Collector
ইরান যুদ্ধ যেভাবে আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক অস্ত্র ধ্বংস করে দিলো | Collector
ইরান যুদ্ধ যেভাবে আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক অস্ত্র ধ্বংস করে দিলো
Somoy TV

ইরান যুদ্ধ যেভাবে আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক অস্ত্র ধ্বংস করে দিলো

১৯৭৭ সালে ডেনমার্কের দাবা গ্র্যান্ডমাস্টার বেন্ট লারসেনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি ভাগ্যবান হতে চান নাকি দক্ষ। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘দুটোই’। অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ তার সাম্প্রতিক বই ‘আওয়ার ডলার, ইওর প্রবলেম’-তে এই উদাহরণ ব্যবহার করে বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডলারের যে অসাধারণ আধিপত্য, তা সমানভাবে দক্ষতা ও ভাগ্যের ফল।যদি ১৯৬০-এর দশকে রাশিয়া তাদের অর্থনীতি উন্মুক্ত করত, ১৯৮০-এর দশকে জাপানকে জোর করে মুদ্রার মান বাড়াতে না হতো, বা ২০১০-এর দশকে চীন তার মুদ্রার বিনিময় হার বাজারে ছেড়ে দিত—তাহলে ডলার এখনো শীর্ষে থাকত, তবে এতটা নয়। সুদের হার বেশি হতো এবং ‘বিশেষ সুবিধা’ কমে যেত। বইটির নাম এসেছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের অর্থমন্ত্রী জন কোনালির একটি মন্তব্য থেকে। মন্তব্যটা হলো, ‘ইট’স আওয়ার ডলার, বাট ইওর প্রবলেম‘ (এটা আমাদের ডলার, কিন্তু তোমাদের সমস্যা)। স্পষ্টতই এই মন্তব্য থেকে আমেরিকার দম্ভ যেমন বোঝা যায়, তেমনি পুরো ব্যবস্থাটা ঠিক কিভাবে কাজ করে সেটাও ব্যাখ্যা হয়। অর্থাৎ মুদ্রা আমেরিকা তৈরি করে, আর তার প্রভাব বহন করে পুরো বিশ্ব। সৌদি চুক্তি ১৯৭৪ সালে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেন। সৌদি আরব তেল বিক্রি করবে ডলারে এবং সেই অতিরিক্ত অর্থ মার্কিন ট্রেজারিতে রাখবে। বিনিময়ে আমেরিকা নিরাপত্তা দেবে। পরে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশও এতে যোগ দেয়। সেই থেকে এভাবেই চলছে। মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের হিসেব মতে, ২০২৩ সালেও প্রায় ৮০ শতাংশ বৈশ্বিক তেল লেনদেন ডলারে হয়েছে। পেট্রোডলার ব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল এর চক্র: তেল কিনতে ডলার লাগে → সেই ডলার তেল রপ্তানিকারক দেশে যায় → সেখান থেকে আবার আমেরিকায় বিনিয়োগ হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র কম খরচে ঋণ নিতে পারে এবং ডলার বিশ্ব রিজার্ভ মুদ্রা হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সুইফট ব্যবস্থা (বিশ্বব্যাপী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিরাপদ এবং দ্রুত অর্থ লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদানকারী একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক) নিয়ন্ত্রণ করে আমেরিকা যেকোনো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। যেমনটা ইরানকে করা হয় ২০১২ সালে ও রাশিয়াকে ২০২২ সালে। আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ৩৬ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হতে পারে: ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার জব্দ করা হয়। এতে বিশ্ব বুঝে যায়—ডলার রিজার্ভ আসলে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর প্রথম আমেরিকান হামলার আগেই অবশ্য অনেক কিছু বদলে গিয়েছিল। শেল তেল বিপ্লব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জ্বালানি-স্বনির্ভর করে তুলেছিল, যার অর্থ হলো সৌদি আরব এখন তার আমেরিকান নিরাপত্তা গ্যারান্টারের চেয়ে চীনের কাছে চারগুণ বেশি তেল বিক্রি করছিল। মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের ৮৫ শতাংশ এশিয়ায় যায়। এদিকে ১৯৭৪ সালের চুক্তির মূল ভিত্তি (যাতে আমেরিকা ছিল অপরিহার্য গ্রাহক) নীরবে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে সৌদি আরব ‘প্রজেক্ট এমব্রিজ’-এ যোগ দিয়েছিল, যা পিপলস ব্যাংক অফ চায়না, হংকং মনিটারি অথরিটি এবং থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সাথে যৌথভাবে তৈরি একটি ব্লকচেইন-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। এটি সুইফট বা ডলার-করসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং স্পর্শ না করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রায় লেনদেন নিষ্পত্তির সুযোগ দেয়। ডয়চে ব্যাংকের গবেষণা দল ২০২৬ সালের মার্চে লেখা এক প্রতিবেদনে বেশ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, এমব্রিজ ইতোমধ্যেই ‘ন্যূনতম কার্যকর পর্যায়ে’ রয়েছে। ডলার ব্যবস্থার বাইরে লেনদেনের পথ তৈরি হয়ে গেছে। সেগুলো তখনও সক্রিয় ছিল না, কিন্তু প্রস্তুত ছিল। যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধের খরচ প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। এই যুদ্ধ পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে দুই দিক থেকে আঘাত করেছে—একদিকে তুরস্ক, ভারত, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেদের মুদ্রা রক্ষায় মার্কিন বন্ড বিক্রি করছে। ফলে সুদের হার বেড়ে গেছে। আগে সংকটে সবাই ডলারে যেত, এবার উল্টোটা হয়েছে। এর ফলে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ নিউইয়র্কের হোল্ডিং প্রায় ৮২ বিলিয়ন ডলার কমে ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা ২০১২ সালের পর সর্বনিম্ন। ফেব্রুয়ারির শেষে ১০ বছরের মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদের হার ছিল ৩.৯ শতাংশ। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ৪.৪ শতাংশের উপরে উঠে যায়। সাধারণত বড় কোনো সংকট হলে (যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সিলিকন ভেলি ব্যাংকের পতন বা ২০২৩ সালের অক্টোবর ৭ হামাসের হামলা) মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মার্কিন বন্ডে টাকা রাখে। এতে বন্ডের দাম বাড়ে এবং সুদের হার কমে। কিন্তু এবার উল্টোটা হয়েছে—মানুষ বন্ড কিনেনি, বরং বিক্রি করেছে। ফলে সুদের হার বেড়ে গেছে। এর মানে হলো, যেটা এতদিন ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে কাজ করত—সেই পুরোনো নিয়ম এবার কাজ করেনি। অন্যদিকে তেল রফতানিকারক দেশগুলোর দিক থেকেও বড় পরিবর্তন হয়েছে। মার্চ মাসে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিদিন অন্তত ১ কোটি ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়ে দেয়। কাতার তাদের রাস লাফফান স্থাপনায় হামলার পর গ্যাস (এলএনজি) রফতানি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। আরও পড়ুন: সিএনএনের বিশ্লেষণ / ট্রাম্প কেন ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি বাড়ালেন কুয়েত, সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই দেশগুলো মিলে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সরকারি বন্ড ধরে রেখেছিল। কিন্তু এখন তাদের অবস্থা বদলে গেছে—তেল কম বিক্রি হওয়ায় আয় কমেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বেশি খরচ করতে হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিনিয়োগ চুক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: আগে তারা তেল বিক্রি করে যে অতিরিক্ত ডলার পেত, সেটা আবার যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করত। কিন্তু এখন তেল কম বিক্রি হওয়ায় সেই সারপ্লাস বা অতিরিক্ত টাকা আর তৈরি হচ্ছে না। ফলে ‘পেট্রোডলার চক্র’ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আরও বড় পরিবর্তন—১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মিলিয়ে এখন মার্কিন বন্ডের চেয়ে বেশি স্বর্ণ ধরে রেখেছে। অর্থাৎ দেশগুলো ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছে। এই সুযোগে ইরান নতুন নিয়ম চালু করেছে—হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার টোল নিচ্ছে, তাও চীনা ইউয়ানে। লয়েড'স লিস্ট এটি নিশ্চিত করেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি সামাজিক মাধ্যম পোস্টে বিষয়টি স্বীকার