Somoy TV
বিদেশে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গাইবান্ধা ও দিনাজপুরের যুবকদের কম্বোডিয়ায় পাচার করে অপরাধী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। কম্বোডিয়ার পয়পেট শহরের গহীন জঙ্গলে বন্দি রেখে এসব যুবকদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের মূল হোতা গাইবান্ধার এনসিপি নেতা রাহাদ ইবনে শহীদ ও তার বাবা শহিদুল।জঙ্গলে টর্চার সেল দিনাজপুরের ভাদুরিয়ার যুবক শাফিন মন্ডল সচ্ছলতার আশায় পাড়ি জমিয়েছিলেন কম্বোডিয়ায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তার স্বপ্ন রূপ নেয় দুঃস্বপ্নে। শাফিন জানান, গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের ফ্লাইটে তিনি কম্বোডিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ২ নভেম্বর কম্বোডিয়ার সিমর্যাপ এয়ারপোর্টে পৌঁছান তিনি। সেখানে তাকে রিসিভ করেন রাহাদ চক্রের সদস্য হুসেইন কবীর। শাফিনকে কম্বোডিয়ার নমপেন শহরের রিভারব্রীজ হোটেলে রাখে হুসেইন। শাফিন তার কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তার পাসপোর্ট, ভিসা ও ২ হাজার ১০০ ডলার কেড়ে নিয়ে হুসেইন কবীর শাফিনকে মারধর করেন। সময় সংবাদের সঙ্গে কথা বলছেন ভুক্তভোগী পরিবার। ছবি: সময় সংবাদ পরে ২-৩ দিন পর শাফিনকে কম্বোডিয়ার নমপেন শহর থেকে ৪৫০ কিলোমিটার দূরে থাইল্যান্ড সীমান্ত সংলগ্ন পয়পেট শহরের একটি অপরাধী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। পয়পেট শহরের গহীন জঙ্গলে আটকে রেখে বৈদ্যুতিক শক, মারপিট আর অমানসিক নির্যাতন চালিয়ে শাফিনের মাধ্যমে তার বাবা নুর ইসলামের কাছে ফোন করে ৩ হাজার ডলার দাবি করা হয়। ওই জঙ্গলে ৯০ থেকে ৯৫ দিন শাফিনকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি কৌশলে কোনোমতে ওই জঙ্গল থেকে পালিয়ে বাইরে বের হন শাফিন। পরে পরিবারের কাছে ফোন করে কিছু ডলার নিয়ে পয়পেট শহর থেকে নমপেন শহরে যান শাফিন। সেখান থেকে থাইল্যান্ড অ্যাম্বাসিতে আত্নসমর্পন করে কোনো মতে প্রাণ বাঁচিয়ে দেশে ফিরলেও গাইবান্ধার ফুলছড়ির কঞ্চিপাড়া ও সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গার আরও তিন যুবক এখনও আটক।নেপথ্যে এনসিপি নেতা অনুসন্ধানে জানা যায়, গাইবান্ধা জেলা এনসিপির সদস্য সচিব রাহাদ ইবনে শহীদ এবং তার বাবা শহীদুল ইসলাম এই চক্রের প্রধান। শাফিনের বাবা নুর ইসলাম জানান, তিনি বেসরকারী একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরর সুবাদে গাইবান্ধা শহরে বসবাস করতেন। ফুলছড়ির মদনের পাড়ার আব্দুল লতিফের সাথে পরিচয় হয় নুর ইসলামের। লতিফের মাধমে নুর ইসলাম ছেলে শাফিনকে বিদেশে পাঠানোর জন্য গত বছরের ২৫ আগস্ট রাহাদের বাবা শহীদুল ইসলামের কাছে মোট ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা জমা দেন শাফিনের বাবা। আরও পড়ুন: ‘রাজধানীর ৪০ ভাগ খুনের নেপথ্যেই রাজনীতি’, ‘মানব পাচারের নতুন রুট কম্বোডি শুধু শাফিন নয়, ফুলছড়ির কটিয়ার ভিটা গ্রামের সৈকত চন্দ্র শীল, বাদিয়াখালীর রাশেদ, বালাসীঘাট এলাকার সাদা মিয়া, শাওন, রসুলপুরের হানিফ, কঞ্চিপাড়ার ইয়াসিন, কিনান ও তার ভাইসহ অনেকে রাহাদ ও তার বাবার হাতে টাকা দিয়ে কম্বোডিয়া যান। তারা সেখানে কাজ না পেয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বাদিয়াখালীর রাশেদ বলেন, ধার দেনা করে চাকরির আশায় বিদেশ গিয়ে প্রতারিত হয়ে তিনি এখন অসহায়। ধারের টাকার জন্য দেনাদারের অত্যাচারে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে তিনি এখন রাজধানীতে রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন। তিনি জানান, রাহাদ ও তার বাবার মাধ্যমে যারা কম্বোডিয়া গেছেন তাদের প্রত্যেকের কাছে সাড়ে