Jagonews24
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির ইতিহাসে ‘সবচেয়ে খারাপ প্রেসিডেন্ট- এমনটাই দাবি করেছেন মার্কিন রাজনীতিবিদ ও জনসংখ্যাবিদ টমাস বি. এডসল। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক বিশদ মতামত নিবন্ধে তিনি বলেছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বে এমন বিস্তৃত ও গভীর ক্ষতি করেছেন, যা পুরোপুরি বুঝে ওঠা কঠিন। তিনি লিখেছেন, এই ক্ষতি ছড়িয়ে পড়েছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি, আইনি ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতারণার শিকার নিরীহ মানুষ, এমনকি টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণায় বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও। ট্রাম্পের নিষ্ঠুরতার গভীরতা তুলে ধরতে এডসল একটি নির্দিষ্ট ঘটনার উদাহরণ দেন। ২০২৫ সালের মে মাসে ‘ফাইট কোলোরেক্টাল ক্যান্সার’ নামের রোগী সহায়তা সংস্থার প্রধান নির্বাহী আনজি ডেভিস সিবিএস নিউজকে জানান, তাদের এক সদস্য স্টেজ-৪ কোলোরেক্টাল ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি এমন একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, যা তার জীবনের শেষ সুযোগ ছিল ক্যান্সারের বিস্তার কমানোর জন্য। কিন্তু ট্রায়াল শুরু হওয়ার আগেই জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অর্থায়ন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় এবং ট্রায়ালটি বাতিল হয়ে যায়। এডসলের জিজ্ঞাসার জবাবে ইমেইলে ডেভিস লেখেন, এই রোগীটি পরে মারা গেছেন, তিনি যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ওপর নির্ভর করছিলেন তা আর পাননি। তিনি আরও বলেন, আমরা কখনোই জানতে পারব না, ওই ট্রায়ালটি তাকে তার সন্তানদের সঙ্গে আরও কিছু সময় কাটানোর সুযোগ দিত কি না। এডসল বলেন, তিনি আগের কলামগুলোতে ট্রাম্পের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন, কিন্তু এই তালিকা প্রতিদিনই বাড়ছে। তার মতে, কংগ্রেসের সরাসরি অনুমোদন ছাড়াই ট্রাম্পের বাজেট কাটছাঁটের ফলে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। লন্ডনভিত্তিক চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়ন কমানোর ফলে শুধু ২০২৫ সালেই প্রায় ১৭ লাখ ৭৬ লাখ ৫৩৯ জনের মৃত্যু হতে পারে, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৯০০। গবেষণাটি আরও বলছে, ভবিষ্যতে এই অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ হলে প্রতি বছর প্রায় ২৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ১ কোটি ৪০ লাখ ৫১ হাজার ৭৫০ অতিরিক্ত মৃত্যু ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪৫ লাখ ৩৭ হাজা ১৫৭ অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে। এডসল আরও উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের ক্ষমা প্রদানের কারণে প্রতারণার শিকার বহু মানুষ আদালত নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ২০২৫ সালের জুনে হাউজ জুডিশিয়ারি কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের ক্ষমার ফলে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা আদায় করা সম্ভব হয়নি, ফলে প্রতারক, কর ফাঁকিদাতা ও মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের অবৈধ সম্পদ রেখে দিতে পেরেছে। তিনি বলেন, এখানেই শেষ নয়। পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যাতে হাজার হাজার এমনকি লাখো মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ২০২৫ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা অন্তত ৩০টি বড় নিয়ম বাতিল বা দুর্বল করার চেষ্টা করেছে, যেগুলো বায়ু ও পানি রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। এসব নিয়ম কার্যকর থাকলে প্রতি বছর ৩০ হাজারের বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো। একই সময়ে জীবনরক্ষাকারী বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা গবেষণার অর্থায়নও বাতিল করা হয়েছে। জামা ইন্টারনাল মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ৩৮৩টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুদান বন্ধ করা হয়েছে, যার ফলে ৭৪ হাজার ৩১১ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই বিষয়ে গবেষক ড. টেভা ডি. ব্রেন্ডার ও ড. ক্যারি পি. গ্রস বলেন, এমন সিদ্ধান্ত মানব গবেষণার মৌলিক নৈতিক নীতিকে লঙ্ঘন করে। তারা উল্লেখ করেন, এতে ‘ইনফর্মড কনসেন্ট’-এর নীতির বিশ্বাসভঙ্গ ঘটে এবং ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী রোগীরা হঠাৎ চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। অক্টোবর ২০২৫-এ নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ১৪৮টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাতিল হয়েছে, যেখানে ১ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি রোগী অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল বা ইতোমধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ‘প্রভাবিত’ শব্দটি পরিস্থিতির প্রকৃত ভয়াবহতা প্রকাশে যথেষ্ট নয় বলে উল্লেখ করেন এডসল। এই বিশ্লেষক আরও বলেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে উপেক্ষা করে ট্রাম্প প্রশাসন টিকা সম্পর্কে ভিত্তিহীন ভয় বাড়িয়েছে, যার ফলে শিশুদের মধ্যে রোগ ও সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এডসলের মতে, ট্রাম্পের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র পরিষ্কার জ্বালানির প্রতিযোগিতায় চীনের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে। কার্বনক্রেডিটস ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন ১,৪০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের পথে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছাবে মাত্র ৩৫০ গিগাওয়াটে। চীন ২১২ গিগাওয়াট সৌর ও ৫১ গিগাওয়াট বায়ুশক্তি যোগ করবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা ১০০ গিগাওয়াটেরও কম। সমুদ্র উপকূলীয় বায়ুশক্তিতে চীনের সক্ষমতা ৪২.৭ গিগাওয়াট, আর যুক্তরাষ্ট্রে এম্পায়ার উইন্ড প্রকল্পের প্রথম ধাপে ৮১৬ মেগাওয়াট, যা পরে ২.১ গিগাওয়াট পর্যন্ত বাড়তে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতারণা’ বলে মন্তব্য করে বলেন, এই বিষয়ে জাতিসংঘের পূর্বাভাসগুলো ভুল ও বোকা মানুষদের তৈরি। এডসল বলেন, ট্রাম্পের ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি, শুল্কনীতি ও ইউরোপীয় নেতাদের প্রতি সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল পলিটিকোর এক জরিপে দেখা যায়, পোল্যান্ড, স্পেন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিতে জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের মাত্র ১২ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখেন, আর ৩৬ শতাংশ এটিকে হুমকি মনে করেন। একই জরিপে চীনকে হুমকি হিসেবে দেখেন ২৯ শতাংশ মানুষ। এডসলের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রেসিডেন্সির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন ও হোয়াইট হাউজকেও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরে তিনি বলেন, মাইকেল বেইলি ট্রাম্পকে ‘সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠানগুলোর এত বড় ক্ষতি আগে কখনো দেখা যায়নি। অন্যদিকে, ডোনাল্ড কেটল ট্রাম্পকে অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করলেও বলেন, তার প্রভাব নেতিবাচক এবং তিনি দেশের ভেতরে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করেছেন। এডসল বলেন, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক ‘মূল্যবোধের’ ওপর, যা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে কার্যকর রেখেছিল। তিনি লেখেন, এসব নীতিগত সীমা ভেঙে ফেলার ফলে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। সবশেষে তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন ভোটাররা দুইবার এমন একজন প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করেছেন, যার নৈতিকতা নেই, সহানুভূতি নেই ও আত্মকেন্দ্রিকতার শেষ নেই। এটি যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ওপর একটি স্থায়ী দাগ হিসেবে থেকে যাবে। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট এসএএইচ
Go to News Site