Collector
কৃষক কার্ড : প্রকৃত কৃষকরা যেন বঞ্চিত না হন | Collector
কৃষক কার্ড : প্রকৃত কৃষকরা যেন বঞ্চিত না হন
Jagonews24

কৃষক কার্ড : প্রকৃত কৃষকরা যেন বঞ্চিত না হন

কৃষক কার্ড হলো বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষকের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কৃষক কার্ড কর্মসূচি দেশের কৃষকদের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয় যা এক ছাতার নিচে একাধিক সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের উদ্যোগ। আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশে কৃষি সেবা সহজতর করার জন্য কৃষক কার্ড চালু আছে। যেমন- কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষকদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র, মোবাইল ব্যাংকিং, ভর্তুকি প্রদান ও প্রশিক্ষণ সেবা ইত্যাদি চালু আছে। এসব দেশ কৃষি উপকরণ সরবরাহ, কৃষিঋণ, টেকসই চাষাবাদের প্রযুক্তি সম্প্রসারণসহ সার্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে কৃষক কার্ড ব্যবহার করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সরকারও আধুনিক মানের কৃষক কার্ড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকদের কৃষি বিষয়ক সব তথ্য সংগ্রহ, সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় ডিজিটাল কৃষিসেবা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে অন্যতম অঙ্গীকার ছিল কৃষক কার্ড। কৃষি খাতে মৌলিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে এ কার্ড চালুর অঙ্গীকার করেছে সরকার। ‘কৃষক কার্ড’ একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ, কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। স্বচ্ছতা, সঠিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও মাঠ পর্যায়ে কার্যকর তদারকি ছাড়া এ উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না। কৃষক যেন প্রকৃত অর্থেই এর সুফল পান, সেটিই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য। কৃষক ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে—এ বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এটি অর্থনৈতিক বিবেচনায়ও বড় সত্য। তাই প্রত্যাশা, ‘কৃষক কার্ড’ যেন কাগুজে প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পরিবর্তনের কৌশল হয়ে ওঠে। কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম উদ্যোগ হলো কৃষক কার্ড। এটি মূলত একটি চিপ সম্বলিত কার্ড। এ কার্ড একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ডিজিটাল ডাটাবেজের সাথে সংযুক্ত থাকবে যাতে কৃষকের জমির পরিমাণ, উৎপাদিত ফসলের ধরন এবং অন্যান্য কৃষিভিত্তিক তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্ট সব সেবা স্বচ্ছতার সাথে এবং দ্রুততম সময়ে কৃষকের নিকট পৌঁছে দেয়া যাবে। কৃষি উৎপাদন থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষিপণ্য সংগ্রহে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এ খাতের প্রধানতম বাস্তবতা। এসব কারণে সবচেয়ে বিপাকে পড়ছেন কৃষকরা। কখনো খারাপ বীজের কারণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফসল ফলে না। কখনোবা বেশি ফলন হওয়ায় দাম পড়ে যায়। ফলে ফসল বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না কৃষকরা। আবার কখনো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব বা সংরক্ষণ সুযোগের অভাবে বাড়তি ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কিংবা কৃষকরা স্বল্পমূল্যে তা বেচে দিতে বাধ্য হন। এভাবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আর্থিকভাবেও তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারের ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির সূচনা জনমনে আশা জাগ্রত করার মতো একটি উদ্যোগ। এটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হলে কৃষকদের বর্তমান পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন সম্ভব। এক্ষেত্রে পূর্বশর্ত হলো এটি বাস্তবায়নে কোনো ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা থাকা যাবে না। দীর্ঘদিন ধরে কৃষি ভর্তুকি, প্রণোদনা বা ঋণ সুবিধা বিতরণে মধ্যস্বত্বভোগী, অনিয়ম ও তথ্য ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। এমনকি এর আগে প্রায় একই রকম উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ২০০৭ সালে। এ সময় ‘কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড’ প্রদান করা হয়েছিল। আবার ২০১৫ সাল থেকে ‘ফিশারম্যান কার্ড’ও দেয়া হয়। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই ফলপ্রসূ হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট অনেকের গবেষণায় উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হয়েছেন, আবার ক্ষমতাবান গোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে। সুতরাং অতীতে কেন এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। কার্ড বিতরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নির্ভুল ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে প্রকৃত চাহিদাসম্পন্ন কৃষকদের চিহ্নিত করতে হবে। যদি প্রকৃত উপকারভোগী নির্ধারণে ভুল হয়, তাহলে এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষি পরিবারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও বড় কৃষকরা রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে প্রাক-পাইলট প্রকল্প হিসেবে ২২ হাজার কৃষক কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে ২০ হাজারের বেশি রয়েছেন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক। পরবর্তী সময়ে পুরো দেশের কৃষকদের জন্য এ কার্ড বিতরণ শুরু হলে তখনো উপকারভোগী নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে সরকারকে। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে নানা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে তালিকা প্রণয়ন ও সুবিধা বিতরণে অনিয়মের নজির রয়েছে, যা থেকে শিক্ষা নেয়া জরুরি। এ উদ্যোগকে কার্যকর করতে হলে কৃষির অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ ও বাজার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ। সরকার খাল খনন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে যে পরিকল্পনার কথা বলেছে, তা বাস্তবায়ন হলে কৃষক কার্ড কর্মসূচির প্রভাব বহুগুণ বাড়বে। কারণ শুধু নগদ সহায়তা দিয়ে কৃষকের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৃষিনীতি। গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন। মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, আবার অফ সিজনে ভোক্তাকে উচ্চমূল্য দিতে হয়—এ দ্বৈত সমস্যার সমাধানে কোল্ড স্টোরেজ ও সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অপরিহার্য। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে যদি এসব অবকাঠামোগত সুবিধার সঙ্গে কৃষকদের যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সহায়ক ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। এই কার্ডকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা কৃষকদের আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসবে। এতে একদিকে যেমন স্বচ্ছতা বাড়বে, অন্যদিকে কৃষক সহজে ঋণ, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকার পেতে পারেন। তবে এ ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ব্যাংকিং অবকাঠামো ও কৃষকদের ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ডিলার বা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে। যদি কৃষক বাধ্য হন নির্দিষ্ট উৎস থেকেই বীজ, সার বা অন্যান্য উপকরণ কিনতে, তাহলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে এবং কৃষকের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে। ফলে নীতিনির্ধারণে বিকল্প উৎস ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষকের সংজ্ঞা নির্ধারণও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কেবল জমির মালিকানার ভিত্তিতে কৃষক নির্ধারণ করলে বিপুলসংখ্যক বর্গাচাষী, কৃষিশ্রমিক ও নারী শ্রমিক এ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যেতে পারেন। অথচ বাস্তবে কৃষি উৎপাদনের বড় অংশই এ শ্রেণীর মানুষের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক চিত্র সরকারের কাছে থাকতে হবে। ‘কৃষক কার্ড’ একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ, কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। স্বচ্ছতা, সঠিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও মাঠ পর্যায়ে কার্যকর তদারকি ছাড়া এ উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না। কৃষক যেন প্রকৃত অর্থেই এর সুফল পান, সেটিই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য। কৃষক ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে—এ বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এটি অর্থনৈতিক বিবেচনায়ও বড় সত্য। তাই প্রত্যাশা, ‘কৃষক কার্ড’ যেন কাগুজে প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পরিবর্তনের কৌশল হয়ে ওঠে। লেখক : সাংবাদিক। এইচআর/এএসএম

Go to News Site