Collector
হাসপাতাল ভবন আছে, সেবার কার্যক্রম নেই | Collector
হাসপাতাল ভবন আছে, সেবার কার্যক্রম নেই
Jagonews24

হাসপাতাল ভবন আছে, সেবার কার্যক্রম নেই

মো. শাহজাহান (৬১)। কোমর থেকে পা পর্যন্ত ব্যথা। হাঁটতে পারেন না। ট্রলিতে শোয়া। ভাই ও মেয়ে মিলে কুমিল্লা শহর থেকে রাজধানীর আগারগাঁও এলাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। ১১ এপ্রিল সকালে টিকিট কেটে অপেক্ষা করেন আবাসিক চিকিৎসকের (আরপি) জন্য। কয়েকদিন ধরেই আসছেন, তাদের ভর্তি করতে হবে। কিন্তু সিট ফাঁকা পাচ্ছেন না।  ২২ বছর বয়সী মারুফা। স্ট্রোক করেছেন। ১০ এপ্রিল এসেছেন নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে। কিন্তু সিট না থাকায় ভর্তি হতে পারেননি। ট্রলিতে করে পরদিন তাকে নিয়ে বসে ছিলেন ভাই আলামিন। তিনি বলেন, ‘গতকাল (১০ এপ্রিল) সিট পাই নাই। আজও আরপির রুমে টিকিট জমা দিয়েছি। সিট খালি নাই। তবে, চিকিৎসা দিয়েছেন। ভালো হয়ে যাবে বলছেন।’ হুইল চেয়ারে ঢাকার ডেমরা থেকে এসেছেন আব্দুর রব (৬৯)। ১০৭ নম্বর রুমের সিরিয়ালে আছেন। তার সন্তান জিহাদ জানান, সকালে এসেছেন। দুপুর ১টায়ও সিরিয়ালে। গত সপ্তাহেও এসেছিলেন, সিরিয়াল থাকে। তবে, শেষ পর্যন্ত দেখানো যায়।   শাহজাহান, মারুফা বা আব্দুর রব শুধু নন, এমন ২ হাজার ৬৫০ জন রোগী গত ১১ এপ্রিল নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভিড় করেন। দুপুর ১টার পর হাসপাতালের আউটডোর খালি হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও মানুষে গিজগিজ করছিল। বিশেষ করে আরপি-আরএসের রুমের সামনে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। আরও পড়ুনহাম উপসর্গে রামেক হাসপাতালে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ ছাড়ালোবান্দরবানে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যুসরকারি হাসপাতালের রেফারে রোগীদের পরীক্ষায় ছাড় দেবে ডায়াগনস্টিক সেন্টার  হাসপাতালটির আবাসিক চিকিৎসক ডা. মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, আউটডোরের ২ হাজার ৬৫০ রোগীর বাইরেও ১১ এপ্রিল সারাদিন জরুরি বিভাগে ৩৫০ জন সেবা নিয়েছেন এবং ইনডোরে ৫০০ রোগী ভর্তি থেকে সেবা নিচ্ছেন।   হাসপাতালের দায়িত্বরতরা বলছেন, এটি একদিনের চিত্র নয়। প্রতিদিনই এমন রোগীর চাপ থাকে। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে দৈনিক নতুন রোগী আসে দুই থেকে আড়াই হাজার। যাদের মধ্যে শতাধিক থাকেন এমন যাদের ভর্তি করা জরুরি। কিন্তু সিট খালি না থাকায় ভর্তি করা যায় না।  রাজধানীর নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের পুরোনো ভবনে ভিড় করেছেন রোগীরা/ছবি-জাগো নিউজ নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে যখন এমন রোগীর চাপ, তখনও পাশেই পড়ে আছে হাসপাতালটির ১৫তলা বিশিষ্ট আরেকটি আধুনিক ভবন। গত বছরের ডিসেম্বরে হস্তান্তর এবং উদ্বোধন হলেও জনবলসহ নানাবিধ সংকটে চালু করা যাচ্ছে না।  ১১ এপ্রিল ভবনটিতে দেখা গেছে, প্রতিটি ফ্লোরে আলো জ্বলছে। কিন্তু বিভিন্ন রুমের সামনে কাজের সাইনবোর্ড আছে। ভেতরে ফার্নিচারও নেই। মানুষও নেই। কাজও নেই। পাওয়া গেলো একজন লিফটম্যান ও একজন সিকিউরিটি গার্ড। কথা প্রসঙ্গে লিফটম্যান জানিয়েছেন, তিনিও হাসপাতালের কেউ নন। লিফট কোম্পানির লোক। স্বাস্থ্য সচিব আসবেন বলে তাকে আনা হয়েছে। ওপরে উঠতে চাইলে নিয়ে যেতে পারেন।  আরও পড়ুনঠেলাঠেলিতে ৩ বছর পার, শত মৃত্যুর পরও চালু হয়নি রাজশাহী শিশু হাসপাতালহাম প্রতিরোধে গলিতে গলিতে প্রচারণা চালাতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রীজনবল সংকট-অর্থ বরাদ্দে আটকা রংপুরের শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম  হাসপাতালের নিরাপত্তা রক্ষীও বলছেন, পুরো ভবনের শুধু মাইনাস টু ফ্লোরে রেডিওলজির পরীক্ষাগুলো করা হয়। আর বাকি সব ফ্লোর ফাঁকা। এখনও কার্যক্রম শুরুই হয়নি। এনিয়ে হাসপাতালটির পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তিনি সেমিনারে আছেন। পরে দফায় দফায় মুঠোফোনে চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। ৮০ হাসপাতাল ভবন ব্যবহার অযোগ্য! গত ৮ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস’র ৫০০ শয্যার নতুন