Somoy TV
কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড় থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত তিনজনই ডাকাত ও মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য ছিলেন। ঘটনাস্থলে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তাক্ত একটি কোদাল উদ্ধার করা হয়েছে।মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার উত্তর শীলখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে অন্তর্কোন্দল ও ভাগবাটোয়ারা সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানায় পুলিশ।নিহতরা হলেন: রুহুল আমিনের ছেলে রবি আলম, নুরুল কবিরের ছেলে মুজিব উল্লাহ এবং নুরুল ইসলামের ছেলে নুরুল বশর প্রকাশ হালানি। তিনজনই বাহারছড়া শীলখালী গ্রামের বাসিন্দা।এ বিষয়ে টেকনাফ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুকান্ত চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে একটি কোদাল উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই কোদাল দিয়েই তিনজনকে আঘাত করা হয়েছে। কোদালটিতে রক্তের দাগও পাওয়া গেছে।’আরও পড়ুন: টেকনাফে গহীন পাহাড়ে মিলল ৩ জনের রক্তাক্ত মরদেহসুকান্ত চৌধুরী আরও জানান, অন্তর্কোন্দল ও ভাগবাটোয়ারা সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে রাতে ও সকালে আবার যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়। পুলিশের চলমান অভিযানের পাশাপাশি যৌথ অভিযানও অব্যাহত থাকবে।এ দিকে নিহত রবিউল আউয়ালের বাবা রুহুল আমিন জানান, রাতে মুজিব আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে যায়। সকালে পাহাড়ে মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে গিয়ে ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাই। কী কারণে এমন হয়েছে, বুঝতে পারছি না।নিহত নুর বশরের ভাই নুর কবির বলেন, ‘পাহাড়ের পাশেই আমাদের ঘর। আমরা দুই ভাই আলাদা ঘরে বসবাস করি। সকালে হঠাৎ পাহাড়ে চিৎকার শুনে এলাকার লোকজন পাহাড়ে ছুটে যান। তখন গিয়ে দেখি যেখানে আমার ভাই নুর বশর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তখন জীবিত ছিল। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আমার ভাইয়ের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে, চিহ্নও রয়েছে।’শীলখালীর স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল বলেন, ‘টেকনাফের বাহারছড়া এলাকা এখন চরম অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। একদিকে সমুদ্রপথে মানব পাচারকারীরা সক্রিয়, অন্যদিকে পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে অপহরণের ঘটনাও ঘটছে। কিছুদিন আগেও মানব পাচারের ঘটনা সামনে এসেছে, আর এখন আবার তিনজনকে পাহাড়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।’আরও পড়ুন: নওগাঁয় চার খুন: ঘরের দেয়ালে লেখা ‘নমির তুই বেঁচে গেলি, এবার তোর পালা’তিনি আরও বলেন, ‘অপহরণ চক্র ও মানব পাচারকারী-এই দুই চক্রের কারণে সন্ধ্যার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটি যেন অন্ধকার ‘আইয়ামে জাহেলিয়ার’ যুগের মতো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে বাহারছড়ার মানুষের জন্য।’স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আরিফ বলেন, পুরো ইউনিয়নটাই এখন অপহরণের জন্য কুখ্যাত হয়ে উঠেছে। এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়-প্রতিদিনই কেউ না কেউ অপহরণের শিকার হচ্ছেন। অপহরণের পর মুক্তিপণ না দিলে অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের হত্যা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক ঘটনায় রবি আলম নামে এক তরুণকে তার পরিচিত এক ব্যক্তি বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর রাতভর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি, ফোনেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। পরদিন সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ধারাবাহিক ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।এ দিকে পুলিশ বলছে, নিহত তিনজনই চিহ্নিত ডাকাত ও মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য। চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা পুলিশের। তাদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও মাথায় জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে।আরও পড়ুন: হাসপাতালের কক্ষে পাওয়া গেল গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ, লাপাত্তা পরিবারটেকনাফ বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেন, ‘সকাল ৯টার দিকে বাহারছড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শিলখালী গ্রাম থেকে এক পরিচিত ব্যক্তি আমাকে ফোন করে জানান, পাহাড়ের ভেতরে একটি মরদেহ পড়ে রয়েছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জকে অবহিত করি। তিনি তার টিম নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান, আমিও সেখানে উপস্থিত হই।’তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা একটি মরদেহ দেখতে পাই, যার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারি, সেখানে আরও দুজন ব্যক্তি ছিলেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাদের মধ্যে একজনকে শাপলাপুর বাজারের এক চিকিৎসকের কাছে নেয়া হলে তিনি মৃত ঘোষণা করেন এবং তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।’অপরজনকে সদর হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানকার চিকিৎসকও তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি বর্তমানে সদর হাসপাতালে মর্গে রয়েছেন। এ ছাড়া পাহাড়ের ভেতরে থাকা মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করেছে। সেটিকেও সদর হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।আমজাদ হোসেন খোকন বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি- অপহরণ ও মানব পাচার সংশ্লিষ্ট বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলে নারী ও নবজাতকের বস্তাবন্দি অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারএ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান বলেন, ‘সংবাদ পাওয়ার পর টেকনাফ থানার ওসি (তদন্ত) ঘটনাস্থল শিলখালী পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছান। সেখানে তিনি দুটি মরদেহ উদ্ধার করেন। এ ছাড়া আরও একজন ইতোমধ্যে কক্সবাজারে আনার পথে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নিহতরা ডাকাত বা অপহরণকারী চক্রের সদস্য এবং নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে এ ঘটনা ঘটতে পারে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে পুলিশ কাজ করছে-মরদেহ উদ্ধারসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। বিস্তারিত তদন্ত শেষে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে জানানো যাবে।’মো. অহিদুর রহমান আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন এবং প্রাথমিকভাবে তারা সবাই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত। ঘটনাস্থলটি একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়, যেখানে অপহরণকারী চক্র প্রায়ই তাদের লোকজনকে আটকে রাখে। এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আগে থেকেই আমাদের অভিযান চলমান ছিল এবং সাম্প্রতিক ঘটনার পর সেই অভিযান আরও জোরদার করা হবে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত পক্ষে বা বিপক্ষে যেই থাকুক না কেন, অপহরণকারী বা অন্য কোনো অপরাধী-সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচার চক্র সক্রিয়। তাদের ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা।
Go to News Site