Jagonews24
অর্জিত হয়েছে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা একদিকে শ্রমিক সংকট অন্যদিকে চড়া মজুরি ৭০০ টাকায় উৎপাদন করে বিক্রি করতে হচ্ছে ৬৭৫ টাকায় প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝেও হবিগঞ্জে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ। ফসল দেখে কৃষক পরিবারে খুশির বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাদের চোখে এখন শুধু হতাশা আর উৎকণ্ঠা। ধানের দরপতনে উৎপাদিত ফসলের ব্যয় ওঠানো নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষক পরিবারগুলো। অনেকেই দাদনের টাকা পরিশোধ নিয়ে ভুগছেন দুশ্চিন্তায়। সরেজমিনে জানা যায়, জেলার অধিকাংশ হাওরেই বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে অনেক হাওরে পানি জমে থাকায় ধান কাটতে হারভেস্টার নামানো সম্ভব হচ্ছে না। সব সময় শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। আবার পাওয়া গেলেও তাদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এ বছর ধানের দামও গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ধানের দাম না থাকায় কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। ‘বাজারে চাল কিনতে গেলে ঠিকই দামে কিনতে হয়। আমরা ধান বিক্রির সময় ন্যায্য মূল্য পাই না। ধারদেনা শোধ করার জন্য বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করছি।’ আজমিরীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের শুক্রিবাড়ি গ্রামের কৃষক সৌরভ মিয়া জানান, তিনি নিজের ও ইজারা নেওয়া জমি মিলিয়ে মোট ৬৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের বোরো ধান আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘায় গড়ে ১৯ মণ ফলন হয়েছে। ধান কাটাতে বিঘাপ্রতি ৫ মণ শ্রমিকদের দিতে হচ্ছে। অবশিষ্ট থাকছে ১৪ মণ ধান। তা আবার বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭১০ টাকা মণ দরে। আরও পড়ুন- হাওরে জলাবদ্ধতায় ভরা মৌসুমেও সংকটে কৃষকপহেলা বৈশাখের ভোরেই সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটার ধুম‘বাপুরে, ১০০ মণ ধান পেতাম এখন এক মণও পামু না’ তিনি বলেন, ‘বাজারে চাল কিনতে গেলে ঠিকই দামে কিনতে হয়। আমরা ধান বিক্রির সময় ন্যায্য মূল্য পাই না। ধারদেনা শোধ করার জন্য বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করছি।’ শিবপাশা গ্রামের কৃষক আকছির মিয়া বলেন, ‘১৫ বিঘা জমির ধান কেটেছি। প্রতি মণ ধান ৭০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছি। এতে উৎপাদন খরচই উঠবে না। ঋণ দেব কী দিয়ে, আর পরিবার নিয়ে খাবইবা কী? কৃষকের কোনো লাভ নেই। ধানের ন্যায্য মূল্য না পেলে কৃষক বাঁচবে না। আর ন্যায্য মূল্য না পেলে মানুষ কৃষি কাজে আগ্রহও হারাবে।’ জলসুখা গ্রামের কৃষক আক্কাছ মিয়া বলেন, ‘হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটতে বিঘা প্রতি খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। সার, বীজ, নিড়িনি দেওয়া, রোপন করাসহ সব মিলিয়ে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ৭০০ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ৬৭৫ টাকা দরে। এখন ঋণ শোধ করবো কী দিয়ে, আর সংসার খরচই বা চালাবো কোথা থেকে।’ ‘প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ৭০০ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ৬৭৫ টাকা দরে। এখন ঋণ শোধ করবো কী দিয়ে, আর সংসার খরচই বা চালাবো কোথা থেকে।’ হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভদৈ গ্রামের লায়েছ মিয়া বলেন, ‘প্রতি মণ ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে। উৎপাদন খরচই উঠবে না। এখন কৃষি করে আর কোনো লাভ নেই। এমন অবস্থা থাকলে আগামী বছর বোরো আবাদ করবো কি না তার ঠিক নেই।’ আরও পড়ুন- সুনামগঞ্জে আগাম বন্যার শঙ্কা, আধা-পাকা ধান নিয়েই ঘরে ফিরছেন কৃষকইটভাটার ধোঁয়ায় নষ্ট দুইশো বিঘা জমির ধানচেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি: হাওরে বন্যার শঙ্কায় ধান কাটার পরামর্শ পাউবোরশুকিয়ে যাচ্ছে ধানের জমি, তেলের খোঁজে পাম্পে পাম্পে ঘুরছে কৃষক জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আকতারুজ্জামান জানান, লক্ষ্যমাত্রার প্রায় পুরোটাই অর্জিত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় দ্রুত ধান কাটার কাজ চলছে। হাওরের নিচু জমিতে যেখানে মেশিন যেতে পারছে না, সেখানে শ্রমিকরা কাজ করছেন। খুব শিগগিরই জেলার সব হাওরে ধান কাটা শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ করা হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে। এর মাঝে আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ১৪ হাজার ৬০১ হেক্টর, বানিয়াচংয়ে ৩৩ হাজার ৭০৫ হেক্টর, নবীগঞ্জে ১৮ হাজার ৯৫৬ হেক্টর, লাখাইয়ে ১১ হাজার ২০৮ হেক্টর, হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় ৯ হাজার ৩৫০ হেক্টর, শায়েস্তাগঞ্জে ২ হাজার ৭১৫ হেক্টর, মাধবপুরে ১২ হাজার ১৫০ হেক্টর, চুনারুঘাটে ১২ হাজার ৫৪৫ হেক্টর, বাহুবলে ৮ হাজার ৪১৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। এ বছর মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির পানি জমে ২৮১ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এফএ/এএসএম
Go to News Site