সম্প্রসারণ ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান সতর্ক করে বলেছিলেন, জনবল ও বায়োমেডিকেল সাপোর্ট–সংকটের কারণে দেশজুড়ে নবনির্মিত প্রায় ৮০টি হাসপাতাল ভবন এখনো ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আনা যায়নি। নতুন ভবন নির্মাণই শেষ কথা নয়; সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত সহায়তা ও জনবল স্থাপন না হলে উন্নত অবকাঠামোও অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র জাগো নিউজকে নিশ্চিত করে, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জনবলসহ নানা সংকটে ৬১টি ভবনের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। শিশুরা ধুঁকছে, ঠায় দাঁড়িয়ে ৬ শিশু হাসপাতাল!  বিশেষ সহকারীর কথাটিই সত্য হতে যাচ্ছে। শুধু নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাসপাতাল ভবন করলেও শুরু করেনি কার্যক্রম। বিশেষ করে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবসহ নানাবিধ জটিলতায় শিশু রোগীর চাপ আছে হাসপাতালগুলোতে। বেড পাওয়া যাচ্ছে না। আইসিইউ সংকটে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছেই। এমতাবস্থায়ও নানা কারণে চালু করা যায়নি দেশের ছয়টি বিভাগে ছয়টি শিশু হাসপাতাল। আরও পড়ুনমায়ের কোলেই নিশ্বাসের লড়াই, হাম উপসর্গ নিয়ে ঘণ্টায় এলো ১৩ শিশুরামেকে আইসিইউ সংকটে মার্চেই ২২৯ মৃত্যু, শিশু ৯১মায়ের কোলেই নিশ্বাসের লড়াই, হাম উপসর্গ নিয়ে ঘণ্টায় এলো ১৩ শিশু  এগুলো হলো- রাজশাহী শিশু হাসপাতাল, খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল, রংপুর শিশু হাসপাতাল, বরিশাল শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা শিশু হাসপাতাল ও সিলেট জেলা হাসপাতাল। এগুলোর নির্মাণে সরকার এখন পর্যন্ত ৩২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রসহ (এনআইসিইউ) মোট শয্যা রয়েছে ১ হাজার ৫০টি। কোনো হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ছয় বছর আগে, কোনোটি ১০ মাস আগে। জনবল সংকটে ডিএনসিসির হাজার শয্যার হাসপাতালও হামের জন্য বরাদ্দ করা রাজধানীর ‘ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালটিও তার সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবহার হচ্ছে না। প্রতিদিন এখানে এসেও রোগী ফিরে যাচ্ছে শয্যার অভাবে। হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার সময় বলা হয়েছিল, ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গ হলে রোগীদের জন্য ২১২টি আইসিইউ, ২৫০টি এইচডিইউ ও ৫৪০টি আইসোলোটেড হাই কেয়ার রুম থাকবে। ৫০০ জনেরও বেশি করোনা রোগীকে একসঙ্গে উচ্চপ্রবাহের অক্সিজেন সরবরাহ করা যাবে। অর্থাৎ ১০৫৪ শয্যার হাসপাতালটি এখনও ৩৫০ শয্যার সার্ভিস দিচ্ছে। জনবল ও উপায় উপকরণের চরম অভাব। আরও পড়ুনঘরে ঘরে উপসর্গ নিয়ে ঘুরছে শিশুরা, উদাসীনতায় বাড়ছে হাম হাম যে পর্যায়ে আছে, কমতে সময় লাগবে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাহামের উপসর্গ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে আরও ২৬ শিশু ভর্তি  হাসপাতালটির সহকারী পরিচালক ডা. আসিফ আহমেদ হাওলাদার জানিয়েছেন, তাদের ১০৫৪ বেডেই সেবা দেওয়া সম্ভব। তবে জনবল ও আনুষঙ্গিক কারণে এখন পর্যন্ত ৩৫০ বেডে চিকিৎসা চালাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত রোগীর চাপ বাড়ছে। তারা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্সসহ জনবল এবং অন্যান্য বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে চাহিদা দিয়েছেন। রাজধানীর নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের পুরোনো ভবনে আবাসিক সার্জনের রুমের সামনে অপেক্ষমাণ ভর্তিচ্ছু রোগীদের ভিড়/ছবি-জাগো নিউজএনিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একাধিক দিন স্বশরীরে গেলেও নাম প্রকাশ করে কেউ বক্তব্য দিতে চাননি। অধিদপ্তরের পরিচালকরা বলছেন, এগুলো পরিকল্পনা ও প্রশাসনের কাজ। পরিকল্পনা বিভাগ বলছে, কিছু হাসপাতাল হস্তান্তর হয়েছে। কিছু কাজ চলমান। হস্তান্তরের পর আমাদের দায়িত্ব থাকে না। প্রশাসন বলছে, কিছু গ্যাপ ছিল। আমরা চেষ্টা করছি। এগিয়ে নিতে।  এসইউজে/এমআরএম/এমএমএআর/ এমএফএ

Go to News Site