পাঁচলাখ থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে রাহাদ ও তার বাবা। আবার কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসার সময় ভুক্তভোগীদের আরো দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। একই বক্তব্য কঞ্চিপাড়ার ইয়াসিনসহ অন্যদের। অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গাইবান্ধা শহরের পূর্বপাড়ায় রাহাদের বাড়িতে যায় সময় সংবাদ। রাহাদ ব্যবসায়ীক কাজে বাড়ির বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানায় তার বাবা শহীদুল ইসলাম। শহীদুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি কেবল চাল ব্যবসায়ী। তার কাছ থেকে শাফিনের বাবা চাল বাকি নিয়েছেন। পাওনা টাকা চাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে।পাচার কৌশল এই তরুণ যুবকদের কম্বোডিয়া পাঠানোর আগে গাইবান্ধা শহরের দাশ বেকারী মোড়ে ‘বিন্দু আইটি ইনস্টিটিউট’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে ২৫ থেকে ৩০ জন যুবককে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এই প্রশিক্ষণের সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন এনসিপি নেতা রাহাদ। মূলত কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরির টোপ দিয়েই এসব যুবকদের সংগ্রহ করা হতো। বিন্দু আইটির সিইও হাসানুল ইসলাম সময় সংবাদকে জানান, রাহাদ বিভিন্ন সময় ২৫ থেকে ৩০ জন যুবককে তার আইটি সেন্টারে ভর্তি করান এবং কম্পিউটারের বেসিক প্রশিক্ষণ করান। যার সম্পূর্ণ খরচ রাহাদ নিজে বহন করতেন। ছেলে শাফিন দেশে ফিরে আসার পর শাফিনের বাবা নুর ইসলাম দিনাজপুর মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে রাহাদ ও শহীদুলসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলাটি বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছে। দিনাজপুর পিবিআই-এর অতিরিক্ত ডিআইজি মাহফুজ জামান আশরাফ জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে সময় সংবাদের কাছে বিষয়টি জানার পর গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ-সার্কেল) বিদ্রোহ কুমার কুন্ডু বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনও পুলিশের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানলাম। পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গেই তদন্ত করবে।’ ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কোনো কোনো ভুক্তভোগীকে মাত্র ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও চালাচ্ছে চক্রটি। আরও পড়ুন: সাগরপথে মানবপাচার: বিভীষিকাময় অতীতের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা এদিকে কম্বোডিয়ার জঙ্গলে আটকে থাকা গাইবান্ধার তিন যুবকের সাথে ভিডিও কলে কথা বলে সময় সংবাদ। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে নাম পরিচয় গোপন রেখে গাইবান্ধার ফুলছড়ির কঞ্চিপাড়ার দুই জন ও সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গার এক যুবক সময় সংবাদকে জানান, কাজ না দিয়ে কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত রাহাদের সহযোগী হুসেইন কবীর তাদেরকে একটি অপরাধী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে তাদের প্রতারণামুলক (স্ক্যাম) কাজে বাধ্য করা হয়। এসব নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাদের নির্যাতন করা হয়। এখন তারা একটি জঙ্গলে আটকে আছেন। তারা জানেন না কিভাবে পরিবারের কাছে দেশে ফিরবেন। জঙ্গলে আটক ওই তিন যুবককে দ্রুত ফিরিয়ে আনতে এবং এই আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের হোতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
Go to News Site