Collector
‘হয় এবার, নয় নেভার’- বাংলা দখলে বিজেপির অঙ্ক কতটা জটিল ? | Collector
‘হয় এবার, নয় নেভার’- বাংলা দখলে বিজেপির অঙ্ক কতটা জটিল ?
Somoy TV

‘হয় এবার, নয় নেভার’- বাংলা দখলে বিজেপির অঙ্ক কতটা জটিল ?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার আগে বিজেপির প্রচারের ছবি দেখলে একটা বিষয় স্পষ্ট—এই ভোটকে গেরুয়া শিবির আর সাধারণ রাজ্য নির্বাচন হিসেবে দেখছে না। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে তারকা প্রচারক—সবাইকে নামিয়ে বাংলায় শেষ মুহূর্তে চাপ তৈরি করতে চাইছে দল।দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করছে, বিজেপির শীর্ষ নেতারা দলের তৃণমূল স্তরের নেতা-সমর্থকদের বার্তা দিয়েছেন—‘হয় এবার, নয় নেভার।’ দলটির নীতিনির্ধারকরা যে কারণে এবার আশায় বুক বাঁধছেন, তার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে দলের উত্থানের পরিসংখ্যান। বিজেপি সমর্থকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান একদিনে হয়নি। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে যে দল মাত্র ৩টি আসনে সীমাবদ্ধ ছিল, ২০২১ সালে সেই দলই ৭৭ আসনে পৌঁছে যায়। তৃণমূল শক্ত হাতে ক্ষমতা ধরে রেখেছিল ঠিকই, কিন্তু বিজেপি হয়ে ওঠে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি। এই উত্থানই এবারের নির্বাচনে বিজেপির ভিতরে ‘মসনদ দখল’-এর বিশ্বাস তৈরি করেছে। আরও পড়ুন:দলীয় প্রচারে তারকা প্রার্থীরা নিজেই এবার প্রচারের আলো খুঁজছেন! বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে মাঠপর্যায়ের সমর্থকরা এখন মনে করছেন, শক্তিশালী তৃণমূলকে হারানো অসম্ভব নয়। আর সেই বিশ্বাস থেকেই ২০২৬-এর নির্বাচনে তারা শুধু ভালো ফল নয়, সরাসরি সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই হিসেব থেকেই দ্বিতীয় দফার আগে বিজেপির প্রচারে এত ঝাঁজ। ২৯ এপ্রিল ভোট হবে ১৪২টি আসনে। এই দফার বড় অংশ কলকাতা ও তার আশপাশের এলাকা, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব বর্ধমানের মতো জেলায়। ২০২১ সালে এই বলয়ের বড় অংশ ছিল তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। তাই বিজেপির কাছে এই দফা শুধু আরেকটি ভোটপর্ব নয়, বরং তৃণমূলের পুরনো জমিতে ফাটল ধরানোর শেষ বড় পরীক্ষাও। দ্বিতীয় দফার আগে বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মন্তব্য ও বক্তব্যও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহের মতো নেতারা যখন আত্মবিশ্বাসী গলায় তৃণমূলকে কড়া বার্তা দেন, তখন তা অনেক ভোটারের কাছে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনাকে আরও বাস্তব বলে তুলে ধরতে পারে। ফলে দ্বিতীয় দফায় ভোট নষ্ট না করে বিজেপিকে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন একাংশের ভোটার।এটিকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রসঙ্গত, বিজেপির প্রচারের সবচেয়ে বড় মুখ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিজেপি জানে, বাংলায় সংগঠন যতই বাড়ুক, মোদির মুখ এখনও তাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় পুঁজি।