Jagonews24
দেশের ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংকটে। অনিয়ম, লুটপাট ও তারল্য সংকটে হারিয়েছিল গ্রাহকের আস্থা। এরই মধ্যে একীভূত হয়েছে পাঁচ ব্যাংক। হারানো আস্থা ফিরতে শুরু করলেও নতুন একটি আইনি পরিবর্তন গ্রাহকদের ফেলেছে নতুন দোলাচলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। জানুয়ারি শেষে যা ছিল ৪ লাখ ৪ হাজার ২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক মাসে আমানত বেড়েছে ২ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ। ব্যাংকটি ১০টি হলো- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, এক্সিম ব্যাংক পিএলসি, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। তবে কোন ব্যাংকের আমানত কত বেড়েছে বা কমেছে সে তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ২৪ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। আস্থা ফিরছে, বলছে ব্যাংকগুলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। এখন আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আরও ভালো করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, ‘শুধু গত মঙ্গলবারই (২১ এপ্রিল) আমাদের ব্যাংকে প্রায় ৩শ কোটি টাকা নতুন আমানত এসেছে। আমরা গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে কাজ করছি। আশা করছি, এই ধারা অব্যাহত থাকবে।’ পেছনের সংকট বিগত সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থপাচারের ঘটনায় ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়ায় তৈরি হয় তীব্র তারল্য সংকট। গ্রাহক আস্থা হারিয়ে আমানত তুলে নেওয়া শুরু করে। বন্ধ করে দেওয়া হয় নতুন আমানত রাখা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাপক আস্থাহীনতা তৈরি হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগে সেই আস্থা কিছুটা ফিরে আসে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নতুন আইনে বাড়ছে উদ্বেগ সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। নতুন আইনে একীভূত ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকদের তুলনামূলক সহজ শর্তে আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠন এবং দায়ীদের স্থায়ীভাবে মালিকানা থেকে সরিয়ে দেওয়া। তবে নতুন আইনের ১৮(ক) ধারায় মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করেই সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ দেওয়ায় সেই উদ্দেশ্য অনেকটাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে নামমাত্র অর্থে বিতর্কিত মালিকদের জন্য আবারও ব্যাংকে ফেরার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, পুরোনো অনিয়মকারীরা ফিরে এলে আবারও ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং গ্রাহক আমানত তুলে নিতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের ধারা যুক্ত করার বিরোধিতা করেছিল। তাদের আশঙ্কা, সাবেক মালিকরা ফিরে এলে ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামো ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। ইসলামী ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, আস্থা ফিরছে, তবে নতুনভাবে শঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। আর ইসলামী ব্যাংকে সংকট তৈরি হলে পুরো খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে। গ্রাহকদের মধ্যেও রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক ও ব্যবসায়ী হাসান আল বান্না জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক থেকে বিগত ১৫ বছর লুটপাট করা হয়েছিল। একটা পর্যায়ে আমার আমানত আমাকে ফেরত দিতে পারছিল না ব্যাংকটি। তবে ফ্যাসিবাদ বিদায় হওয়ার পরে ব্যাংকটি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমরাও ব্যাংকে আমানত রাখা শুরু করেছি। এখন পুরোনো সেই ব্যাংক লুটেরা যদি আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় তাহলে আমাদের আবার ভাবতে হবে আমানত রাখবো কি রাখবো না।’ এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার পদক্ষেপে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরতে শুরু করেছিল। নতুন আইন পাসের ফলে আবারও আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। যাদের কারণে একসময় ব্যাংকগুলো বিপর্যস্ত হয়েছিল, তারা যদি আবার নিয়ন্ত্রণে আসে, তাহলে আমানতকারীরা ঝুঁকিতে পড়বেন।’ তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক নানা আন্দোলন, চাকরিচ্যুতদের বিক্ষোভ ও ব্যাংক দখলের আশঙ্কা- এসব বিষয়ও গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকে আমানত বাড়ছে এটা বোঝায় যে আস্থা ফিরছে। তবে খেলাপিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণে আনা হলে সেই আস্থায় চিড় ধরতে সময় লাগবে না।’ অন্য সূচকে মিশ্র চিত্র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামি ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয়, আমদানি ও রপ্তানি লেনদেনে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। প্রবাসী আয়ে জানুয়ারিতে ৭২ কোটি ডলার ও ফেব্রুয়ারিতে ৬৩ কোটি ডলার এসেছে। আমদানি বিল পরিশোধে ৯২ কোটি ডলার থেকে কমে ৬৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর রপ্তানি আয়ে ৫৪ কোটি ডলার থেকে কমে হয়েছে ৪৯ কোটি ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- গ্রাহকদের এই ফিরে আসা আস্থা ধরে রাখা। এজন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। ইএআর/এএসএ/এমএফএ
Go to News Site