Collector
সুন্দরবনে আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে বনদস্যুরা, নেপথ্যে কী? | Collector
সুন্দরবনে আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে বনদস্যুরা, নেপথ্যে কী?
Somoy TV

সুন্দরবনে আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে বনদস্যুরা, নেপথ্যে কী?

পুনর্বাসনের অভাব ও আগের দায়ের করা মামলার চাপে সুন্দরবনে আবারও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একাধিক বনদস্যু বাহিনী। আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার দীর্ঘ সাত বছর পর মুক্তিপণের দাবিতে তারা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দস্যুতা ছেড়ে আসা ব্যক্তিরা বলছেন, পর্যাপ্ত পুনর্বাসনের অভাব এবং মামলার হাজিরা দিতে গিয়ে নিঃস্ব হওয়ার কারণেই বাধ্য হয়ে অনেকে আবারও পুরানো পেশায় ফিরছেন।সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা ঘুরে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সাবেক দস্যুদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা এলাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব সাব্বির শেখ বলেন, ‘সুন্দরবনে ডাকাতিতে টাকা ছিল, কিন্তু শান্তি ছিল না। অভিযানে ধরা পড়ার ভয় ও মৃত্যুঝুঁকি সব সময় তাড়িয়ে বেড়াত। অবৈধ ওই টাকায় পরিবারও কখনও শান্তিতে ছিল না। এলাকাবাসীর লাঞ্ছনা ও গালমন্দ শুনে বাঁচতে হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি একসময় জুলফিকার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলাম। মামলা তুলে নেবে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে এমন বিভিন্ন আশ্বাসে আমরা আত্মসমর্পণ করি। কিন্তু এখনও আমার নামে তিনটি মামলা রয়েছে। আর যে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে, সেটাও পর্যাপ্ত নয়। মামলার খরচ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বাবার জায়গাটুকুও বিক্রি করেছি। এখন আমাদের একমাত্র সমস্যা হলো ক্ষুধা। তিন বেলা খেতে পারি না। তবে তিন বেলা খেতে না পারলেও সুখে আছি। তবে অনেকে মামলার চাপে আর ক্ষুধার যন্ত্রণায় আবারও সুন্দরবনে ফিরে যাচ্ছে।’ সুন্দরবন বিভাগ জানায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৩২টি দস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল। এসব বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫৯৩টি গুলিসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তবে বর্তমানে আবারও ভয়ংকর হয়ে উঠছে সুন্দরবন। দস্যুতায় ফিরছে আত্মসমর্পণকারী দলগুলো। আরও পড়ুন: সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে যৌথবাহিনীর অভিযান সচেতন মহলের মতে, আত্মসমর্পণকারী জেলেদের সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা ও পুনর্বাসনে নানামুখী পদক্ষেপের আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে কার্যকর তেমন কিছুই দেখা যায়নি। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল পুনর্বাসন ও মামলার চাপে অনেকেই পুরানো পেশায় ফিরছেন। একই কথা বলছেন আত্মসমর্পণকারীরা। সাবেক বনদস্যু কামাল শিকারী বলেন, ‘মামলার হাজিরা দিতে দিতেই জীবন শেষ। ২০১৮ সালে আমি আত্মসমর্পণ করি। সরকার তিন মাসের মধ্যে আমাদের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করে দেয়ার কথা বলেছিল। সেই অনুযায়ী আমরা অস্ত্রসহ র‍্যাব-৬ এর কাছে আত্মসমর্পণ করি। সে সময় কিছু লোকের মামলা নিষ্পত্তি করা হলেও আমাদের অনেকের মামলা এখনও ঝুলে আছে। মামলার হাজিরা দিতে এবং খরচ জোগাতে আমরা অত্যন্ত কষ্টে জীবন যাপন করছি। অনেকেই হয়তো এই কষ্টের কারণেই আবার সুন্দরবনে ডাকাতি করতে নেমে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যতই কষ্ট হোক, আমি আর সুন্দরবনে যাব না। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি, আমার মামলা উঠিয়ে নিলে পরিবার নিয়ে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে পারব।’ আরেক আত্মসমর্পণকারী বনদস্যু মো. সোলাইমান বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, আত্মসমর্পণের তিন মাসের মধ্যে সব মামলা সরকারি অর্থায়নে নিষ্পত্তি করা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেরকম কিছুই হয়নি। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচে মামলাগুলো চালাতে হচ্ছে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে প্রশাসন আমাদের সাহায্য করবে এবং অগ্রাধিকার দেবে বলে আশ্বাস দেয়া হলেও, দৈনিক ৫০০ বা ১ হাজার টাকা আয় করে মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকার মামলা চালানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাধ্য হয়েই অনেকে হয়তো আবার সুন্দরবনে যাচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, বারো-তেরো বছর বয়সেই তিনি সুন্দরবনে গিয়েছিলেন এবং প্রায় সাত বছর সেখানে ছিলেন। এখন অভাব-অনটনে থাকলেও শান্তিতে আছেন এবং সুন্দরবনে ফেরার কোনো ইচ্ছা তার নেই। তবে যাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তারাই আবার দস্যুতায় ফিরেছে। আরও পড়ুন: সুন্দরবনে বুধবার শুরু হচ্ছে মধু আহরণ, বনদস্যু আতঙ্কে মৌয়ালরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক সাবেক বনদস্যু জানান, একটি মামলা থেকে বাঁচতে সুন্দরবনে গিয়ে এখন তিনি তিন-চারটি মামলার আসামি। তার মতো অনেকেই আছেন, যাদের ঘাড়ে এখন আরও বেশি মামলার চাপ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া তাদের বাঁচার কোনো উপায় নেই। সরকার চাইলে এখনও অনেকে আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত বলে জানান তিনি। কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা যায়, গত দেড় বছরে করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীসহ বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর সর্বমোট ৬১ জন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৯৯ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয় এবং ৭৮ জন জেলে ও ৩ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় বনদস্যুদের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। এর প্রেক্ষিতে আমরা বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে যৌথ অভিযান ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ পরিচালনা করেছি।’ সুন্দরবন সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক এস কে এ হাসিব বলেন, ‘তৎকালীন সরকার আত্মসমর্পণকারী বনদস্যুদের পুনর্বাসন ও মামলার নিষ্পত্তির বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে। পর্যাপ্ত পুনর্বাসনের সুবিধা না পেলে এবং মামলার জন্য আদালতে হাজিরা দিতে হলে তারা আবারও পুরোনো পেশায় ফিরে যেতে পারে।’ প্রশাসনকে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তিনি। আরও পড়ুন: দস্যু আতঙ্কে সুন্দরবনে মাছ ধরা বন্ধ, দিশেহারা ১০ সহস্রাধিক জেলে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘২০১৮ সালে আত্মসমর্পণকারী বনদস্যুদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছিল। যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে, তারা যদি আমাদের কাছে কোনো আবেদন করে, তাহলে আমরা তাদের দাবিদাওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করতে পারি। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ অন্যদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক বনদস্যু আত্মসমর্পণ করার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। তবে আমরা এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছি না। কারণ, একজন অন্যায় করবে আর রাষ্ট্র বারবার তাকে সুযোগ দেবে— এটা ঠিক নয়। বনদস্যুদের অপরাধ থেকে সরে আসতে হবে, নতুবা আমাদের অভিযানের মুখে পড়তে হবে। আমরা ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছি এবং প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। যেকোনো মূল্যে আমরা সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করব, যাতে উপকূলের সাধারণ মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য নিরাপদে সুন্দরবনে যেতে পারে।’

Go to News Site