Collector
কায়েদ সাহেব হুজুর রহ.: ঐক্যের দীপশিখা | Collector
কায়েদ সাহেব হুজুর রহ.: ঐক্যের দীপশিখা
Somoy TV

কায়েদ সাহেব হুজুর রহ.: ঐক্যের দীপশিখা

মানবেতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের জীবন কেবল একটি যুগকে প্রভাবিত করে না; বরং যুগের পর যুগ মানুষকে পথ দেখিয়ে যায়। কায়েদ সাহেব হুজুর রহ. ছিলেন তেমনই এক আলোকবর্তিকা। তার জীবন আমাদের শেখায়-- মতভেদ থাকতেই পারে; কিন্তু তা কখনোই ঐক্যের অন্তরায় নয়।ঝালকাঠি জেলার শান্ত, নিভৃত এক পল্লী বাসন্ডা-- সেখানেই ১৯১১ সালে তার জন্ম। ছোট্ট সেই গ্রামেই শুরু হয় এক অসাধারণ মানবাত্মার পথচলা। তার মূল নাম ছিলো আজিজুর রহমান। মানুষ তাকে ভালোবেসে ডাকতো কায়েদ নেতা। শৈশব থেকেই তার মধ্যে ছিলো জ্ঞানপিপাসা ও আত্মশুদ্ধির তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তাইতো কলকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে টাইটেল সম্পন্ন করে পরবর্তী কর্মজীবন তিনি কাটান ছারছিনার আধ্যাত্মিক পরিবেশে। ছাত্রজীবনে তিনি কেবল বইয়ের জ্ঞানই আহরণ করেননি; অর্জন করেছিলেন হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা, বিনয় ও মানবপ্রেম। সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে একা করে না; বরং নিয়ে যায় মানুষের কাছে। কায়েদ সাহেব হুজুর রহ.-এর জীবন ছিলো তার উজ্জ্বল প্রমাণ। তিনি কখনো সমাজ থেকে দূরে সরে যাননি। বরং মানুষের মাঝে থেকেই মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তার আধ্যাত্মিকতা নির্জনতার আবরণে আবদ্ধ ছিলো না; এটি ছিলো এক অনন্য শক্তি, যা তাকে মানুষকে একত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন-- সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট জ্ঞানের অভাব নয়, ঐক্যের অভাব। তাই তিনি শিক্ষা ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে সমাজকে সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। ঝালকাঠিকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তোলেন এক বিশাল শিক্ষাবলয়—মাদরাসা, মসজিদ, খানকাহ, লাইব্রেরি, গবেষণা কেন্দ্র এবং দাতব্য কার্যক্রম। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু পাঠদান করেনি; পরিণত হয়েছিলো মানুষ গড়ার কারখানায়। এর প্রমাণ হিসেবে ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসাসহ তার হাতে গড়া অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছাত্ররা পরবর্তীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। কেউ হয়েছেন বিশ্বখ্যাত আলেম, কেউ শিক্ষাবিদ, কেউ লেখক-কলামিস্ট, কেউ সমাজনেতা। কিন্তু তারা সবাই একটি বিষয়ে একমত—হুজুর থেকে পাওয়া তাদের জীবনের সবচাইতে বড় শিক্ষা ছিলো চরিত্র গঠন। কারণ তিনি শিখিয়েছিলেন— জ্ঞান তখনই মূল্যবান, যখন তা চরিত্রকে আলোকিত করে। তার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ন্যায়ের প্রতি অবিচল অবস্থান। তিনি কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। তার একটি উক্তি আজও হৃদয়ে দাগ কাটে: “মজলুম ব্যক্তি মুসলিম হোক বা অমুসলিম—তার অশ্রু আমি সহ্য করতে পারি না।” এই একটি বাক্যই তার চিন্তার গভীরতা প্রকাশ করে। তার কাছে মানুষ আগে, পরিচয় পরে। আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই দেখি—ছোট ছোট মতভেদ বড় বিভাজনে রূপ নেয়। পরিবার ভেঙে যায়, সমাজ ভেঙে যায়, জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সংকট সমাধানে তিনি জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন এক কালজয়ী দর্শন—“আল-ইত্তিহাদ মা‘আল ইখতিলাফ”, মতানৈক্যসহ ঐক্য। এই দর্শন আমাদের বলে, এক হওয়ার জন্য একরকম হওয়া জরুরি নয়; বরং ভিন্নতাকে সম্মান করেই ঐক্য গড়ে তুলতে হয়। ইতিহাসে আমরা এর বাস্তব উদাহরণও দেখি। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে অনেক বিষয়ে মতভেদ ছিলো, কিন্তু তারা কখনো ঐক্য ভাঙেননি। হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.)-এর মধ্যে বহু বিষয়ে ভিন্ন মত ছিলো, তবুও তারা ছিলেন একে অপরের শক্তি। কারণ তাদের লক্ষ্য ছিলো এক—আল্লাহর সন্তুষ্টি ও উম্মাহর কল্যাণ। হুজুর (রহ.) তার জীবনে সেই একই শিক্ষা বাস্তবায়ন করেছেন। আরও পড়ুন: দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. তার লেখনী ও বক্তব্যেও একই আহ্বান প্রতিফলিত হয়েছে। হুজুর রহ. কোরআন, হাদিস, তাসাউফ, ফিকহ, আকায়েদ, ইবাদত, দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইসলামী জিন্দেগি, ইসলাম ও তাসাউফ, তামিরে আখলাক, হাকিকতে এলমে দ্বীন, ইসলাম ও রাজনীতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—আদর্শ, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও ঐক্য ছাড়া কোনো সমাজ টেকসই হতে পারে না। বিভক্ত সমাজ কখনো উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। ২০০৮ সালের আজকের তারিখে যখন তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেন, অসংখ্য মানুষ গভীরভাবে শোকাহত হয়। তৎকালীন পত্র-পত্রিকার বরাতে জানা যায়, আশপাশের প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে তার অগণিত ভক্ত-অনুরক্ত তাকে বিদায় জানাতে সমবেত হন। তিনি চলে গেলেও বিদায় নেয়নি তার শিক্ষা, আদর্শ ও দর্শন। তিনি যে চিন্তার আলো জ্বালিয়ে গেছেন, তা আজও মানুষের হৃদয়ে ভাস্বর হয়ে আছে। আজ আমাদের সমাজ, দেশ, এমনকি পুরো বিশ্ব ঐক্য কামনা করছে। আমাদের এই কামনা তখনই প্রাপ্তিতে রূপ নেবে, যখন আমরা ভিন্নতাকে মেনে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে পারবো। কায়েদ সাহেব হুজুর রহ.-এর কালজয়ী দর্শন আল-ইত্তিহাদ মা'আল ইখতিলাফ আমাদেরকে সেই পথেরই দিশা প্রদান করে।

Go to News Site