Somoy TV
দরজায় কড়া নাড়ছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬, বাকি আছে আর মাত্র ৫০ দিন। তবে এরই মধ্যে বৈশ্বিক এই আয়োজনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা জটিলতা। যার মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জও এখন প্রকাশ্যে। এসব ইস্যুতে ফিফা এবং আয়োজক দেশগুলো তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে, যা টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই বাড়তি চাপ তৈরি করছে।আগামী জুনে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় বসতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের আসর। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানে যুদ্ধ, ইসরাইল আর ফিলিস্তিনি তো আছেই। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইরান। তাদের দাবি, ভেন্যু পরিবর্তন করতে হবে। তাতে অবশ্য ফিফা তেমন কোনো সাড়া দেয়নি। কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে যৌথভাবে এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে টুর্নামেন্ট ঘিরে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত উত্তেজনা তৈরি করেছে বেশ। যদিও বর্তমানে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। এদিকে টিটিকেট আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে সমর্থকদের মাঝে দেখা দিয়েছে তীব্র অসন্তোষ, যা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই আসরের প্রতি জনগণের আগ্রহ ও টিকিট বিক্রিতে প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ ভেন্যুগুলোর মধ্যে যাতায়াতের রুটে পরিবহন ভাড়া বাড়ানো নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে— এ নিয়ে সরব হয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। বিশ্বকাপে ইরান অংশগ্রহণ করবে কী?বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকার ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদই তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। গত মাসে ইরান জানায়, চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তারা টুর্নামেন্টে না-ও অংশ নিতে পারে— বিশেষ করে আয়োজক দেশ যদি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে, যেখানে তাদের সব ম্যাচই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ইরানের ফুটবল ফেডারেশন তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোতে স্থানান্তরের জন্য ফিফার কাছে অনুরোধ জানায়। তবে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে ফিফা।ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো গত সপ্তাহে স্পষ্টভাবে জানান, ইরানের এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ‘অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে।’বর্তমান সূচি অনুযায়ী, ইরান তাদের গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে খেলবে। আর যদি তারা নকআউট পর্বে পৌঁছাতে পারে, তাহলে পরবর্তী ম্যাচগুলোও যুক্তরাষ্ট্রেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আরও পড়ুন: ভিনিসিউসকে বিক্রি করাই রিয়ালের জন্য সেরা সিদ্ধান্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজক শহরগুলিতে যাতায়াত ভাড়ার মূল্য আকাশছোঁয়া- বিশ্বকাপ ফাইনালসহ আরও সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ভেন্যু নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়াম। ম্যানহাটনের পেন স্টেশন থেকে সেখানে ট্রেনে যাতায়াতের জন্য ১২.৯০ ডলারের টিকিটের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি অর্থ গুনতে হতে পারে। মাত্র ১৫ মিনিটের প্রায় ১৪ কিলোমিটার (৯ মাইল) যাত্রার জন্য ১৫০ ডলার ভাড়া নির্ধারণকে কেন্দ্র করে নিউ জার্সির গভর্নর মিকি শেরিল এবং ফিফার মধ্যে পাল্টাপাল্টি সমালোচনা চলছে। শেরিলের মতে, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় ফিফার নেওয়া উচিত, তবে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, এ ধরনের ব্যয় বহন করা তাদের বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে না। এদিকে বস্টনের উপশহরে অবস্থিত জিলেট স্টেডিয়ামে ট্রেন যাত্রার খরচও স্বাভাবিকের প্রায় চার গুণ বেড়ে ২০ ডলার হয়েছে। ফক্সবোরোতে বাসে যাতায়াতের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৫ ডলার। অন্যদিকে আয়োজক শহর লস অ্যাঞ্জেলেস ও ফিলাডেলফিয়া গণপরিবহনের ভাড়া অপরিবর্তিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কানসাস সিটিতে অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে যাতায়াতের জন্য ১৫ ডলার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। হিউস্টনে ভক্তদের সেবা দিতে বাস ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হলেও ভাড়া অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে— বাস ও লাইট রেল ট্রেনে ১.