Somoy TV
ইরান যুদ্ধ সপ্তম সপ্তাহে গড়িয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা-বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। কোম্পানিগুলো বলছে, যুদ্ধের কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, ব্যাহত হচ্ছে সরবরাহ ব্যবস্থা। যা পণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে।বিপরীতে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত আর্থিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গত বুধবার (২২ এপ্রিল) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালী বন্ধ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার চিত্র উঠে এসেছে। যার প্রভাব আগামী কয়েক মাসে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। প্রতিবেদন মতে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিভিন্ন কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ, কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও দুর্বল চাহিদার সঙ্গে লড়াই করছিল। যুদ্ধ সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিখ্যাত ডুলাক্স ব্র্যান্ডের রঙ নির্মাতা কোম্পানি আকজোনোবেল বলেছে, যুদ্ধের কারণে সরবরাহ খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী (সিইও) গ্রেগ পক্স-গুইলাম বলেন, ‘হরমুজ প্রণালঢীতে অচলাবস্থার কারণে আমাদের কাঁচামালের খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বাড়বে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে এর পূর্ণ প্রভাব দেখতে পাবো আমরা।’ আকজোনোবেল নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বহুজাতিক পেইন্ট ও কোটিং কোম্পানি। ডেকোরেটিভ পেইন্ট থেকে শুরু করে কার্গো জাহাজ ও ফর্মুলা ১ গাড়িতে ব্যবহৃত বিশেষ আবরণসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি করে তারা। আকজোনোবেলের পণ্যের দাম বাড়লে তা সরাসরি গ্রাহকদের পকেট থেকেই খরচ হয়। আরও পড়ুন: হরমুজে জাহাজ জব্দের তীব্র প্রতিক্রিয়া পানামার রয়টার্সের পর্যালোচনা অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২১টি কোম্পানি তাদের আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দিয়েছে বা প্রত্যাহার করেছে। ৩২টি কোম্পানি দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে এবং ৩১টি কোম্পানি যুদ্ধের কারণে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। ফরাসি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ড্যানোন জানিয়েছে, ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আসা শিশু খাদ্যের চালানগুলো এই যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। গত বছরের তুলনায় তাদের বিক্রয় প্রবৃদ্ধি অনেক কমে গেছে। একইভাবে ডেটল সাবান নির্মাতা কোম্পানি রেকিট তেলের দাম বেশি হওয়ায় তাদের মুনাফা কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। রেকিটের শেয়ারের দামও ৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর যা এখন সর্বনিম্ন। ইরান যুদ্ধে পর্যটন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমানের জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এয়ারলাইন্স ও ট্যুর অপারেটররা টিকিটের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। কিছু ফ্লাইটও বাতিল করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ভোক্তাদের ভ্রমণ আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। আরও পড়ুন: কূটনৈতিক অচলাবস্থার জন্য ট্রাম্পের নৌ অবরোধ দায়ী: ইরান জার্মানির পর্যটন গ্রুপ টিইউআই যুদ্ধের অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে তাদের বার্ষিক মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সও জানিয়েছে, চাহিদা কমায় চাপ পরেছে এবং পুরো বছরের মুনাফা প্রত্যাশার নিচে থাকতে পারে। খনিজ শিল্পের ওপরও চাপ বাড়ছে। খনি কোম্পানি সাউথ ৩২ তাদের অস্ট্রেলিয়ার ম্যাঙ্গানিজ ইউনিটের উৎপাদন কমাতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা তাদের পরিবহন ব্যয় ও কাঁচামালের দাম অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাব কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে তারা এবং পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বাণিজ্যিক ও সামরিক বিমান চলাচলের জন্য এয়ারক্রাফট ইঞ্জিন, সিস্টেম ও সেবা প্রদানকারী বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জিই অ্যারোস্পেসের প্রধান নির্বাহী ল্যারি কাল্প বলেন, ‘যুদ্ধের অনিশ্চয়তা না থাকলে আমরা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়াতে পারতাম।’ একইভাবে শিল্পখাত, শ্রমিকদের সুরক্ষা ও ভোগ্যপণ্য নিয়ে কাজ করে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি থ্রিএম। কোম্পানিটি তাদের পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ এমন সময় শুরু হয়েছে, যখন অনেক কোম্পানি ভালো অর্ডার বা ক্রয়াদেশ নিয়ে বছর শুরু করেছিল। কিন্তু নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা তাদের পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। আরও পড়ুন: লেবাননে সাংবাদিকদের ওপর ইসরাইলি হামলায় সিপিজের তীব্র ক্ষোভ কোম্পানিগুলো এই ধাক্কা সামলে উঠতে পারবে নাকি জ্বালানি ও ভূ-রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার কারণে তারা পণ্যের দাম আরও বাড়াতে বা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনতে বাধ্য হবে—এখন তাই পর্যবেক্ষণ করছেন বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতিবিদরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি না খোলা পর্যন্ত সরবরাহ সংকট কাটার কোনো লক্ষণ নেই।
Go to News Site