Collector
সিদ্ধান্তে স্থবিরতায় বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য খাত? | Collector
সিদ্ধান্তে স্থবিরতায় বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য খাত?
Jagonews24

সিদ্ধান্তে স্থবিরতায় বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য খাত?

আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের মূল সংকটগুলো নতুন নয়। চিকিৎসক সংকট, জনবলের ঘাটতি, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এসবই দীর্ঘদিনের সমস্যা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল, তারা অন্তত কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেবে। কারণ রাজনৈতিক চাপ বা জনপ্রিয়তার হিসাবের বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তাদের ছিল। বাস্তবে দেখা গেছে, সমস্যা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও সমাধান বাস্তবায়নে কোনো গতিই ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেবার মান বাড়বে, গতি বাড়বে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে। এসব কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে বলে বাস্তব চিত্র ইঙ্গিত দেয়। দেড় বছরের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যার গভীরতা যেমন ছিল, তা রয়ে গেছে; বরং কিছু ক্ষেত্রে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেসব সমস্যা আগেই চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব। দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতের ১০টি বড় সংকট চিহ্নিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এতে বোঝা গিয়েছিল সরকার অন্তত সমস্যাগুলো উপলব্ধি করছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, চিহ্নিতকরণের পর কী করা হয়েছে? ৩৩টি জরুরি সুপারিশের মধ্যে মাত্র ৬টি বাস্তবায়ন হওয়া কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং নীতিনির্ধারণের দুর্বলতার প্রতিফলন। স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি এসেছে টিকাদান ব্যবস্থায়। সময়মতো ভ্যাকসিন সংগ্রহে ব্যর্থতা যে কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি এবং মৃত্যুর ঘটনা নিছক পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি ব্যর্থ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বছরের শুরুতেই হাম শনাক্ত হওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। একটি সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে বিলম্বের অর্থ হলো সংক্রমণের বিস্তার। এই সংকট কেবল একটি রোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকিও বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হলো প্রতিরোধমূলক সেবা, আর সেটিই যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের বিষয়টিও গভীরভাবে হতাশাজনক। জাতীয় বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত কম। স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করতে হলে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এখানে বরং স্থবিরতা দেখা গেছে। অর্থের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায়নি, আবার কিছু ক্ষেত্রে পরিকল্পনাই করা হয়নি। এখানে একটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো হেলথ সেক্টর প্রোগ্রাম বা অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে বেরিয়ে আসা। এই কাঠামোর মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এটি বাতিল করার ফলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি এবং টিকাদানসহ ৩৭টির বেশি কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে। কোনো বিকল্প কাঠামো প্রস্তুত না রেখেই এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রশাসনিক দূরদর্শিতার অভাবকেই নির্দেশ করে। স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো কেন্দ্রীয়করণ। বিশেষজ্ঞনির্ভর চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে উপেক্ষা করার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। এর ফলে গ্রামের মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হয় এবং ছোট সমস্যাও বড় আকার ধারণ করে। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে পরিবর্তনের কথা বললেও বাস্তবে তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। চিকিৎসকদের মনোবলও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন সময় চিকিৎসকদের অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, ঘন ঘন বদলি এবং নীতিগত অস্পষ্টতা চিকিৎসকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সাবেক মহাপরিচালক মো. আবু জাফর উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে উঠা সহজ ছিল না, কিন্তু সেটি মোকাবিলায় সুসংগঠিত পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল, যা যথেষ্টভাবে দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল সীমাবদ্ধতা কোথায় ছিল? এটি কি কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা, নাকি রাজনৈতিক ও কাঠামোগত বাধা? বাস্তবতা সম্ভবত দুইয়ের মিশ্রণ। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো এক বছরে বদলানো সহজ নয়। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যে সাহসী ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, তার অভাব স্পষ্ট। স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার কেবল নীতিমালা প্রণয়ন দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহি। স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ওষুধশিল্প। এই খাতকে ঘিরে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ একদিকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা পুরো খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিনির্ভরতা এবং বিতর্কিত নিয়োগও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে নূরজাহান বেগমের নিয়োগ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। মুহাম্মদ ইউনূস-এর মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েও যখন জবাবদিহির দাবি ওঠে, তখন তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- অন্তর্বর্তী সরকারের মূল সীমাবদ্ধতা কোথায় ছিল? এটি কি কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা, নাকি রাজনৈতিক ও কাঠামোগত বাধা? বাস্তবতা সম্ভবত দুইয়ের মিশ্রণ। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো এক বছরে বদলানো সহজ নয়। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যে সাহসী ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, তার অভাব স্পষ্ট। স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার কেবল নীতিমালা প্রণয়ন দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহি। এই তিনটির কোনোটিই যথেষ্টভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে সমস্যা চিহ্নিত হলেও তার সমাধান হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, এই ব্যর্থতার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। একজন রোগীর কাছে স্বাস্থ্যসেবার মানে হলো সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া এবং মানবিক আচরণ পাওয়া। যখন এসব নিশ্চিত করা যায় না, তখন পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংকট, অন্যদিকে রয়েছে পরিবর্তনের সুযোগ। অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ভবিষ্যতে যে সরকারই দায়িত্ব নিক, তাদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা; শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নই মূল বিষয়। স্বাস্থ্য খাতকে পুনর্গঠনের জন্য কয়েকটি বিষয় এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রথমত, বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থত, প্রশাসনিক কাঠামোকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এবং সর্বোপরি, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্য খাত কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। এই খাতে ব্যর্থতা মানে মানুষের জীবন নিয়ে ঝুঁকি তৈরি করা। তাই সময় এসেছে কাগজে-কলমের পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে বাস্তব পরিবর্তনের পথে হাঁটার। না হলে একই সংকট বারবার ফিরে আসবে, আর তার মূল্য দিতে হবে জনগণকেই। লেখক: ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর। এইচআর/জেআইএম

Go to News Site