২৫ ডলার এবং পার্ক-অ্যান্ড-রাইড সুবিধায় ২ থেকে ৪.৫০ ডলারের মধ্যে রাখা হয়েছে। চড়া দাম, ম্যাচের টিকিটের কম চাহিদা- টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে দেখা তৈরি হয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ। অনেক সমর্থকের অভিযোগ, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের কারণে তারা টুর্নামেন্ট উপভোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বনাম প্যারাগুয়ের মতো ব্লকবাস্টার ম্যাচগুলোর টিকিট বিক্রিতে যে মন্দা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা এই উচ্চমূল্যেরই স্পষ্ট প্রতিফলন। ফিফা গত ডিসেম্বরেই প্রথম ধাপে টিকিট বিক্রি শুরু করে। তখন প্রথম রাউন্ডে ক্যাটাগরি-৩ টিকিটের দাম ছিল ১৪০ ডলার থেকে শুরু করে ফাইনাল ম্যাচের জন্য সর্বোচ্চ ৮,৬৮০ ডলার পর্যন্ত। তবে ১ এপ্রিল পুনরায় বিক্রি শুরু হলে টিকিটের দাম আরও বেড়ে সর্বোচ্চ ১০,৯৯০ ডলারে পৌঁছে যায়। শুরুর দিকে উত্তর আমেরিকার আয়োজক সংস্থা টিকিটের দাম ২১ ডলার পর্যন্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ ডলার। অন্যদিকে বড় দলগুলোর ম্যাচের ক্ষেত্রে অধিকাংশ টিকিটের দাম কমপক্ষে ২০০ ডলার বা তারও বেশি। আরও পড়ুন: নতুন করে আরেক দফায় বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি শুরু এদিকে ফিফা বুধবার (২২ এপ্রিল) ৫০ দিনের কাউন্টডাউনের সাথে মিল রেখে টিকিট বিক্রির নতুন একটি ধাপের ঘোষণা দিয়েছে। এই পর্বে ১০৪টি ম্যাচের সবগুলোর জন্য ক্যাটাগরি-১ থেকে ক্যাটাগরি-৩ পর্যন্ত টিকিট ‘ফার্স্ট কাম ফার্স্ট’ ভিত্তিতে বিক্রি করা হবে। বিশ্বকাপ ম্যাচ চলাকালীন অভিবাসন অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ- বিশ্বকাপ চলাকালীন সম্ভাব্য অভিবাসন অভিযানকে ঘিরে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের গণ নির্বাসন নীতি এবং বৈধ অভিবাসনের পথ আরও কঠোর করার উদ্যোগের কারণে আশঙ্কা করা হচ্ছে, টুর্নামেন্টে অংশ নিতে আসা আন্তর্জাতিক দর্শকরা মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নজরদারির আওতায় পড়তে পারেন। এই পরিস্থিতিতে চলতি বছরের টুর্নামেন্টে সম্ভাব্য অভিবাসন অভিযান এড়াতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য গত সপ্তাহে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি সাংবাদিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, গত বছরের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) এবং কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (CBP)-এর এজেন্টদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এসব ম্যাচে কোনো ধরনের অভিযান পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিফা কর্মকর্তারা অভিবাসন স্থগিতের সম্ভাবনাকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক জনসংযোগের সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কর্মকর্তারা আশা করছেন ইনফান্তিনো তার ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে অভিবাসন-সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। মেক্সিকোতে সহিংসতা টুর্নামেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে- বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশ মেক্সিকোতে সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার পর ভক্তদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে, ফলে দেশটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর কাছে একাকী এক বন্দুকধারীর হামলায় পর্যটকদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। হামলাটি ঘটে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং মেক্সিকোর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র তেওতিহুয়াকান পিরামিডের একটি অংশে। এতে কানাডার একজন পর্যটক নিহত হন এবং আরও ১৩ জন আহত হন। এই ঘটনার পর আসন্ন বৈশ্বিক ফুটবল টুর্নামেন্টের আগে মেক্সিকোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে দেশটির সরকারের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাম জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ সামনে রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, ‘সরকার হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে এমন পরিস্থিতি আর না ঘটে। তবে এটাও সত্য যে, আমরা সবাই জানি, এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
Go to News Site