করেছে। জিম্বাবুয়েতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস ঘোষণা করেছে যে ‘পেট্রোইউয়ান’ যুগ এসে গেছে। যুদ্ধবিরতির বাকি সময়ের জন্য ইরান হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক যান চলাচলের জন্য খুলে দিতে সম্মত হওয়া সত্ত্বেও বিষয়টি এখনও প্রাসঙ্গিক। সঠিক জবাব, ভুল প্রশ্ন সংশয়বাদীদের কথাও শোনা উচিত। এনডো ইকোনমিক্সের ডায়ানা চয়েলেভা দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে যুক্তি দিয়েছেন যে, এই যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে পেট্রোডলারকে আরও শক্তিশালী করেছে: উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনকে সমর্থন জানিয়েছে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পরীক্ষিত হয়েছে এবং টিকে আছে এবং চীনের বছরের পর বছর ধরে করা ধৈর্যশীল অবকাঠামো নির্মাণ ব্যাহত হয়েছে। আলপাইন ম্যাক্রো-র ড্যান আলামারিউ পেট্রোয়ুয়ানকে ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সঠিকভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইউয়ান অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয়, মূলধন নিয়ন্ত্রণ একে ইচ্ছামতো সীমান্ত পার হতে বাধা দেয় এবং বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের ৫৭ শতাংশের বিপরীতে এর অংশ মাত্র ২ শতাংশ। আরও পড়ুন: প্রতিদিন ৫০ কোটি ডলার লোকসান হচ্ছে ইরানের, দাবি ট্রাম্পের তিনি আরও একটি জোরালো বিষয় যোগ করেছেন। ইরান টোল হিসেবে ক্রিপ্টোকারেন্সিও গ্রহণ করছে এবং বেশিরভাগ স্টেবলকয়েন কার্যত ডলার-ভিত্তিক উপকরণ। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর ব্র্যাড সেটসার পরামর্শ দিয়েছেন যে, ইরান সম্ভবত রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা অর্জনের একটি পথ হিসেবেই প্রাথমিকভাবে ইউয়ান টোল আদায় করছে, যার অর্থ হলো, এই প্রক্রিয়ার শেষে তারা হয়তো শেষ পর্যন্ত ডলারই চায়। এই পর্যবেক্ষণগুলো ভুল নয়। তবে এগুলো ভুল প্রশ্নের উত্তর। প্রশ্ন এটা নয় যে আগামী বছর ইউয়ান ডলারকে প্রতিস্থাপন করবে কি না। প্রশ্নটা হলো, ডলারের সবচেয়ে শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য—আর্থিক অস্ত্র হিসেবে এর কার্যকারিতা—বিশেষভাবে একে এড়িয়ে চলার জন্য পরিকল্পিত সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পরেও টিকে থাকতে পারবে কি না। যে বন্দুক শুধু ডলার ব্যবস্থার ভেতরের লক্ষ্যবস্তুতে গুলি চালায়, যথেষ্ট সংখ্যক দেশ এর বাইরে পা রাখলে সেই বন্দুক আর তেমন কার্যকর থাকে না। ভবিষ্যতের ঝুঁকি বিশ্ব হয়তো তেলের ওপর নির্ভরতা কমাবে। ১৯৭৩ সালের তেল সংকট যেমন নতুন জ্বালানি উন্নয়ন বাড়িয়েছিল, এবারও তেমন হতে পারে। চীন এখন সৌর প্যানেল, উইন্ড টারবাইন ও ব্যাটারিতে বিশ্বে এগিয়ে। যদি দেশগুলো নিজস্ব জ্বালানি তৈরি করে, তাহলে আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্য কমবে—আর ডলারের প্রয়োজনও কমবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, অনেক দেশ এখন নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য করছে এবং ডলারকে এড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করেন, কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আগের মতো নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ক্ষমতা হারাবে। শেষ কথা অর্থনীতিবিদ ব্যিারি আইসেগ্রিন বলেন, রোমান মুদ্রা ‘ডেনারিয়াস’ যুদ্ধের খরচ মেটাতে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আজকের ডলারও একই ধরনের চাপে পড়ছে। ডলার হারিয়ে যাবে না, যেমন পাউন্ড স্টারলিং এখনো আছে।  কিন্তু ‘কোনো বিকল্প নেই’ আর ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্য’—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য বাড়ছে। লার্সেন যেমন বলেছিলেন—সফল হতে দক্ষতা ও ভাগ্য দুটোই লাগে। এখন মনে হচ্ছে, ডলারের ভাগ্য কিছুটা কমে যাচ্ছে। এনডিটিভিতে প্রকাশিত ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক আদিত্য সিনহার নিবন্ধ থেকে অনূদিত

Go to News Site