ভারতের বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বিজেপির প্রচারকে ‘হাই-ভোল্টেজ ক্যাম্পেইন ব্লিটজ’ বলা হচ্ছে। এই প্রচারের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে মোদিকেই। তার সভায় বারবার উঠে আসছে দুর্নীতি, নারী নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের কথা। মোদির বার্তা সরাসরি- বাংলা বদল চাইছে, বিজেপি এলে সুশাসন ফিরবে। ‘বাংলায় পরিবর্তনের হাওয়া তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য বিজেপি দরকার’— এটাই নরেন্দ্র মোদির এবারের প্রচারের মূল সুর। বিজেপির আরেক হাইপ্রোফাইল মুখ অমিত শাহ। ভোট বিশ্লেষকদের দাবি, এবারের ভোটে বিজেপির সবচেয়ে আক্রমণাত্মক কৌশল তার হাতেই। প্রথম দফার ভোটের পর অমিত শাহ দাবি করেছেন, বিজেপি প্রথম দফার ১৫২টির মধ্যে ১১০টির বেশি আসনে জিতবে। বিজেপির এই সেকেন্ড ইন কমান্ডের বক্তব্যে শুধু আত্মবিশ্বাস নয়, তৃণমূলকে চাপে রাখার কৌশলও স্পষ্ট। দ্বিতীয় দফা নিয়েও তিনি বলেছেন, বিজেপি আরও বেশি আসন এবং বেশি ব্যবধানে জিতবে।‘তৃণমূলের ভয় দেখানোর রাজনীতি শেষ হবে। বাংলায় এবার ভয় নয়, বিশ্বাসের ভোট হবে’— অমিত শাহের প্রচারের মূল সুর এটিই বলেই মনে করছেন বিজেপির প্রচার-কৌশল নির্ধারণকারীরা। অনেকেই মনে করেন, অমিত শাহের এই ভাষা শুধু নির্বাচনী দাবি নয়, বিজেপির মনস্তত্ত্বকেও পরিষ্কার করে। দলটি ভোটারকে বলতে চাইছে—তৃণমূলকে হারানো সম্ভব, শুধু ভোট দিতে বেরোতে হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রচারে মূলত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব, মতুয়া-নমশূদ্র সমাজ, নারী নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন উঠে এসেছে। এরপর বিজেপির প্রচারে সবচেয়ে আলোচিত মুখ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তার প্রচারের ভাষা অন্যদের তুলনায় বেশি কড়া। যোগী বাংলায় আইনশৃঙ্খলা, দুষ্কৃতী দমন এবং ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের কথা বলছেন। বিজেপি তাকে ব্যবহার করছে শক্ত প্রশাসনের প্রতীক হিসেবে। যোগীর বার্তা সেই ভোটারদের লক্ষ্য করে, যারা মনে করেন বাংলায় কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দরকার।‘ডবল ইঞ্জিন সরকার এলে বাংলায় দুষ্কৃতীদের দাপট থাকবে না, আইনের শাসন ফিরবে’— যোগীর এমন মন্তব্য রাজ্যের এক শ্রেণির ভোটারের মন জয় করতে পারে। তবে আরেক অংশের মধ্যে এই বক্তব্য ভয়ও তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। আলোচনায় রয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও। বিজেপির প্রচারে তিনিও অন্যতম ধারালো মুখ। তার বক্তব্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ, তোষণ, সংখ্যালঘু রাজনীতি এবং বাংলার পরিচয়ের প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে। বিজেপির প্রচারে হিমন্তের ভূমিকা অনেকটা সরাসরি আক্রমণকারীর—যিনি তৃণমূলকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বাংলার সামাজিক ভারসাম্য নষ্টের জন্য দায়ী বলেও তুলে ধরছেন। ‘৪ মে’র তারিখের পর তৃণমূল নেতারা অসম, বিহার, ঝাড়খণ্ডে যেতে পারবেন না। মুর্শিদাবাদ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পালাবেন। ‘আর তারা একবার বাংলাদেশে চলে গেলে সীমান্তের এপার থেকে বিজেপি তালা লাগিয়ে দেবে’— হিমন্তের নির্বাচনী প্রচারে এমন মন্তব্য নিয়েও তুমুল চর্চা চলছে।  তবে বিজেপির প্রচার-ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটে হিমন্তের প্রচারের মূল সুর রাখা হয়েছে— ‘বাংলায় অনুপ্রবেশ ও তোষণের রাজনীতি বন্ধ করতে হলে বিজেপিকেই দরকার।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপির প্রচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এবার সামনে এসেছে। সেটি হলো ধর্মীয় মেরুকরণের সুর। অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব, তোষণ, সংখ্যালঘু রাজনীতি—এই শব্দগুলো বিজেপির সভা ও রোড শোতে বারবার শোনানো হচ্ছে। বিজেপি এগুলোকে ভোটারদের সামনে এমনভাবে তুলছে, যাতে ভোটাররা নিরাপত্তা ও পরিচয়ের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান বিচার করতে পারেন। বিজেপি এই দফার প্রচারে শুধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, যোগী আদিত্যনাথ বা হিমন্ত বিশ্বশর্মাতেই থেমে নেই। বরং গেরুয়া শিবির কমপক্ষে ৪০ জন তারকা প্রচারককে ময়দানে নামিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন রাজনাথ সিংহ, জেপি নাড্ডা, নিতিন গডকরি, ধর্মেন্দ্র প্রধান, অশ্বিনী বৈষ্ণব, শিবরাজ সিংহ চৌহানদের মতো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। রয়েছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি। তালিকায় মিঠুন চক্রবর্তী, হেমা মালিনী, কঙ্গনা রনৌত, স্মৃতি ইরানি, মনোজ তিওয়ারি এবং লিয়েন্ডার পেজের মতো তারকা মুখও রয়েছে।বিজেপির এই ৪০ জনের তালিকাই দেখাচ্ছে, বাংলার ভোটকে তারা সর্বভারতীয় রাজনৈতিক অভিযানে পরিণত করেছে। রাজ্য স্তরে বিজেপির সবচেয়ে আক্রমণাত্মক মুখ শুভেন্দু অধিকারী। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যেখানে বড় বার্তা দিচ্ছে, শুভেন্দুর কাজ সেই বার্তাকে স্থানীয় ক্ষোভের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া। মানুষের অনুভূতিতে গেঁথে থাকা চাকরি, দুর্নীতি, পঞ্চায়েত, পুলিশ-প্রশাসন, নারী নিরাপত্তার মতো ইস্যুতে তিনি তৃণমূলকে আক্রমণ করে লক্ষ্যভিত্তিক ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ এই বিজেপি নেতার সঙ্গে রয়েছেন সুকান্ত মজুমদার, শমীক ভট্টাচার্য, দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পালদের মতো রাজ্য নেতা-নেত্রীরা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মঞ্চ গরম করছেন, আর রাজ্য নেতৃত্ব সেই বার্তাকে বুথ ও পাড়ায় নামিয়ে আনছে। নিজস্ব ভাষায় কৌশলে আবেগকে উসকে দেয়ার কাজও চলছে সমান্তরালভাবে।এই প্রচারের পেছনে বিজেপির অঙ্ক এবার খুব সহজ। দলটি হিসেব মেলাচ্ছে—২০১৬-তে ৩ আসন থেকে ২০২১-এ ৭৭ আসনে পৌঁছেছে তারা। এই উত্থানই বিজেপিকে বলছে, বাংলায় আরও এক ধাক্কা দিলেই ক্ষমতার দরজা খুলতে পারে। আর তৃণমূলের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, সেই ধাক্কা ঠেকিয়ে নিজেদের পুরনো জমি ধরে রাখা। বিশেষ করে দ্বিতীয় দফার দক্ষিণবঙ্গ-নির্ভর আসনগুলোতে ফল ঠিক করে দিতে পারে, বিজেপির সর্বশক্তির প্রচার কতটা বাস্তব ভোটে বদলাচ্ছে। ভারতীয় জনতা পার্টির দলীয় সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, সব মিলিয়ে বিজেপির প্রচার তিন স্তরে দাঁড়িয়ে আছে। মোদি বলছেন উন্নয়ন ও ডবল ইঞ্জিনের কথা। অমিত শাহ বলছেন সরকার বদল, নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশের কথা। যোগী-হিমন্ত বলছেন কড়া প্রশাসন, পরিচয় ও তোষণবিরোধী রাজনীতির কথা। তার সঙ্গে রাজ্য নেতৃত্ব স্থানীয় ক্ষোভকে ভোটে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে। সমালোচকরা কিন্তু প্রশ্ন তুলতে ভুলছেন না। তাদের প্রশ্ন একটাই—এই সর্বশক্তির প্রচারে কি তৃণমূলের দক্ষিণবঙ্গের শক্ত ঘাঁটি ভাঙতে পারবে গেরুয়া শিবির? নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংগঠন, সামাজিক প্রকল্প, নারী ভোটব্যাঙ্ক এবং স্থানীয় প্রার্থীভিত্তিক লড়াই বিজেপির জাতীয় প্রচার-ঝাঁপকে আটকে দেবে? আরও পড়ুন:পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার রেকর্ড ভোট কিসের ইঙ্গিত? ২৯ এপ্রিলের ভোট সেই উত্তর দেবে। তবে সমালোচকরাও মানছেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোট ময়দানে বিজেপি এবার সত্যিই ‘হয় এবার, নয় নেভার’ মেজাজেই নেমেছে। আর সে কারণেই ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম হাইভোল্টেজ রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এই লড়াইয়ের হিসেব জানা যাবে ৪ মে। সেদিনই পরিষ্কার হবে—কে এবার, আর কে নেভার!

Go to News Site