Collector
রাজনৈতিক মদতে চলছে অবৈধ পার্কিং বাণিজ্য, নীরব প্রশাসন | Collector
রাজনৈতিক মদতে চলছে অবৈধ পার্কিং বাণিজ্য, নীরব প্রশাসন
Jagonews24

রাজনৈতিক মদতে চলছে অবৈধ পার্কিং বাণিজ্য, নীরব প্রশাসন

পরিচ্ছন্ন ও সাজানো শহর হিসেবে পরিচিত রাজশাহী। তবে বর্তমানে শহরটির প্রাণকেন্দ্র ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো এখন গ্রাস করছে অবৈধ মোটরসাইকেল গ্যারেজ সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় শহরের ঐতিহাসিক ভুবনমোহন পার্ক থেকে শুরু করে পদ্মার পাড়—সবই এখন ব্যক্তিস্বার্থের বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে প্রশাসনের দৃশ্যমান নিষ্ক্রিয়তা, অন্যদিকে নিরাপত্তার অজুহাতে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়; এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পর্যটন নগরী রাজশাহীর সৌন্দর্য ও জনশৃঙ্খলা এখন হুমকির মুখে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কিছু নেতাকর্মী সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এসব অস্থায়ী গ্যারেজ পরিচালনা এবং পার্কিং ফি আদায়ের সঙ্গে জড়িত। সড়কে অবৈধ মোটরসাইকেল গ্যারেজের বিস্তারের ফলে চলাফেরায় ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে বলে জাগো নিউজকে জানান রফিকুল ইসলাম নামের এক পথচারী। তিনি বলেন, সরকারি রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন রাখায় আমাদের দৈনন্দিন পথচলায় সমস্যা হচ্ছে। পাবলিকে প্লেসে এভাবে গ্যারেজ গড়ে তোলা হচ্ছে কিন্তু সিটি করপোরেশনের কোনো পদক্ষেপ নেই। এমন চলতি থাকলে যে-কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান তিনি। অনুমোদনহীন গ্যারেজের চিত্র রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্র তিনটি মোটরসাইকেল পার্কিং স্থানের অনুমোদন রয়েছে—নিউ মার্কেট, বড় কুঠি এলাকা এবং রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও চিড়িয়াখানার সামনে। তবে এর বাইরে পদ্মা নদীর তীরবর্তী লালন শাহ মুক্ত মঞ্চ, টি-বাঁধ ও আই-বাঁধ এলাকায় অন্তত অর্ধডজন অননুমোদিত গ্যারেজ প্রকাশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। আরও পড়ুনআয়ুষ্কাল শেষ ৫ দশক আগে, মরিচা ধরা লাইনেই চলছে উত্তরবঙ্গের রেলযোগাযোগডিজেল সংকটে উত্তরাঞ্চলের চাষিরা, বোরো চাষাবাদ নিয়ে শঙ্কাউৎপাদন খরচের চেয়ে কমছে ডিমের দাম, রাজশাহীতে বন্ধ হচ্ছে ছোট খামার সরেজমিনে দেখা যায়, জনসাধারণের বিনোদন ও নদী সংরক্ষণের জন্য গড়ে ওঠা এসব এলাকায় এখন সারি সারি মোটরসাইকেল পার্ক করে রাখা হচ্ছে। শহরের মালোপাড়া এলাকার ঐতিহাসিক ভুবনমোহন পার্কেও একই চিত্র দেখা গেছে। একসময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই পার্ক এখন আংশিকভাবে গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। পার্কটিতে ১৯৫৩ সালে নির্মিত ভাষা আন্দোলনের ৬৯ জন শহীদের নামাঙ্কিত একটি শহীদ মিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য একটি মঞ্চ রয়েছে। ২০০৫ সালে এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। নেপথ্যে রাজনৈতিক মদত অনুসন্ধানে জানা যায়, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কিছু স্থানীয় নেতাকর্মী সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এসব গ্যারেজ পরিচালনা করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে প্রতিটি মোটরসাইকেল থেকে ২০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয় সোমভু কুমার নামে এক যুবক বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তারা প্রতিটি মোটরসাইকেল থেকে ২০ টাকা করে আদায় করছেন। তার দাবি, রাজশাহী নগর বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নজরুল হুদার অনুমতিতেই এই কার্যক্রম চলছে। তবে একাধিকবার চেষ্টা করেও এ বিষয়ে নজরুল হুদার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন, মোটরসাইকেল