Collector
বন্ধ চিনিকলে বাড়ছে দেনা-দুর্ভোগ | Collector
বন্ধ চিনিকলে বাড়ছে দেনা-দুর্ভোগ
Jagonews24

বন্ধ চিনিকলে বাড়ছে দেনা-দুর্ভোগ

• টানা ছয় বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ• অচল পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি• মাসে বেতন-ভাতায় সরকারের ব্যয় সাড়ে ১২ লাখ• ৫৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার ঋণের বোঝা• প্রতি বছর ঋণের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ৪৫ কোটি টাকার সুদ• চরম ক্ষতির মুখে স্থানীয় আখচাষিরা পাবনা সুগার মিলের উৎপাদন বন্ধ ছয় বছর। দেশের অন্যতম বৃহৎ এ চিনিকল বন্ধ থাকায় নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ ও মালামাল। প্রতি মাসে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয় অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির কাঁধে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ থাকায় প্রতিনিয়ত সুদ বাড়ছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় আখচাষিরাও। চিনিকল কর্তৃপক্ষ জানায়, পাবনা চিনিকলে বর্তমানে ২২ জন স্থায়ী ও ৩০ জন অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। ২০২০ সালে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর থেকে গত ছয় বছরে শুধু বেতন-ভাতাতেই সরকারের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮ কোটির বেশি টাকা। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ চিনিকলের উৎপাদন বন্ধের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে ও দ্বিতীয় ধাপে মিল চালুর কথা জানায়। তবে সেই ঘোষণার প্রায় দেড় বছর পার হলেও মিল চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। আরও পড়ুন: খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরুজ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধসবুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল এদিকে বন্ধ হওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বর্তমান বিএনপি সরকারের শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। গত ২ এপ্রিল বিকেলে সংসদের প্রথম অধিবেশনের সপ্তম দিনে মন্ত্রী এ কথা বলেন। শিল্পমন্ত্রী জানান, সরকার বন্ধ হওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে কাঁচামাল বা আখের পর্যাপ্ত প্রাপ্তির ওপর। চাষি পর্যায়ে আখের সরবরাহ নিশ্চিত হলে পর্যায়ক্রমে কলগুলো উৎপাদনে ফিরবে। নতুন শিল্পমন্ত্রী বন্ধ চিনিকলগুলো পুনরায় চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে বলে জানালেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বন্ধ চিনিকলগুলোর কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো বার্তা পৌঁছায়নি। ‘মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে ভূতুড়ে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মিলটির বিপুল মূল্যের যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মিলটি দ্রুত চালু করলে আখচাষি ও এ এলাকার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো।’ জানা যায়, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়াতে ৬০ একর জমির ওপর ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে স্থাপন করা হয় পাবনা সুগার মিল। এরপর ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যাওয়ার পরের বছর আখ মাড়াই মৌসুমে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে মিলটি। পরে এ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন খাত থেকে ঋণ নেয় মিল কর্তৃপক্ষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুদ বাড়তে থাকে সেই ঋণের। বর্তমানে ৫৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। একে তো ঋণের বোঝা, তার ওপর অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর মিলটির মাড়াই বা উৎপাদন কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দেয় সরকার। আরও পড়ুন: আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্পবন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্যপ্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’ মিলটির হিসাবরক্ষণ বিভাগ বলছে, উৎপাদন বন্ধের বছরও মিলটি প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টন চিনি উৎপাদন করে। কিন্তু বর্তমানে একেবারেই উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ। মিলের কাঁধে বর্তমানে ৫৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার ঋণের বোঝা রয়েছে। এ ঋণের সঙ্গে প্রতি বছর গড়ে ৪৫ কোটি টাকা করে সুদ যুক্ত হচ্ছে। একসময় এ মিলে ১২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চিনিকলটি বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় আখচাষিরা। এই মিল একসময় ছিল শ্রমিক ও কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর। এখন সেখানে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা, ভূতুড়ে পরিবেশ। ‘মিলটি পুনরায় চালু করে আধুনিক মেশিন ও দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। যাতে চিনি উৎপাদন করে মিলটি লাভবান হতে পারে। পাশাপাশি চিনির সঙ্গে বিভিন্ন উপজাত যেমন—স্পিরিট, জৈবসার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে মিলকে লাভজনক করা সম্ভব।’ মিল এলাকার বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, ‘মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে ভূতুড়ে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মিলটির বিপুল মূল্যের যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মিলটি দ্রুত চালু করলে আখচাষি ও এ এলাকার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো।’ পাবনা সুগার মিল আখচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত জাতীয় কৃষক শাহজাহান আলী বাদশা বলেন, ‘পাবনা চিনিকলের উৎপাদন সক্ষমতা ও চিনির মান দেশের অন্যান্য মিলের তুলনায় ভালো ছিল। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শিল্প উপদেষ্টার নিকট এ মিল চালুর আবেদন জানিয়েছিলাম। সেসময় উপদেষ্টা আশ্বাস দিলেও মিলটি চালু করেনি। বর্তমান সরকারের কাছে মিলটি দ্রুত চালুর দাবি জানাচ্ছি।’ পাবনা চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখতারুজ্জামান বলেন, ‘মিলটি পুনরায় চালু করে আধুনিক মেশিন ও দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। যাতে চিনি উৎপাদন করে মিলটি লাভবান হতে পারে। পাশাপাশি চিনির সঙ্গে বিভিন্ন উপজাত যেমন—স্পিরিট, জৈবসার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে মিলকে লাভজনক করা সম্ভব।’ এমএন/এমএস

Go to News Site