Somoy TV
হেলেনা বেগম। যে হাতে থাকার কথা ছিল চুড়ি, সেই হাত আজ শক্ত করে ধরে আছে রিকশার হ্যান্ডেল। রিকশার চাকার প্রতিটি ঘূর্ণনে মিশে আছে এক লড়াকু নারীর ঘাম, সংগ্রাম আর সন্তানদের আগলে রাখার গল্প।মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের বরিশাল-ভোলা মহাসড়কে দেখা হয় তার সঙ্গে। তপ্ত রোদে যাত্রী না থাকায় মহাসড়কের পাশে একটি গাছের নিচে ব্যাটারিচালিত রিকশাটি থামিয়ে যাত্রীর আসনে বসে ঝিমুচ্ছিলেন তিনি। প্রথমে সালাম দিতেই তড়িঘড়ি উত্তর আসে-‘মামা কই যাবেন?’ না বলতে, মুখে যেন ভর করে রাজ্যের হতাশা। কৌতূহলী হয়ে তার সম্পর্কে জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেন, ‘বলতে পারি, কিন্তু যাত্রী আসলে চলে যাবো।’ তবে ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে তিনি শোনান জীবনসংগ্রামের কথা। আলাপে জানান, আয়ের উৎস হিসেবে কেন তিনি রিকশা চালানোকে বেছে নিয়েছেন। বলেন, ছোটবেলা থেকেই দুঃখ আর কষ্ট যেন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। বরিশাল নগরীর ধান গবেষণা রোডের কমিশনারের খেয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা হেলেনা বেগম শৈশবেই হোঁচট খেয়েছেন জীবনযুদ্ধে। মাত্র ১০ বছর বয়সে বিয়ে, আর ১৬ বছর বয়সে মা হওয়া; তার জীবনে সুখ খুব বেশি দিন টেকেনি। তিন কন্যা সন্তান রেখে স্বামী নিরুদ্দেশ হওয়ার পর শুরু হয় বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই। বালুর হেল্পারি, ঢালাই শ্রমিক থেকে গার্মেন্টস কর্মী-পেটের তাগিদে এমন কোনো পরিশ্রম নেই যা তিনি করেননি। আরও পড়ুন: পরিবারের সুখে নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করে গেলেন দিপালী বর্তমানে তার আয়ের উৎস ব্যাটারিচালিত রিকশা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ভোলা সড়ক থেকে লাহারহাট পর্যন্ত যাত্রীদের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দেন তিনি। আবার সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর মায়ের মমতায় তাকেই সামলাতে হয় রান্নাসহ সংসারের সব কাজ। হেলেনা বলেন, রিকশা চালানো শিখতে গিয়ে মাসখানেক অসুস্থ অবস্থায় দিন পার করেছি। যিনি আমাকে শিখিয়েছেন, তাকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। বর্তমানে আমার দৈনিক আয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এর মধ্যে ৩০০ টাকা দিতে হয় রিকশার ভাড়া হিসেবে। বাকি টাকা দিয়ে কোনোমতে মেয়েদের নিয়ে খাওয়ার খরচ আর বাসা ভাড়া মেটাতেই চলে যায়।' তার রিকশার মালিক আক্কাস বলেন, তিন মাস আগে হেলেনা এসে জানান তিনি রিকশা চালাতে চান। নারী হয়ে রিকশা চালাবেন; এমন ভাবনা থেকে প্রথমে না করলেও পরে তার জোরাজুরিতে রাজি হই। তবে গত তিন মাসে এক দিনের রিকশা ভাড়ার টাকাও বকেয়া রাখেননি হেলেনা। এদিকে হেলেনার এই অদম্য স্পৃহা পৌঁছেছে প্রশাসনের কানেও। সরকারি সহায়তার আওতায় আনার পাশাপাশি একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে বরিশাল জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, এরই মধ্যে তার সম্পর্কে জেনেছি। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
Go to News Site