চুরি প্রতিরোধে পাহারার বিনিময়ে এই অর্থ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে লালন শাহ মুক্ত মঞ্চসহ অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের কার্যক্রম চালু রয়েছে। এই এলাকায় গ্যারেজ পরিচালনাকারী জামায়াত নেতা মনজুর রাহি বলেন, এলাকায় মোটরসাইকেল চুরি ও মাদকসংক্রান্ত কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরও পড়ুনঅর্ধেকে নেমে এসেছে রাজশাহী অঞ্চলে আখচাষ‘উদাসীনতায়’ ডুবেছে কোটি টাকার বজ্রনিরোধক প্রকল্প, ৬ বছরে মৃত্যু ৬২তীব্র গরমে ফেটে যাচ্ছে লিচু তিনি বলেন, আগে এই স্থানটি মাদকসেবীদের আড্ডাখানা ছিল। এখন এটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে এ কার্যক্রমের কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। হাই-টেক পার্ক এলাকার একটি গ্যারেজের তত্ত্বাবধায়ক সাদ্দাম হোসেন বলেন, স্থানীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য এবং বিষয়টি থানাকে জানানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সংগৃহীত অর্থ চিকিৎসা সহায়তা ও বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যয় করা হয়। তবে তিনিও সরকারি অনুমোদনের অভাবের কথা স্বীকার করেন। ভোগান্তিতে পথচারী-নাগরিক সমাজ সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অবৈধ পার্কিংয়ের ফলে চলাফেরায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পথচারীদের। নগরবাসীর অভিযোগ—এসব অবৈধ গ্যারেজের কারণে পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং শহরের পরিবেশের অবনতি ঘটছে। সড়কে অবৈধ মোটরসাইকেল গ্যারেজের বিস্তারের ফলে চলাফেরায় ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে বলে জাগো নিউজকে জানান রফিকুল ইসলাম নামের এক পথচারী। তিনি বলেন, সরকারি রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন রাখায় আমাদের দৈনন্দিন পথচলায় সমস্যা হচ্ছে। পাবলিকে প্লেসে এভাবে গ্যারেজ গড়ে তোলা হচ্ছে কিন্তু সিটি করপোরেশনের কোনো পদক্ষেপ নেই। এভাবে চলতে থাকলে যে-কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান তিনি। চাকরিজীবী সুজন মাহদী বলেন, অফিস শেষে যখন টি-বাঁধ বা আই-বাঁধ এলাকায় পরিবার নিয়ে একটু খোলা বাতাসে হাঁটতে আসি, তখন দেখি হাঁটার জায়গার চেয়ে মোটরসাইকেলের জটলা বেশি। ফুটপাতগুলো গ্যারেজের দখলে থাকায় আমাদের মেইন রোড দিয়ে হাঁটতে হয়, যা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে অবাক লাগে, সরকারি জায়গায় তারা রীতিমতো স্লিপ ছাপিয়ে ২০ টাকা করে আদায় করছে। প্রতিবাদ করলে উল্টো হেনস্তার শিকার হতে হয়। প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন দখলদারি কাম্য নয়। স্কুল শিক্ষিকা ও পথচারী সুলতানা পারভীন বলেন, ভুবনমোহন পার্কের মতো একটি ঐতিহাসিক ও পবিত্র স্থান, যেখানে শহীদ মিনার রয়েছে, সেখানেও মোটরসাইকেলের স্ট্যান্ড বানানো হয়েছে—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা যারা নিয়মিত এই পথে যাতায়াত করি, তাদের জন্য পথ চলা দায় হয়ে পড়েছে। মোটরসাইকেলগুলো এলোমেলোভাবে পার্ক করে রাখার কারণে সরু গলিতে সবসময় যানজট লেগে থাকে। পার্কগুলো করা হয়েছে মানুষের প্রশান্তির জন্য, সিন্ডিকেটের ব্যবসার জন্য নয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক মদতে ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি জায়গা দখলের প্রবণতা বাড়ছে। এটি রোধে সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জরুরি। তিনি বলেন, বৈধ পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা, সবুজ এলাকা সংরক্ষণ এবং আইন প্রয়োগ জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, যে-কোনো অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন লঙ্ঘনকারী অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এমওএইচএম/কেএইচকে/এএসএম

Go to News Site