Collector
চাইলেই মেলে আমদানি-রপ্তানি সনদ, তবু বিশাল দপ্তর-জনবল | Collector
চাইলেই মেলে আমদানি-রপ্তানি সনদ, তবু বিশাল দপ্তর-জনবল
Jagonews24

চাইলেই মেলে আমদানি-রপ্তানি সনদ, তবু বিশাল দপ্তর-জনবল

প্রতিষ্ঠানটির মোটাদাগে একটিই কাজ—সেটি হলো আমদানি ও রপ্তানির সনদ দেওয়া। সেই সনদও চাইলেই মেলে। অথচ এটুকু কাজের জন্য ওই সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঢাকায় রয়েছে করপোরেট আঙ্গিকে বিলাসবহুল প্রধান কার্যালয়। এছাড়া ঢাকায় আরেকটি বিভাগীয় দপ্তরসহ আট বিভাগে রয়েছে আটটি দপ্তর। শুধু তাই-ই নয়, দেশের ছয়টি জেলায়ও রয়েছে আঞ্চলিক দপ্তর। ওই এক কাজের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত পদ রয়েছে ২৭৬টি। এখন কাজ করছেন দেড় শতাধিক জনবল। রয়েছেন সরকারি উচ্চপর্যায়ের বড় বড় কর্মকর্তা, যাদের মধ্যে কেউ কেউ সর্বোচ্চ গ্রেডেরও। যাদের রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ির বহরও। বলা হচ্ছে, আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের (সিসিআইঅ্যান্ডই) কথা। আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের এই দপ্তর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। প্রতিষ্ঠার শুরুতে বহুমাত্রিক কার্যক্রম থাকলেও এখন রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় দপ্তরটির কর্মপরিধি অনেকটা কমে গেছে। গত কয়েক দশকে নানান কর্ম অন্য বিভিন্ন দপ্তরে বণ্টনের ফলে এখন মূলত আমদানি-রপ্তানি সনদ দেওয়া ও বছর বছর সেটি নবায়ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে সিসিআইঅ্যান্ডই। তথ্য বলছে, আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫০ সালে। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠন করা হয়েছিল। সে সময় নতুন দেশে পণ্য আমদানি সহজ করতে ও সেজন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্সিং ব্যবস্থা সহজীকরণ করার পাশাপাশি রপ্তানি উন্নয়নমুখী করতে প্রতিষ্ঠানটির বড় ভূমিকা ছিল। যোগাযোগ ছিল বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও। এখন যেমন বড় বড় কার্যক্রম আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) করে। কাজ কম হলেও আয় কিন্তু ভালো। বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যয় বাদে প্রায় ৪০ কোটি টাকা মুনাফা থাকে।—বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র এদিকে আমদানি ও রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইনের অধীনে একসময় সিসিআইঅ্যান্ডই দেশে পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সব সরকারি নির্দেশাবলি এবং বিধি-বিধান প্রণয়ন করতো। সেসব কাজ এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও সরাসরি করছে। অন্যদিকে, সময়ের পরিবর্তনে এসব বিধিবিধানও এখন পরিবর্তন ও সংশোধন হয়েছে। ১৯৮১ সালের পর আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো আইনও হয়নি। সব মিলিয়ে সিসিআইঅ্যান্ডই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অনেকাংশেই গুটিয়ে গেছে। সেখানে এখন যা হচ্ছে সিসিআইঅ্যান্ডই এখন বাণিজ্যিক ও শিল্প আমদানিকারকদের অনুকূলে আমদানি নিবন্ধন সনদপত্র (আইআরসি) এবং ইনডেন্টরদের (যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে পণ্য আমদানিতে সহায়তা করে) অনুকূলে ইনডেন্টিং সনদ (ইআরসি) জারিকরণ ও নবায়ন করছে। তবে এই দুই ধরনের কার্যক্রম ভিন্ন ভিন্ন ৫৬টি সেবায় রূপান্তর করে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে বছরে এ ধরনের নতুন ও পুনরায় আমদানি-রপ্তানি সনদ নেওয়া ও নবায়ন সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার সনদের আবেদন পায় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এরমধ্যে ৯৫ শতাংশ আইআরসির আবেদন। ২০২০ সালে ডিজিটাল মাধ্যমে এসব সেবা চালুর পর এখন বেশিরভাগ আবেদন আসছে অনলাইন (সিসিআইঅ্যান্ডইয়ের ওএলএম) মাধ্যমে। যে কারণে প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সেবাগ্রহীতা একদম কমে গেছে। সনদ দেওয়ায় ভালো আয় প্রতিষ্ঠানটির কাজ কম হলেও আয় কিন্তু ভালো। বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যয় বাদে প্রায় ৪০ কোটি টাকা মুনাফা থাকে বলেও জানা গেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রে। আয় কীভাবে করে—খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ দপ্তর থেকে যে সনদ সেবাগুলো দেওয়া হয় এর বিপরীতে চড়া ফি নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এখন আমদানি-রপ্তানি সনদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হয়। এছাড়া প্রতি বছর নবায়নের চার্জ রয়েছে। আবার নবায়নের ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানিকারকের প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা ও মালিকানা পরিবর্তন, ব্যাংক