধারণ। তাঁর শিক্ষকদের অধিকাংশই ছিলেন শিয়া আলেম। যেমন আগা খান সাদিক, শায়খ মুরতাজা আনসারি, কাজি বাশার, হাফিজ দারাজ, হাবিবুল্লাহ কান্দাহারি প্রমুখ। কেউ কেউ তাঁকে কট্টর ইসনা আশারিয়া শিয়া আখ্যায়িত করেছেন। তবে জামাল উদ্দিন আফগানি তার খাতিরাত গ্রন্থে নিজেকে হানাফি ও সুন্নি মতাদর্শের অনুসারী দাবি করেছেন। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ঠিক আগে তিনি ভারতে আসেন এবং প্রায় এক বছর অবস্থান করেন। এখানে তিনি ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য-বিজ্ঞান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করেন। ভারতীয় মুসলমানদের দুরবস্থা এবং ব্রিটিশদের দমননীতি দেখে তাঁর মনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা জন্ম নেয়। আফগানিস্তানের রাজনীতিতে ভূমিকা ভারত থেকে মক্কা হয়ে তিনি নিজ দেশ আফগানিস্তানে ফিরে যান এবং আমীর দোস্ত মুহম্মদের দরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তবে আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তিনি বেশিদিন সেখানে থাকতে পারেননি। ১৮৬৮ সালে তিনি আফগানিস্তান ত্যাগ করে ভারতের পথে রওয়ানা হন। জামাল উদ্দিন আফগানির জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় শুরু হয় মিশরে। ১৮৭১ সালে তিনি মিশরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কায়রোর বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে তিনি এক বিপ্লবী পরিবর্তনের সূচনা করেন। তাঁর বিখ্যাত শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুফতি মুহাম্মদ আবদুহ, যিনি পরবর্তীতে মিশরের প্রধান মুফতি হন এবং আধুনিক ইসলামি চিন্তাধারার প্রবক্তা হিসেবে পরিচিতি পান। আফগানি মুসলমানদের শেখাতেন যে, ইসলাম একটি গতিশীল ধর্ম এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে এর কোনো বিরোধ নেই। তার প্রভাবে মিশরে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, যা ব্রিটিশদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ১৮৭৯ সালে তাকে মিশর থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি ভারত, লন্ডন ও প্যারিস ভ্রমণ করেন। প্যারিসে অবস্থান ও আল-উরওয়াতুল-উসকা প্যারিসে অবস্থানকালে ১৮৮৪ সালে তিনি ও মুহাম্মদ আবদুহ মিলে আল-উরওয়াতুল-উসকা নামক একটি আরবি সাময়িকী প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম বিশ্বের ওপর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন হস্তক্ষেপের স্বরূপ উন্মোচন করা এবং মুসলিম জাতিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো। পত্রিকাটি যদিও মাত্র ১৮টি সংখ্যা প্রকাশের পর ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞার কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবুও এটি মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহলে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্যান-ইসলামিজম জামাল উদ্দিন আফগানি বিশ্বাস করতেন, মুসলিম দেশগুলো আলাদা আলাদাভাবে শক্তিশালী হওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, খেলাফতের পতাকাতলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ হওয়াই হলো মুক্তির একমাত্র পথ। এই চিন্তাধারাই ‘প্যান-ইসলামিজম’ নামে পরিচিত। তিনি তুরস্কের সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের আমন্ত্রণে ইস্তাম্বুলে যান এবং সেখানে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করেন। চিন্তাধারা ও মতবাদ আফগানি মনে করতেন, ইসলামের সব আকিদা ও মতাদর্শ সুস্থ মস্তিষ্কের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ১৮৮১ সালে তিনি বস্তুবাদ খণ্ডনে আর-রাদ্দ আলাদ দাহরিয়্যিন নামে ফারসি ভাষায় একটি গ্রন্থ রচনা করেন। প্রথমদিকে তিনি বিবর্তনবাদ এবং ডারউইনীয় মতবাদের ঘোর বিরোধী থাকলেও পরে প্রাণীর ক্ষেত্রে তিনি বিবর্তনবাদ স্বীকার করতেন। তবে মানুষের ব্যাপারে বিবর্তনবাদ স্বীকার করতেন না। জামাল উদ্দিন আফগানি ঐশী ধর্মগ্রন্থসমূহ গবেষণা ও অধ্যয়নের প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। এ কারণে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শিষ্যদের মধ্যে অনেক ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টান ছিল। এদের মধ্যে ইয়াহুদি ইয়াকুব সানু, খ্রিষ্টান আবু নাজজারা ও সালিম আনহুরির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ধর্মীয় সহনশীলতার এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি দীর্ঘ সময় ফ্রিম্যাসনরির সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি শিয়া-সুন্নি ঐক্যের প্রবক্তাও ছিলেন এবং একে সময়ের অন্যতম দাবি মনে করতেন। সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন আফগানি মূলত একজন সংগঠক ও রাজনীতিক ছিলেন। কিছু রচনা ও বক্তব্য ছাড়া তাঁর তেমন গবেষণাকর্ম পাওয়া যায় না। তবে কোরআনের কিছু আয়াতের তাফসির তিনি করেছেন। সমালোচনা সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন আফগানির পক্ষে যেমন আলেমদের লেখালেখি রয়েছে, তেমনি বিপক্ষেও অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তার সম্পর্কে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ ও রচনা পড়লে যে কারও মনে হবে, সুফিদের কাওয়ালি, মিউজিক এবং নৃত্যে তার বেশ আগ্রহ ছিল। এ ছাড়া ওয়াহদাতুল উজুদ ও ইসলামের যুক্তিমূলক ব্যাখ্যার প্রভাবও তাঁর মধ্যে ছিল প্রকট। এসব কারণে আরবের অনেক সালাফি আলেম তার সমালোচনা করেছেন। নবুওয়াত অর্জিত বিষয় হওয়া, প্রাণিজগতে বিবর্তনের ধারণা-বিশ্বাস, ভাষ্কর্য বৈধ হওয়া, কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের তাফসিরে বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে প্রমাণরূপে উপস্থাপন প্রভৃতি মতেরও সমালোচনা করেছেন তার সামসময়িক আলেমরা। এসব মত থেকে তিনি সরে এসেছিলেন কি না তা জানা যায় না। মৃত্যু জামাল উদ্দিন আফগানি জীবনের শেষ কয়েক বছর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনেকটা নজরবন্দি অবস্থায় কাটান। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১৮৯৭ সালের ৯ মার্চ তিনি মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। তাঁকে ইস্তাম্বুলে সমাহিত করা হলেও ১৯৪৪ সালে তাঁর দেহাবশেষ আফগানিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনরায় সমাহিত করা হয়। (তাহরিকে তাজাদ্দুদ আওর মুতাজাদ্দিদীন, ড. মুহাম্মদ জুবাইর: ১৮-২০) ওএফএফ

Go to News Site