Collector
ভোঁদড় কি ফিরবে? খোকার নাচন দেখবে? | Collector
ভোঁদড় কি ফিরবে? খোকার নাচন দেখবে?
Jagonews24

ভোঁদড় কি ফিরবে? খোকার নাচন দেখবে?

ছেলেবেলায় বাংলা পাঠ্য বইয়ের ছড়া,‘ওরে ভোঁদড় ফিরে চা, খোকার নাচন দেখে যা’। এই ছড়ার পাশে থাকা ছবিটিতে দেখা গিয়েছে, ছোট্ট খোকাকে মা গোসল করানোর সময় তা তাকিয়ে দেখছে দুটি ভোঁদড়। তাইত কবি তার ছড়ায় টেনেছেন ভোঁদড় প্রসঙ্গ। এ ছড়ার কথা আর ছবিই প্রমাণ করে, আগে সচরাচর ভোঁদড় দেখা যেত। তবে এখন আর তেমন ভোঁদড় দেখা যায় না। ভোঁদড়: গোত্র পরিচয় ভোঁদড় বা উদবিড়াল প্রধানত মৎস্যভুক স্তন্যপায়ী প্রাণী। ভোঁদড় বলতে মুস্টিলিডি গোত্রের লুট্রিনি উপগোত্রের প্রাণীগুলোকে বোঝায়, যার মধ্যে আরও আছে উদবিড়াল, নেউল বা বেজি, ব্যাজার ইত্যাদি। বাংলাদেশে ভোঁদড়ের তিনটি প্রজাতি এবং ব্যাজারের একটি প্রজাতি দেখা যায়। ভোঁদড় সাধারণত লিপ্তপদী প্রাণী। এদের শক্ত খাড়া গোঁফ পানির নিচে শিকার করার জন্য বেশ উপযোগী। ভোঁদড় লিপ্তপদী বলে পানির নিচে খুব ভালো সাঁতার কাটতে পারে। পানির ওপরে মাথা না তুলে একবারে আধা কিলোমিটার যেতে পারে এরা। এদের লেজ মোটা আকারের এবং শরীর লম্বাটে গড়নের। বেশিরভাগেরই পায়ে ধারালো নখযুক্ত থাবা আছে। সাঁতার কাটার সময়ে ভোঁদড়ের নাক ও কানের ফুটো বন্ধ থাকে। এদের নাকের ডগায় লম্বা গোঁফের মতো খাড়া লোম থাকে। এই গোঁফ সংবেদনশীল বলে পানির নিচে শিকার ধরতে ভোঁদড়কে সহায়তা করে। এদের গোঁফ যেহেতু খাড়া, তাই জলে ভিজে গায়ে লেপটে যায় না, ঘোলা জলে এই স্পর্শকাতর গোঁফ শিকারের উপস্থিতি জানান দেয়। ভোঁদড়ের হাত-পায়ের পাতাও খুব স্পর্শকাতর। ফলে কাদায় লুকানো ঝিনুক, শামুক, চিংড়ি, কাঁকড়া এদের হাত থেকে রক্ষা পায় না। এদের শক্তিশালী ছুঁচালো দাঁত আর মাড়ি পিচ্ছিল শিকার ধরতে বা মাছের মুড়ো চিবোতে অত্যন্ত কার্যকর। ভোঁদড়ের দেহে দুই স্তর লোম রয়েছে। প্রথম স্তর আকারে ছোট, কোমল এবং তাপরোধী। এই অন্তঃলোম বাতাস ধরে রেখে পানির নিচে এদের দেহ উষ্ণ ও শুকনো রাখে। এই লোমগুলো জলরোধী। দ্বিতীয় স্তরের লোম লম্বা। এই লোমই আমাদের চোখে পড়ে, এগুলো পানিতে ভিজে ওঠে। ভোঁদড় বা উদবিড়ালের একপ্রকার গন্ধ রয়েছে। অভিজ্ঞজনেরাও এ গন্ধকে বাঘের গন্ধ বলে ভুল করতে পারেন। ভোঁদড়েরা দলবেঁধে থাকলে প্রচণ্ড চেঁচায়। অধিকাংশ সময় এরা বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে শিকার খোঁজে। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের সামুদ্রিক ভোঁদড় পাথরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এরা সামনের পা দিয়ে পাথর টেনে তুলে তার সহায়তায় শামুক, ঝিনুক ইত্যাদির খোল ভেঙ্গে থাকে। এরা ভাসমান অবস্থায় বুকের উপরে পাথর রেখে তাকে কামারের নেহাইয়ের মতো ব্যবহার করে। ভোঁদড় আজ যেন গল্প বাংলাদেশে ভোঁদড়ের গল্পকথা এখনকার বৃদ্ধজনরা অনেকেই বলতে পারেন। দেশের অনেক অঞ্চলের অনেকেই ভোঁদড়কে চেনের ‘ধেড়ে’নামে। যে ধেড়ে গ্রামের বাড়ির পুকুর ও খালে দিনরাত মাছ ধরত। আর স্থানীয়রা মাছের শত্রু ভেবে ভোঁদড়কে মারার জন্য নানারকম ফন্দি-ফিকির করত। কখনো কখনো মারাও পড়ত কোনো কোনো ভোঁদড়। সেই ভোঁদড়ের মৃতদেহ নিয়ে বাচ্চারা গ্রামময় ঘুরে বেড়াত ও সেটিকে দেখিয়ে চড়ুইভাতির জন্য চাঁদা