Somoy TV
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন নতুন এক অধ্যায়ের প্রবেশ করছে। পাবনার রূপপুর প্রকল্পটির এক নম্বর ইউনিট নির্মাণযজ্ঞের বহু ধাপ অতিক্রম করে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে রিঅ্যাক্টর বা পরমাণু চুল্লিতে ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘ফুয়েল লোডিং’ কী?পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রক্রিয়া। এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণে নিরাপত্তামূলক যেসব ধাপ পার করতে হয় তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায় লো ‘ফুয়েল লোডিং’।এই ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর বা চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপন করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।রূপপুরে এই ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ফুয়েল লোডিং’ সম্পন্ন হতে ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মতো সময় লাগতে পারে।তারা বলছেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়। আর টারবাইন ঘুরার মাধ্যমেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলামের বরাতে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, ফুয়েল লোডিংয়ের পর বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা করে ফাইনাল সেফটি অ্যানালিসিস রিপোর্ট করা হবে, যেটি পুনরায় পর্যালোচনা করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘এটা একটা পাইলট অপারেশন। এটা সময় নিতে পারে অন্তত ছয়মাস থেকে এক বছর। এই সময়ে পাওয়ার তৈরির মাধ্যমে সিনক্রোনাইজেশন, টারবাইন জেনারেটর কাজ করছে কি না, ইমার্জেন্সি সব সাপোর্ট কাজ করছে কি না এগুলো সব দেখা হয়।’’এরপর কমার্শিয়াল অপারেশনাল ডেট বা সিওডি দেওয়ার আগে চূড়ান্ত উৎপাদনে যাওয়ার জন্য আরেক দফা অনুমোদনের দরকার হয়। অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জানান, পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক অপারেশন শুরুর পর রিঅ্যাক্টর ৯০ শতাংশ ক্যাপাসিটিতে পুরোদমে চলতে শুরু করবে। টানা ১৮ মাস চলার পর ফুয়েল রিপ্লেসমেন্টসহ রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা হবে। এরপর আবারো ১৮ মাসের সাইকেল নতুন করে শুরু হবে।’’ আগস্টেই মিলবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎজ্বালানি লোডিংসহ পরীক্ষামূলক ধাপগুলো শেষে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে রূপপুর থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিট পূর্ণভাবে উৎপাদনে যেতে পারে।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, ১৫ থেকে ২১ আগস্টের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এরপর দুই মাসের মধ্যে এটি ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা যাবে। আর ডিসেম্বরের শেষ বা ২০২৭ সালের জানুয়ারির শুরুতে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রথম ইউনিট চালুর পর দ্রুতই দ্বিতীয় ইউনিটও উৎপাদন পর্যায়ে আনার কাজ এগোবে। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, দুই ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে রূপপুর থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে, যা ২ কোটি মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।এদিকে, প্রথম ইউনিটে ‘ফুয়েল লোডিং’ উপলক্ষে প্রকল্প এলাকায় বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষে এতে উপস্থিত থাকবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, রুশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ-এর প্রধান রাফায়েল ম্যারিয়ানো গ্রসি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
Go to News Site