Jagonews24
সমর্থক, সংসদ ও জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিভিন্ন ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারবার দেশের শতাব্দীব্যাপী ‘দাসত্বের ইতিহাস’ তুলে ধরেন। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিনি বলেন, ১২০০ বছরের দাসত্বের মানসিকতা এখনো আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। সামান্য উচ্চ মর্যাদার কারও সঙ্গে কথা বলার সময়ও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আগের মুসলিম সাম্রাজ্যগুলো। এই সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছিল মোগল সাম্রাজ্য। ২১ এপ্রিল ‘পানিপথের যুদ্ধ’-এর ৫০০ বছর পূর্তি হয়, যখন তৈমুর ও চেঙ্গিস খানের বংশধর এবং মধ্য এশিয়ার শাসক বাবর দিল্লির শেষ সুলতানকে পরাজিত করেন। বাবরের প্রতিষ্ঠিত মোগল সাম্রাজ্য একসময় বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর একটি ছিল। এদিকে, মোগল শাসকরা ব্রিটিশদের মতো ভারত ছেড়ে চলে যাননি, বরং ভারতীয় রাজকীয় রীতি গ্রহণ করেন, স্থানীয়দের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ও কার্যত ভারতীয় হয়ে ওঠেন। তাই তাদের অর্জনগুলোও ভারতের অর্জন, যা এখনো রয়েছে। তবে এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার ৫০০ বছর পূর্তি কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়াই পেরিয়ে যাচ্ছে। মোদীর দল বিজেপির দাবি, মোগলরা মন্দির ধ্বংস করেছে, যা ‘আংশিক সত্য’। মোদীর দল আরও বলে থাকে, মোগলরা হিন্দুদের অপমান করেছে। এটিও একটি বিতর্কিত দাবি। বিজেপির মতে, মোগলরা ভারতের ‘সবকিছু লুট করেছে’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কী আদৌ সব নিয়ে গেছে নাকি অনেক কিছু দিয়ে গেছে? আসুন জেনে নিই, মোগলরা ভারতকে কী কী দিয়ে গেছে। ভাষা প্রথমত, ভাষা। ২০১৪ সালে মোদীর সেই ভাষণটি ছিল হিন্দিতে, যা ভারতের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাষা। ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটনের মতে, তার ওই বক্তব্যের ২৮টি শব্দের মধ্যে এক-চতুর্থাংশই ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। মূলত মোগল দরবারের ভাষা উত্তর ভারতের অধিকাংশ ভাষার শব্দভাণ্ডারে প্রভাব ফেলেছে। এমনকি ‘হিন্দি’ ও ‘হিন্দু’ শব্দ দুটি এসেছে ফার্সি ‘হিন্দ’ থেকে, যা ইংরেজিতে ইন্দাস নদী নামে পরিচিত। সেখান থেকেই ‘ইন্ডিয়া’ নামের উৎপত্তি। খাবার ভাষার পর আসে খাবার। বিশ্বজুড়ে যাকে ‘ইন্ডিয়ান কুইজিন’ বলা হয়, ভারতে সেটিকে ‘মোগলাই’ বলা হয়। তন্দুর, যেখান থেকে নান ও কাবাব তৈরি হয়, তা এসেছে ফার্সি সংস্কৃতি থেকে। একইভাবে সামোসা, শরবত, বিভিন্ন মিষ্টান্ন ও বিরিয়ানি, যা গত দশ বছর ধরে ডেলিভারি অ্যাপে ভারতের সবচেয়ে বেশি অর্ডার করা খাবার। এসবই মোগল প্রভাবের ফল। বিজেপির একটি অংশ মাংস ও ডিমের বিরোধিতা করলেও নিরামিষভোজীরাও ‘তন্দুরি পনির’ উপভোগ করেন, যার ‘পনির’ শব্দটিও ফার্সি উৎস থেকে এসেছে। ভাষা ও খাবারের বাইরে মোগলদের অবদান আরও বিস্তৃত। ভারতের ১০টি জনপ্রিয় ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে চারটি ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে শীর্ষ ছয়টির নির্মাতা মোগলরা। তাজমহল উভয় তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। প্রতি বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ দেন, সেটিও মোগল স্থাপনা। এই লালকেল্লা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে দেশের প্রচলিত ব্যাংকনোটেও এর ছবি রয়েছে। শুধু ভাষা ও খাবার নয়, ভারতের সংগীত ও পোশাকেও মোগল প্রভাব রয়েছে। জর্জ হ্যারিসনের মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া বাদ্যযন্ত্র ‘সেতার’ মোগল যুগের সৃষ্টি। শেরওয়ানি, যা হিন্দু ও মুসলিম বরদের মধ্যে সমান জনপ্রিয়, সেটিও মোগলদের দরবারি পোশাক থেকে এসেছে। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার লিখেছেন, মধ্যযুগীয় ভারতের সুফিবাদ, উর্দু ভাষা ও ইন্দো-সারাসেনিক শিল্প ছিল বিজেতা ও পরাজিত উভয়ের যৌথ সম্পদ, যা তাদের একত্র করেছে। সম্রাট আকবর হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ফার্সিতে অনুবাদের উদ্যোগ নেন, যদিও তার প্রপৌত্র আওরঙ্গজেবের সময় মন্দির ধ্বংসের ঘটনাও ঘটে। বিজেপির শক্ত ভিত ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিজেপির উত্থানের পেছনের মোগলদের ‘পরোক্ষ’ প্রভাব রয়েছে। ১৯৯০ সালে, যখন বিজেপির সংসদীয় আসন ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ, তখন দলটি অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। সেখানে বাবরের আমলে নির্মিত ‘বাবরি মসজিদ’ ছিল। ১৯৯২ সালে সেটি ভেঙে ফেলা হলে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে ও তা বিজেপির রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করে। ২০২৪ সালে রাম মন্দির উদ্বোধনের সময় দলটির আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৬ শতাংশে। গত এক দশকে বিজেপি মুঘল আমলের শহরের নাম পরিবর্তন, মোগলাই খাবার থেকে দূরত্ব তৈরি ও ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক থেকে মোগলদের বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এরপরও ভাষা, খাদ্য, স্থাপত্য, সংগীত, শিল্প ও সংস্কৃতির মিশ্রণে মুঘলদের প্রভাব সুস্পষ্ট। বিশ্লেষকদের মতে, ইট-পাথরের স্থাপনা ভেঙে ফেলা সহজ হলেও পাঁচ শতাব্দী ধরে সমাজ ও সংস্কৃতিতে মিশে থাকা ঐতিহ্য মুছে ফেলা কঠিন। আর এই বাস্তবতাই হয়তো সবচেয়ে বড় উত্তর- মোগলরা শুধু ইতিহাস নয়, ভারতের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট এসএএইচ
Go to News Site