Somoy TV
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার, নদী ও নৌপথ আর সুন্দরবনের সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা জনপদ খুলনা আজ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের এক অনন্য সমন্বয়। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সম্ভাবনাময় এই জনপদ আজ পদার্পণ করেছে ১৪৪ বছরে।১৮৮২ সালের এই দিনে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে খুলনার যে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় শনিবার (২৫ এপ্রিল) পালিত হচ্ছে ১৪৪তম খুলনা দিবস। ভৈরব ও রূপসা নদীবিধৌত এই অঞ্চল একসময় ছিল সুন্দরবনের অংশ। বন উজাড় করে গড়ে ওঠা জনপদটির আরেক নাম ছিল ‘নয়াবাদ’। সমুদ্রগর্ভ থেকে জেগে ওঠা এই ভূখণ্ডে প্রাচীনকালেই জনবসতির সূচনা হয় বলে ধারণা করা হয়। পাল ও সেন আমলে বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও মুসলিম শাসনামলে হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর আগমনে এ অঞ্চলে আবাদ, জনবসতি ও ধর্মীয় সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। প্রশাসনিক কাঠামোর সূচনা হয় ১৮৩৬ সালে কিসমত খুলনা মৌজায় ‘নয়াবাদ’ থানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এরপর ১৮৪২ সালে খুলনা মহকুমা গঠিত হয়; যা তৎকালীন সময়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে পরিচিতি পায়। ব্রিটিশ শাসনামলে ভৌগোলিক অবস্থান ও নদীপথের কারণে খুলনার গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৮৮২ সালের ২৫ এপ্রিল গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে খুলনা জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তখন খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা মিলিয়ে জেলার আয়তন ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬৩০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪৩ হাজার ৫০০। ব্রিটিশ কর্মকর্তা ডব্লিউ এম ক্লে ছিলেন প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। আরও পড়ুন: খুলনায় তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং খুলনা নামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে নানা মত। ইতিহাসবিদদের মতে, ‘খুল্লনা’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি; যার অর্থ ছোট নৌকা চলাচলের উপযোগী স্থান। আবার জনশ্রুতি আছে, খুল্লনেশ্বরী দেবীর নামানুসারেই এই নামকরণ। অন্যদিকে আরব বণিকদের ব্যবহৃত ‘আদ খোলনা’ শব্দ থেকেও নামটির উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। একসময় ক্ষুদ্র নৌবন্দর হিসেবে পরিচিত খুলনা ধীরে ধীরে পরিণত হয় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে। পূর্ববঙ্গ ও আসামের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। নীলকরদের আগমন, নীলকুঠি স্থাপন এবং বাজার গড়ে ওঠার মাধ্যমে বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে। বর্তমানে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, মৎস্য ও চিংড়ি শিল্প, পাট বাণিজ্য এবং সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন শিল্প খুলনার অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক করেছে। আরও পড়ুন: খুলনায় তরমুজ চাষ কমলেও খুশি কৃষক মহান মুক্তিযুদ্ধেও রয়েছে খুলনার গৌরবময় ভূমিকা। দীর্ঘ ৯ মাসের লড়াই শেষে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয় এ অঞ্চল। স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ১৯৮৪ সালে বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর খুলনা নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। খুলনা জেলা প্রতিষ্ঠার তারিখ ২৫ এপ্রিল ১৮৮২ হলেও দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন শুরু হয় অনেক পরে। নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে ২০০৯ সাল থেকে প্রতিবছর ২৫ এপ্রিল ‘খুলনা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ইতিহাসের শিকড়, নদীমাতৃক জীবন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আর সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় খুলনা আজও এক সম্ভাবনাময় জনপদের নাম। খুলনা দিবস তাই কেবল একটি উদযাপন নয়, এটি অতীতের গৌরবকে ধারণ করে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের দিন। দিবসটি ঘিরে নগরজুড়ে নেয়া হয়েছে নানা আয়োজন।
Go to News Site