Somoy TV
১০ থেকে ১২ হাজার টাকা দিলেই মিলছে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। টেলিগ্রামের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া এসব প্রশ্ন বোর্ড পরীক্ষার সঙ্গে মিলেও যাচ্ছে হুবহু। সম্প্রতি শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার ‘প্রশ্নফাঁস’র গুঞ্জনের বিষয়ে সময় সংবাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে বেশ কয়েকটি টেলিগ্রাম গ্রুপ, যেখানে প্রশ্ন কিনতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের এক করে দেয়া হচ্ছে সব বোর্ডের প্রশ্ন। দেয়া হয় দাখিল ও এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষার প্রশ্নও। ভালো ফলাফলের আশায় সেই প্রশ্ন কিনছে অনেক শিক্ষার্থী।পরীক্ষা শুরুর কয়েকদিন আগে থেকে ফেসবুক ও টেলিগ্রামের বিভিন্ন প্রাইভেট গ্রুপে এসএসসির প্রশ্ন বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়া শুরু করে চক্রটি। গ্রুপে যুক্ত করে এক করা হয় শিক্ষার্থীদের। সেখান থেকে বাছাই করে যুক্ত করে নেয়া হয় টেলিগ্রামের আরেকটি সিক্রেট গ্রুপে। এর পর শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য ২০ এপ্রিল রাত ১১ টায় গ্রুপটিতে ফ্রীতে দেয়া হয় প্রশ্ন। যা ২১ এপ্রিলের বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষার সাথে হুবহু মিলে যায়।ওই গ্রুপ থেকে প্রশ্ন ক্রয় করা এসএসসি পরীক্ষার্থী ফাহিম ফয়সাল সময় সংবাদকে বলেন, ‘পরীক্ষার দুদিন আগে অনলাইন হঠাৎ একটি লেখা দেখতে পাই, যেখানে লেখা ছিল, ‘এসএসসি পরীক্ষার সকল বোর্ডের প্রশ্ন দেয়া হচ্ছে।’ প্রথমে বিশ্বাস না করলেও লিংকে দেয়া গ্রুপ জয়েন হতে রিকয়েস্ট পাঠাই। তারপর আমাকে অ্যাড করে নেয়া হয়। এরপর গ্রুপটিতে বলা হয় পরীক্ষার আগের দিন রাতে প্রশ্ন দেয়া হবে। পরে ২০ এপ্রিল রাতে ওই গ্রুপটিতে বলা হয় সমস্যার কারণে প্রশ্ন দেয়া হবে না। পরদিন নিজের মতো করে পরীক্ষা দেই। কিন্তু ২১ এপ্রিল পরীক্ষা দিয়ে বাসায় এসে সেই গ্রুপে আবার ঢুকি। দেখি সেখানে আরেকটি গ্রুপের লিংক দেয়া আছে এবং বলা আছে লিংকে দেয়া গ্রুপে গেলেই প্রশ্ন মিলবে। পরে সেই গ্রুপে ঢুকে রীতিমতো অবাক হই। সেখানে আগের দিন রাতেই সকল বোর্ডের প্রশ্ন দেয়া ছিল। ১১ টা ২৪ মিনিটে দেয়া হয় দিনাজপুর বোর্ডের প্রশ্ন, যা আমার দেয়া পরীক্ষার সাথে হুবহু মিলে যায়!ফাহিম আরও বলেন, ‘বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষার পর থেকেই ব্যবসায় নামে চক্রটি। বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষার প্রশ্নের জন্য চাওয়া হয় বোর্ডভেদে ১০ থেকে ১৪ হাজার টাকা। যা কিনে নেন অনেক শিক্ষার্থী। এটি আসলেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্র কিনা তা যাচাইয়ের জন্য আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ১০ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে সেই প্রশ্ন নেই। যা বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষার সাথে হুবহু মিলে যায়।’একই গ্রুপ থেকে প্রশ্ন পাওয়া আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি যে সত্যি সত্যি প্রশ্ন পাওয়া যাবে। কিন্তু ২০ তারিখ দেয়া বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষার প্রশ্ন যখন হুবহু মিলে যায়, তখন কিছুটা বিশ্বাস হয়। পরে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নের টাকা দিতে হয়। সে প্রশ্নটিও মিলে যায়।’আরও পড়ুন: সব বাধা ভেঙে রংপুরে তৃতীয় লিঙ্গের ২৮ শিক্ষার্থীর এসএসসি পরীক্ষাএদিকে এমন সংবাদের পর ক্ষোভ জানিয়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তারা বলেন, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী যেখানে নকল প্রতিরোধে এতটা তৎপর সেই সময় প্রশ্ন ফাঁস হওয়াটা চরম উদ্বেগের। এমন ঘটনা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবিও জানান তারা।টেলিগ্রামে গ্রুপটির নাম দেয়া হয়েছে ‘সকল বোর্ড প্রশ্ন ২০২৬।’ এছাড়া পেমেন্টের জন্য রয়েছে বোর্ডভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই এই চক্রকে রুখে দিয়ে প্রশ্নফাঁস বন্ধ করা না গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ শিক্ষা ব্যবস্থায়।বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উমর ফারুক বলেন, ‘একটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন যখন পাওয়া যাচ্ছে পরীক্ষার আগে, এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। এ ঘটনাই বলে দেয় আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, যে কারণে আমরা আমাদের সন্তানদের পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা দিতে পারছি না। আমরা দীর্ঘদিন থেকে দেখছি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের যে কলঙ্ক সেটি থেকে আমরা কিছুটা কাটিয়ে উঠেছিলাম আবার যদি আমরা সেই কলঙ্কের মধ্যে পড়ি, তাহলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলবে। আমরা প্রত্যাশা করি যেকোনো মূল্যে হোক না কেন এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে হবে। এবং সরকারকে একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নানাবিধ সংকট রয়েছে। সব সংকটকে নিয়ে কাজ করতে হবে, যদি সরকার কোনো একটি জায়গায় শুধু ফোকাস করে তাহলে শিক্ষাটা অনেকখানি বাধাগ্রস্ত হবে।’
Go to News Site