পরিবর্তন, আমদানি সীমা পরিবর্তন ও নিবন্ধনের স্বত্ব পরিবর্তনেও ফি নেয় সিসিআইঅ্যান্ডই। এলসি খোলা ও জাহাজীকরণের সময় বাড়ানো, ক্লিয়ারেন্স পারমিট, আইআরসি থেকে অব্যাহতি, রপ্তানি পারমিট সংশোধন, রপ্তানি পারমিটের মেয়াদ বাড়ানোর মতো আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত অন্যান্য ফি রয়েছে। তবে এসব ফিও অনলাইনে দেওয়া যায়। জনবল অল্প হলেও অফিস আলিশান গত সোমবার (২০ এপ্রিল) সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটিতে যায় জাগো নিউজ। এর আগেও কয়েকবার বিভিন্ন পরিচয়ে এ প্রতিবেদক সেখানে যাওয়া-আসা করেন। ওই সময় দেখা যায়, সেবাগ্রহীতা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে আলিশান অফিস। এখনকার হালচাল পুরোপুরি বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো। করপোরেট কর্মকর্তাদের মতো সুযোগ-সুবিধাও মিলছে অফিসে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রধান কার্যালয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনের ১৬ তলায়। তার নিচের তলায় ঢাকা কার্যালয়। দুটি অফিসই কয়েক হাজার বর্গফুটের। কিন্তু সেখানে কাজ করছেন মোট ২৭ জন। যার মধ্যে প্রধান কার্যালয়ে ১৪ জন ও ঢাকা কার্যালয়ে ১৩ জন। কিন্তু এ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের তেমন চাপ নেই। ফলে বেশিরভাগ সময় বসে বসেই সময় কাটান তারা। কিন্তু এখানে কি এমন কেউ আছেন যে, আবেদন করে এ লাইসেন্স পাননি? এখানে কেউ রিফিউজ হয় না, চাইলেই পায়। তাহলে যে জিনিস চাইলেই পাওয়া যায় তার জন্য এত ফরমাল অ্যারেজমেন্ট লাগবে কেন?—বাণিজ্যমন্ত্রী সরেজমিনে দেখা যায়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই অফিসগুলো বসার ব্যবস্থায় মিশে আছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য রয়েছে দামি দামি কম্পিউটার। রয়েছে আধুনিক কনফারেন্স রুম, ল্যান ব্যবস্থাপনা ও সার্ভার কক্ষ, ডে-কেয়ার রুম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খাবার ঘর, লাইব্রেরি ও প্রেয়ার রুম। প্রতিষ্ঠানটি রাখতে চায় না বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ওসামান্য কাজের জন্য এত বড় প্রতিষ্ঠান এখন রাখতে চাইছে না খোদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি ঢাকা চেম্বারের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এক বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের একটি প্রতিষ্ঠান আছে সিসিআইঅ্যান্ডই, এটির কাজ কী জানেন? সেখানে শুধু আইআরসি ও ইআরসি লাইসেন্স দেওয়া হয়।’ ‘কিন্তু এখানে কি এমন কেউ আছেন যে, আবেদন করে এ লাইসেন্স পাননি? এখানে কেউ রিফিউজ হয় না, চাইলেই পায়। তাহলে যে জিনিস চাইলেই পাওয়া যায় তার জন্য এত ফরমাল অ্যারেজমেন্ট লাগবে কেন?’ বাণিজ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে যোগ করেন, ‘আমরা এ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটালাইজ করবো, আপনারা অনলাইনে অ্যাপ্লাই করবেন, টাকা দেবেন। সেখান থেকে ঘরে বসে ডাউনলোড করে নেবেন।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ প্রতিষ্ঠান নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিকল্প পরিকল্পনার তাগিদ দিয়েছেন মন্ত্রী। সরকারের এসব সিদ্ধান্ত বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই। এমন চিন্তাভাবনা থাকলে সে বিষয়েও আমাদের কিছু বলার নেই।—মোহাম্মাদ মাহমুদুল হক এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) আবদুর রহিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্যার (বাণিজ্যমন্ত্রী) প্রাথমিক একটা নির্দেশনা দিয়েছেন। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি এখন সার্ভিস ডেলিভারি করে, এটি শতভাগ ডিজিটালাইজড হওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠাটি ছোট করা বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া যায় কি না—সে বিষয়ে চিন্তা করতে বলেন। এ নিয়ে কাজ করতে বলেন।’ তিনি বলেন, ‘এটি হলেও তা করা সময়সাপেক্ষ। একটি প্রতিষ্ঠান তো একদিনে হেল্ডআপ করা যায় না। আমরা পর্যালোচনা করে দেখবো কী করা যায়।’ তবে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সিসিআইঅ্যান্ডইয়ের প্রধান নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) খাদিজা নাজনীন কোনো মন্তব্য করেননি। এ কর্মকর্তাও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব। তিনি খুব অল্প সময় সিসিআইঅ্যান্ডইয়ের প্রধান নিয়ন্ত্রকের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রক (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মাদ মাহমুদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের এসব সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই। এমন চিন্তাভাবনা থাকলে সে বিষয়েও আমাদের কিছু বলার নেই।’ এনএইচ/এমকেআর/এমএফএ

Go to News Site