হিসেবে চাল-ডাল-লবণ-তেল সংগ্রহ করত। ভোঁদড় আমাদের কী উপকার করে? ভোঁদড় জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থার বা ইকোসিস্টেম নির্দেশক প্রাণী। মাছের ঝাঁক থেকে দুর্বল ও রোগাক্রান্ত মাছ শিকার করে মাছের স্বাস্থ্য ও গুণগত মান বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। জলজ পরিবেশে পানি ও মাটির গুণগত মান রক্ষা করে মাছের প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। ভোঁদড় এখন বিলুপ্তপ্রায় ভোঁদড়সহ বাংলাদেশের সব বন্যপ্রাণী শিকার, হত্যা, ক্রয়, বিক্রয়, পরিবহন ও আটক রাখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও মানুষের শত্রুজ্ঞান ভোঁদড়কে চিরতরে মুছে দিয়েছে। কোনো কোনো ভোঁদড় হয়তো উপর্যুক্ত পরিবেশ না থাকার কারণেও বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে দেশের দক্ষিণের কয়েকটি জেলা, বিশেষ করে সুন্দরবনেই বন্য পরিবেশে ভোঁদড় টিকে আছে। তবে বিভিন্ন কারণে দ্রুতই নষ্ট হচ্ছে ভোঁদড়ের বাস উপযোগী পরিবেশ, আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে ভোঁদড়ের সংখ্যা। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে না পারলে হয়তো সর্বশেষ আবাসও হারাবে ভোঁদড়, হারিয়ে যাবে প্রকৃতির এই সন্তানটি। তাইত প্রশ্ন জাগে, ‘ভোঁদড়’ কি ফিরবে? খোকার নাচন দেখবে? নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হুমায়রা মাহমুদ মনে করেন, জীবনচক্র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোঁদড় নামক প্রাণীটি মূলত বন-জঙ্গলে বসবাস করলেও, এরা খাবারের জন্য নদী-খালের মাছের উপরেই বেশি নির্ভরশীল। তবে দেশব্যাপী নদী-খাল-জঙ্গল কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোঁদড়ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারিয়েছে। বংশবিস্তারের সঠিক পরিবেশ না পাওয়ায়, ধীরে ধীরে প্রাণীটি কমতে কমতে এখন বিলুপ্তির পথে। তবে এখনো সুন্দরবন ও উপকূলের গ্রামগুলোতে ভোঁদড় চোখে পড়ে। যদিও সুন্দরবন থেকে অনেক ভোঁদড় সংগ্রহ করে, তা মাছ ধরার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সুন্দরবন থেকেও ভোঁদড় কমে যাচ্ছে। তিনি জানান, নরসিংদী জেলার বেশকিছু গ্রামের কিছু কিছু পরিবার এখনো সেই প্রাচীন পদ্ধতিতে মাছ ধরার ক্ষেত্রে ভোঁদড় ব্যবহার করে থাকেন। মাছ ধরার পরে, ঐ ভোঁদড়গুলোকে তারা খাঁচায় ভরে রাখেন। ফলে সেসব ভোঁদড় বেচে থাকার আয়ুষ্কাল হারাচ্ছে, অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে। ফলে আবার নতুন করে সুন্দরবন থেকে ভোঁদড় ধরে আনা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াও ভোঁদড় নিধনের অন্যতম আরেকটি কারণ। হুমায়রা মাহমুদ আরও বলেন, ‘ভোঁদড় বাঁচাতে চাইলে- তার বাসস্থানকে বাঁচাতে হবে। এছাড়া ভোঁদড়কে ব্যবহার করা যায়, এমন সব প্রক্রিয়াই বন্ধ করতে হবে। যেহেতু এটা বন্যপ্রাণী আইন দ্বারা সংরক্ষিত, সেহেতু এই প্রাণীটি কোনো কাজে ব্যবহার হওয়ার সুযোগও নেই। পাশাপাশি সচেতনতা আনয়নের মাধ্যমে ভোঁদড় রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’ আরও পড়ুনডিম পাড়তে এসে জীবন দিতে হচ্ছে কচ্ছপদেরপৃথিবীর আদি প্রাণী পিঁপড়ার জীবনব্যবস্থা আমাদের কী শিক্ষা দেয় কেএসকে

Go to News Site