Collector
জ্বালানি সংকটে পথ দেখাচ্ছে চীন, তিব্বতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপ্লব | Collector
জ্বালানি সংকটে পথ দেখাচ্ছে চীন, তিব্বতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপ্লব
Jagonews24

জ্বালানি সংকটে পথ দেখাচ্ছে চীন, তিব্বতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপ্লব

নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে নতুন রেকর্ড গড়ছে চীন। দেশটির সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সাম্প্রতিক বৃদ্ধিকে বিশ্লেষকরা অভূতপূর্ব বলে উল্লেখ করেছেন। ২০২৫ সালের মে মাসে চীন প্রায় ৯৩ গিগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করেছে, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০টি সোলার প্যানেল স্থাপনের সমান। একই সময়ে বায়ু বিদ্যুৎ স্থাপন হয়েছে ২৬ গিগাওয়াট, যা প্রায় ৫ হাজার ৩০০টি টারবাইনের সমতুল্য। গত বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চীন ১৯৮ গিগাওয়াট সৌর এবং ৪৬ গিগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ যোগ করেছে। এই সক্ষমতা ইন্দোনেশিয়া বা তুরস্কের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমান বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে দেশটির মোট সৌর বিদ্যুৎ সক্ষমতা এক হাজার গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে, যা বিশ্ব মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। তীব্বতে চীনের সৌর বিপ্লব বিশ্বের সর্বোচ্চ মালভূমি তিব্বতে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত সৌর প্যানেল। আকারে এটি নিউইয়র্কের ম্যানহাটন কাউন্টির চেয়ে প্রায় সাত গুণ বড়। পাতলা বায়ুর কারণে এখানে সূর্যের আলো সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মালভূমির আশপাশের পাহাড়ি ঢালে সারি সারি বসানো হয়েছে বায়ু টারবাইন। শুষ্ক ও জনশূন্য প্রান্তরে মাঝে মাঝে দেখা যায় ভেড়া চরানো রাখালদের। দিনে সৌর প্যানেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, আর রাতে বাতাসের শক্তি ব্যবহার করে টারবাইনগুলো- এভাবে দুই উৎস মিলিয়ে বিদ্যুতের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। পাশাপাশি নদীগুলো যেখানে গভীর খাদে নেমে গেছে, সেখানে নির্মিত হয়েছে জলবিদ্যুৎ বাঁধ। উৎপাদিত বিদ্যুৎ উচ্চভোল্টেজ লাইনের মাধ্যমে এক হাজার মাইল দূরের শহর ও শিল্পে পৌঁছে দেওয়া হয়। চীন বিশ্বের সর্বোচ্চ এই মালভূমিতে বিশাল নবায়নযোগ্য জ্বালানি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। লক্ষ্য- উজ্জ্বল সূর্যের আলো , শীতল আবহাওয়া ও উচ্চতা কাজে লাগিয়ে স্বল্প খরচে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন। এর ফলে পুরো মালভূমির প্রায় সব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারগুলোর জন্যও। যদিও চীন এখনো বিশ্বের বাকি অংশের সমান কয়লা ব্যবহার করে, তবুও গত বছর দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জাতিসংঘে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, চীন তার গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাবে ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বহুগুণ বাড়াবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দূষণকারী দেশের পক্ষ থেকে এটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসন অন্যান্য দেশকে গ্যাস, তেল ও কয়লা কিনতে চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে চীন সস্তা সৌর ও বায়ু প্রযুক্তি, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বৈশ্বিক বাজারে নেতৃত্ব নিতে চাইছে। চীনের ছিংহাই প্রদেশের গংহে কাউন্টিতে অবস্থিত ‘তালাতান সৌর পার্ক’ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর একটি। ১৬২ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই প্রকল্প পৃথিবীর অন্য সব সৌর পার্ককে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের আর কোনো দেশ এত বড় পরিসরে উচ্চভূমিতে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে না। সরকারি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে চীন আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এই নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে চীন ৩০ হাজার মাইল দীর্ঘ উচ্চগতির রেলপথ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বহর চালাচ্ছে। একই সঙ্গে সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে আরও বেশি সৌর প্যানেল