Jagonews24
২০১৫ সালের ১৮ জুন, মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক হয় দুর্দান্ত এক প্রতিভাবান উইকেটরক্ষক ব্যাটারের। এরপর আজ ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল, তরুণ সেই ব্যাটার আর তরুণ নেই। হোম অব ক্রিকেটেই খেলতে যাচ্ছেন নিজের শততম ওয়ানডে ম্যাচ। বলছি, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ব্যাটার লিটন কুমার দাসের কথা। সময়ের হিসেবে ১০০ ওয়ানডে খেলতে লিটনের লাগলো ১০ বছর ১০ মাস ২ দিন। এই সময়ে লিটন কি পেরেছেন নিজেদের প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন করতে! এই সময়ে যেমন বেশ কিছু দুর্দান্ত ইনিংস আছে তার, ঠিক তেমনি আছে ধারাবাহিক হতে না পারার আক্ষেপও। বাংলাদেশের হয়ে লিটনের আগে ১৩ জন ১০০ বা তার বেশি ওয়ানডে খেলেছেন। সবচেয়ে বেশি ২৭৪ ম্যাচ খেলেছেন মুশফিকুর রহিম। এছাড়া সাকিব আল হাসান ২৪৭, তামিম ইকবাল ২৪৩, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ২৩৯, মাশরাফি বিন মুর্তজা ২১৮, মোহাম্মদ আশরাফুল ১৭৫, আব্দুর রাজ্জাক ১৫৩, খালেদ মাসুদ পাইলট ১২৬, মোহাম্মদ রফিক ১২৩, মোস্তাফিজুর রহমান ১১৯, মেহেদী হাসান মিরাজ ১১৮, হাবিবুল বাশার সুমন ১১১ ও রুবেল হোসেন খেলেছেন ১০৪ ওয়ানডে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চলতি সিরিজে প্রথম ম্যাচ হেরে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সিরিজে টিকে থাকতে আজ জয়ের বিকল্প নেই টাইগারদের। এমন বাঁচা মরার লড়াইয়েই নিজের শততম ওয়ানডে খেলতে নামবেন লিটন। আর এমন ম্যাচে তার কাছ থেকে ম্যাচজয়ী ইনিংসই তো প্রত্যাশা সবার। সবমিলিয়ে এক দশকের ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত লিটন খেলেছেন ৯৯ ম্যাচ। এ সময়ে বাংলাদেশ নেমেছে ১৫৬ ম্যাচে। অর্থাৎ অভিষেকের পর বাংলাদেশের অন্তত ৬৪ শতাংশ ম্যাচেই একাদশে ছিলেন লিটন। ৯৯ ম্যাচের ৯৮ ইনিংসে ব্যাটিং করে ৩০.৩৩ গড় ও ৮৫.৭৬ স্ট্রাইক রেটে ২ হাজার ৭০০ রান করেছেন লিটন। ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ১২ ফিফটির সঙ্গে ৫টি সেঞ্চুরি এসেছে তার ব্যাট থেকে। বাংলাদেশের জার্সিতে লিটনের চেয়ে বেশি সেঞ্চুরি আছে মাত্র ৩ জনের। বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের ১৪, সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম করেছেন ৯টি করে সেঞ্চুরি। আর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯৮টি ইনিংস খেলেছেন মোট ১০ জন ব্যাটার। তাদের মধ্যে প্রথম ৯৮ ইনিংসে লিটনের চেয়ে বেশি রান করেছেন শুধু তামিম ইকবাল (৩ সেঞ্চুরিতে ২ হাজার ৮৯৬) ও সাকিব আল হাসান (৫ সেঞ্চুরিতে ২ হাজার ৮৩৪)। লিটনের অভিষেকের পর বাংলাদেশের জার্সিতে ওয়ানডেতে তার চেয়ে বেশি রান করেছেন চার জন। সবচেয়ে বেশি মুশফিকুর রহিম ১২৫ ইনিংসে চার হাজার ১২৫ রান। আর বাকি তিনজন তামিম ইকবাল (৯৭ ইনিংসে ৩৯২০), সাকিব আল হাসান (৯১ ইনিংসে ৩৩৫৯) আর ১০৬ ইনিংসে রিয়াদ করেছেন ৩৩৭৫ রান। ওয়ানডেতে লিটনের শুরুটা ছিল অনেকটাই সাদামাটা। প্রথম ১৭ ইনিংসে কোনো ফিফটিও ছিল না, সর্বোচ্চ আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২০১৮ এশিয়া কাপে করা ৪১ রান। তবে ঠিক পরের ম্যাচেই নিজের আবিভার্বের ঘোষণা দেন লিটন। ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলেন ১১৭ বলে ১২১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। ওই ম্যাচ বাংলাদেশ হারলেও ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে তার হাতেই। এক ম্যাচ বাদেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলেন ৮৩ রানের ইনিংস। ২০১৯ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বিশ্বকাপে অভিষেকে ৯৪ রানের অপরাজিত ইনিংসে নিজের সামর্থ্যের আরেক দফা প্রমান দেন লিটন। ওই ইনিংসেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিখ্যাত ধারভাষ্যকার ইয়ান বিশপ সেই বিখ্যাত লাইন উচ্চারণ করেন ‘লিটন কুমার দাস পেইন্টিং মোনালিসা হেয়ার।’ এই মোনালিসা ট্যাগ অবশ্য লিটনকে এরপর ভুগিয়েছেও বেশ! মানুষের প্রত্যাশার পারদ উঠেছে তুঙ্গে, ব্যর্থ হলেই মোনালিসা শব্দটা হয়ে উঠেছে লিটনকে ট্রলের হাতিয়ার। তবে ওই মোনালিসা আকা ইনিংস থেকেই আস্তে আস্তে কিছুটা ধারাবাহিক হওয়া শুরু করেন এই ডানহাতি ব্যাটার। ২০২০ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩ ম্যাচের সিরিজে করেন দুই সেঞ্চুরি। প্রথম ম্যাচে ১২৬ আর তৃতীয় ম্যাচ ১৭৬ যেটা কিনা বাংলাদেশের জার্সিতে ওয়ানডেতে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংস। এরপর আরও দুটি সেঞ্চুরি এসেছে লিটনের ব্যাট থেকে। তবে ২০২৩ বিশ্বকাপটা লিটনের জন্য আক্ষেপ বলতেই পারেন অনেকে। ১১ ম্যাচে করেছেন ২ ফিফটি, দলের সেরা ব্যাটারের কাছ থেকে প্রত্যাশা আরেকটু বেশিই ছিল। এরপর কিছুদিনের মধ্যে মুদ্রার উল্টোপিঠটা ভালোমতোই দেখা শুরু করেন লিটন। ব্যাটে রান খরা যেন কিছুতেই শেষ হচ্ছিল। ফলস্বরুপ বাদ পড়েন বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির স্কোয়াড থেকে। যেটা কিনা ওই সময়ে অন্যতম আলোচিত খবর ছিল। ২০২৩ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ওপেনিংয়ে নেমে ৭ চারে ৬৬ রানের ইনিংস খেলেন লিটন। এরপর এখনও ওয়ানডেতে আর ফিফটিও করতে পারেননি লিটন। দল থেকে বাদ পড়েছেন, ফিরলেও প্রশ্ন উঠেছে কেন ফেরানো হলো। সবশেষ ১৮ ওয়ানডেতে লিটনের কোনো ফিফটিও নেই। এই সময়ে মাত্র ১৮.৪৩ গড়ে তিনি করেছেন ২৯৫ রান। মাঝে ৯ ইনিংসে দুই অঙ্কও ছুঁতে পারেননি। এই সময়ে তাকে ওপেনিং থেকে সরিয়ে মিডল অর্ডারে ফেরানো হয়। তাতে অবশ্য ছন্দে ফেরার আভাস দিয়েছেন লিটন। গত মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের শেষ দুই ম্যাচে তিনি করেছেন সমান ৪১ রান। ধারাবাহিকতা ধরে রেখে কিউইদের বিপক্ষে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৪৬ রান। তবে লিটনের কাছে তো প্রত্যাশা আরও বেশি। দলের অন্যতম সেরা ব্যাটার, যখন ব্যাট হাতে খেলেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবেন যে কেউ। কিন্তু ইনিংস বড় করতে না পারার রোগ যেন পেয়ে বসেছে এই লিটনকে। সেট হয়েও যেন কোথাও গিয়ে আটকে যাচ্ছেন তিনি। আর লিটন ভক্ত তো বটেই, ক্রিকেট অনুরাগীদের সেখানেই যেন আক্ষেপের শেষ নেই। বড় ইনিংস যে আগে খেলেননি তাও না। পরিসংখ্যানই বলছে, ওয়ানডে, টেস্ট সবখানেই লম্বা ইনিংস খেলার সক্ষমতা আছে লিটনের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেটাই দেখা যাচ্ছে না। তবে আসন্ন ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলা বা দীর্ঘেমেয়াদা ফল বাংলাদেশের পক্ষে আসা আর লিটনের লম্বা ইনিংস খেলা যেন এক সূতোয় গাথা। মাঝেমধ্যে ফেসবুকে একটা লাইন দেখা যায়, ‘আরেকটা আক্ষেপ হয়েন না লিটন।’ এই লাইনে আক্ষেপ আর হতাশা কিংবা শঙ্কা সবই দেখা যায় পরিস্কারভাবে। এর আগে মোহাম্মদ আশরাফুলও বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবিভুর্ত হয়েছিলেন আকাশ সমান প্রতিভা নিয়ে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সবচেয়ে কম বয়সে টেস্ট সেঞ্চুরি করে বিশ্ব ক্রিকেটে হুলস্থুল ফেলে দিয়েছিলেন। আজও অনেক ক্রিকেট বোদ্ধাই আক্ষেপ করেন যে প্রতিভা ছিল তার কিছুই আশরাফুল কাজে লাগাতে পারেননি। ফলে লিটনের প্রতি ওই লাইনটা চলে আসে। কারণ ব্যাটার লিটনের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা, লিটনের ব্যাট থেকে লম্বা ইনিংস দেখার আকাঙ্খা প্রবল। এসকেডি/আইএন
Go to News Site