Somoy TV
বাউল আর বাউলপ্রেমীদের মিলনমেলায় স্মরণ করা হলো উপমহাদেশের প্রখ্যাত বাউল সাধক সুনীল কর্মকারকে। ময়মনসিংহ নগরীর টাউন হল আঙিনায় বাতাসে ভেসে বেড়ানো সুর, মাটির গন্ধ আর মানুষের আবেগ মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠে স্মরণায়োজনে।বাউল সাধক সুনীল কর্মকারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) স্মরণায়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়। ‘সুনীল আলোয় বাউল সুর’ শিরোনামে এ স্মরণায়োজনে বিকেল গড়াতেই শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল পর্ব। সুনীল কর্মকারের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র বেহালার সম্মিলিত সুরে সূচনা মুহূর্তেই ছুঁয়ে যায় উপস্থিত দর্শকদের হৃদয়। বেহালার সেই বিষণ্ন, বিরহী সুর যেন স্মৃতির দরজা খুলে দেয়; দর্শকের চোখের কোণ ভিজে ওঠে অজান্তেই। এরপর সমবেত কণ্ঠে ভেসে ওঠে ‘এ বিশ্ব বাগানে’ গান। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এ মিলনমেলায় সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আয়োজন পায় অন্য মাত্রা। ৭টার দিকে শুরু হয় বাউল সাধক সুনীল কর্মকারের জীবন, দর্শন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা পর্ব। এতে অংশ নেন বাউল সিরাজ উদ্দীন খান পাঠান, বাউল ফকির আবুল সরকার, লোকশিল্পী ও গবেষক মৌসুমী ভৌমিক, লোকগবেষক ড. আব্দুর রহমান খোকনসহ আরও অনেকে। কলকাতার লোকশিল্পী ও গবেষক মৌসুমী ভৌমিক স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগী কণ্ঠে বলেন,একবার উকিল মুন্সির গান সম্পর্কে জানার জন্য তিনি সুনীল কর্মকারের কাছে গিয়েছিলাম। বাইরে বসে থাকা অবস্থাতেই ভেসে আসে তার কণ্ঠস্বর যা আমাকে মোহিত করেছিল। চোখে আলো না থাকলেও তিনি ধ্বনির মধ্য দিয়ে ভুবনটাকে দেখেছেন। এই অনুভবের মধ্য দিয়েই আমি সুনীল কর্মকারের অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাই প্রথম সাক্ষাতেই। লোকগবেষক ড. আব্দুর রহমান খোকন বলেন,বাহ্যিকভাবে দৃষ্টিহীন হলেও সুনীল কর্মকারের অন্তর্দৃষ্টি ছিল উন্মুক্ত ও গভীর। তিনি ছিলেন মা-মাটি-মানুষের শিল্পী। সত্যিকারের একজন মানুষের যেসব গুণাবলী থাকা প্রয়োজন, সবই ছিল তার মধ্যে। তিনি আরও বলেন,এ স্মরণায়োজনে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণই প্রমাণ করে যারা মানুষের কথা বলে, মরমি সঙ্গীতের কথা বলে, তারা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন চিরকাল। এটাই সুনীল কর্মকারের প্রকৃত সার্থকতা। বাউল সুনীল কর্মকার স্মরণায়োজন কমিটির সদস্যসচিব শামীম আশরাফ বলেন,সুনীল কর্মকার শুধু একজন বাউল ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানবপ্রেমী এক সাধকসত্তা এবং শান্তির পক্ষে প্রতিবাদী কণ্ঠ। তার স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান কেবল শ্রদ্ধা নিবেদন নয় বরং তার দর্শন ও চেতনার বহিঃপ্রকাশও। আরও পড়ুন: শিবলী-নীপার ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এ মুগ্ধ তারকারা স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন। জানান, সুনীল কর্মকারের জীবন মানেই ছিল লোকসংগীতের প্রতি নিবেদন। এই সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়াই ছিল তার সাধনা। যারা তাকে স্মরণ করেছেন, তারা কেবল দায়িত্বই পালন করেননি, বরং নিজেদের আরও মহৎ করে তুলেছেন। সুনীল কর্মকারের আলো আমাদের ছুঁয়ে গেলে আমরাও আলোকিত হতে পারবো। তাই সম্মিলিতভাবে তার জীবন ও কর্মকে ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান রুকুনোজ্জামান রোকন। আরও পড়ুন: নেটদুনিয়ায় সাড়া ফেলেছে সাবিনার নতুন ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ আলোচনা শেষে আবারও জমে ওঠে সঙ্গীতের আসর। বাউল ফকির আবুল সরকার গেয়ে ওঠেন ‘আসতো যদি প্রাণ বন্ধু, দুঃখ রইতো না’। তার কণ্ঠে মঞ্চ যেন হয়ে ওঠে আবেগ আর মরমি সুরের এক অনন্য মেলবন্ধন। রাত যত গভীর হয়, ততই গাঢ় হয় সুরের আবেশ। জালাল খাঁ ও লালনের গান ধ্বনিত হতে থাকে চারপাশে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অর্ধশতাধিক শিষ্য ও ভক্ত সুরে সুরে, গানে গানে মধ্যরাত পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানান প্রিয় সাধককে।
Go to News Site