তৈরি সম্ভব হচ্ছে, যা বৈশ্বিক বাজারে প্রাধান্য পাচ্ছে। ছিংহাই অঞ্চলে সৌর ও বায়ু শক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের খরচ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম। এই অঞ্চল তিব্বতের আমদো অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং বর্তমান দালাই লামার জন্মস্থানও এখানে। আবার দক্ষিণ তিব্বতের ইয়ারলুং স্যাংপো নদীতে পাঁচটি নতুন বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়েছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভারত আশঙ্কা করছে, এর ফলে নিম্নাঞ্চলের পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে। উচ্চভূমিতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ছিংহাই বিশেষভাবে উপযোগী, কারণ অঞ্চলটি সমতল ও ঠান্ডা আবহাওয়া প্যানেলের কার্যকারিতা বাড়ায়। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড বা চিলির মতো দেশেও উচ্চভূমিতে ছোট প্রকল্প রয়েছে, তবে সেগুলোর ক্ষমতা খুবই সীমিত। তালাতান প্রকল্পের উৎপাদনক্ষমতা ১৬ হাজার ৯৩০ মেগাওয়াট, যা একটি বড় শহরের সব বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। আগামী তিন বছরে এটি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। আশপাশে আরও হাজার হাজার মেগাওয়াট বায়ু ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া লাসা শহরের কাছে ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় নতুন সৌর প্রকল্পও স্থাপন করা হয়েছে। শুরুতে এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনামূল্যে জমি দেওয়া হলেও এখন নামমাত্র ফি আরোপ করা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোতে পশুপালকদের জমি ব্যবহৃত হলেও নতুনভাবে প্যানেল স্থাপন করায় পশুরা নিচে চারণ করতে পারছে। তবে বড় প্রকল্পের জন্য মানুষের স্থানচ্যুতি সবসময়ই সংবেদনশীল বিষয়। চীন এরই মধ্যে থ্রি গর্জেস বাঁধ নির্মাণে বিপুল জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তর করেছিল। বর্তমানে প্রতি তিন সপ্তাহে যে পরিমাণ সৌর প্যানেল বসানো হচ্ছে, তা ওই বাঁধের সমান বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করছে। উচ্চভূমিতে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলক কঠিন হলেও সৌর ও বায়ু শক্তির সমন্বয় করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা হচ্ছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ অন্যান্য প্রদেশে পাঠানো হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ দিয়ে ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। এছাড়া জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করে সৌর শক্তির ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। দিনে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানি উঁচুতে তোলা হয় এবং রাতে তা নামিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। কম খরচের বিদ্যুৎ পাওয়ায় কোয়ার্টজ থেকে পলিসিলিকন তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার স্থাপনে শিল্পগুলো এখানে স্থানান্তরিত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় এসব ডেটা সেন্টারে ৪০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ লাগে। এছাড়া ডেটা সেন্টারের তাপ ব্যবহার করে আশপাশের ভবন গরম রাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সাংহাই থেকে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে। তবে স্বয়ংচালিত গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের কারণে সেই ডেটা সেন্টার এখনো পূর্ব চীনে রাখা হয়েছে। দাংজিয়ং কাউন্টি সৌর প্রকল্প এদিকে, চীন তিব্বতে ৪ হাজার ৫৫০ মিটার উচ্চতায় নতুন সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করেছে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় স্থাপিত সৌর তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প হবে। ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পে ৪০০ মেগাওয়াট সৌর প্যানেলও যুক্ত থাকবে ও ২০২৭ সালের মধ্যে এটি চালু হওয়ার কথা। জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে। নতুন এই প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে তাপ সঞ্চয়ের মাধ্যমে রাতেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্ব যখন জ্বালানি সংকটে দিশেহারা, তখন তিব্বতের উচ্চ মালভূমিতে চীনের এই বিশাল নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এসএএইচ

Go to News Site