Jagonews24
ছেলেশিশু বা একজন পুরুষ যে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে, একথা সমাজের বহু মানুষ এখনো মানতে চান না। অথবা জেনেও অস্বীকার করেন বা গোপন করেন। কিন্তু তারা কেন ভয়াবহ এই অপরাধকে গোপন করতে চাইছেন? কারণ মূলত দুটি: এক, তারা বিশ্বাস করেন যৌন অপরাধ শুধু নারীর সাথেই ঘটে, আর দুই সামাজিক লজ্জা। নিজ গৃহে, স্কুলে, মাদ্রাসায়, হোস্টেলে কিংবা প্রতিবেশীর দ্বারা ছেলেশিশুরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। কিন্তু এই বিষয়টিকে লজ্জাজনক মনে করায় ভিক্টিমের পরিবার হয় বিষয়টি অস্বীকার করে, নয়তো লুকিয়ে রাখে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে কেবল ২০২৪ সালেই ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬টি, তবে মামলা হয়েছে ২৪টি। আর ধর্ষণচেষ্টা হয়েছে তিনটি। ইউনিসেফ বলছে, সারা বিশ্বে হিসেব করলে এই সংখ্যা ২৪ থেকে ৩১ কোটি, অর্থাৎ প্রতি ১১ জনে একটি ছেলে শিশু শৈশবে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। (বিবিসি বাংলা) শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়ন সম্পর্কে সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে এবং অধিকাংশ অভিভাবক সেই ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করেই শিশুর উপর যৌন হয়রানির বিষয়টিকে বিচার করেন। বাংলাদেশে প্রতি চার জন মেয়েশিশুর মধ্যে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, তেমনি প্রতি ছয় জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। কীভাবে, কার দ্বারা শিশুরা যৌন হয়রানির শিকার হয়? শুধু পুরুষ নয়, শিশুরা কখনো কখনো নারীর দ্বারাও যৌন হয়রানির শিকার হয়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন পুরুষ বা নারীর যৌন ক্ষুধার শিকার হয় ছেলে শিশুরা। তারা। এছাড়াও সমকামী ও বিকৃত রুচির মানুষেরাও ছেলে শিশুদের উপর যৌন নিপীড়ন চালাতে পারে বা চালায়। একটি পরিবারের কথা বলছি যেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকুরিজীবী ছিলেন। তাদের ছেলের যখন ৫ বছর বয়স, তখন বাসায় যে নারী গৃহকর্মীর কাছে শিশুটি থাকতো, সে নিয়মিতভাবে শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করতো। শিশুটি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলে ও ওই গৃহকর্মীকে ভয় পেতে শুরু করলে, বাবা-মা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে বিষয়টি সম্পর্কে বুঝতে পারেন। এই ঘটনা তাদের ওপর এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে সেই মা শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। শিশুর প্রতি যৌন অপরাধ হলে মুখ খুলতেই হবে, ট্যাবু ভাঙতেই হবে। অধিকাংশ শিশু হয়তো এই বিষয়টি ঠিকমতো বুঝেই না। আর সেই সুযোগেই অপরাধী ব্যক্তি শিশুকে ধর্ষণ, অজাচার (ইনসেস্ট), ওরাল সেক্স, পর্নোগ্রাফি, যৌনাঙ্গে বা মলদ্বারে কোনো কিছু প্রবেশ করানো, শিশুকে নগ্ন ছবি প্রদর্শন অথবা ছবি তোলার মতো কাজগুলো করে বা করিয়ে নেয়। এগুলো সবই যৌন হয়রানি। অসংখ্য মেয়ে ও ছেলেশিশু প্রতিদিন যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এ বিষয়ে কথা বলতে মানুষ এখনও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ এরকম ঘটনা যে ঘটে তা অনেকেই স্বীকার করতে চান না, এড়িয়ে যান। ছোট শিশু রাকিবকে খাবারের লোভ দেখিয়ে বলাৎকার করেছিল তাদের প্রতিবেশী। রাকিবের বাবা বলছিলেন, তার আরেকটি কন্যা সন্তান আছে। যাকে নিয়ে তার পরিবার সবসময়ই সচেতন থাকতো। কিন্তু তার ছেলেরও যে বিপদ হতে পারে সে বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিলো না তার। লোকটা রাকিবকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে চুপ করে থাকতে বলেছিল। কিন্তু ওর প্যান্টে রক্ত দেখে ঘটনা বুঝতে পারে পরিবার। এই ঘটনায় রাকিবের পরিবার থানায় মামলা করেছিল এবং গ্রেফতার করা হয়েছিল অভিযুক্ত ব্যক্তিকে। কিন্তু এরকম অনেক যৌন নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের ঘটনায় মামলা দায়ের করাতো দূরে থাক অনেক সময় ঘটনা প্রকাশই হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা গণমাধ্যমকে বলেছেন, \"আমাদের আইনে ছেলে শিশু ধর্ষণের ব্যাপারে কিন্তু কিছু বলা নাই। এবং (বাংলাদেশের) আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী ছেলে শিশুরা যে ধর্ষণের শিকার হতে পারে, এই ধারণাটাই স্বীকার করে না”। আমাদের পরিবার ও সমাজে মেয়েশিশুকে অনেক বাবা মা সাবধান করেন বা চোখে চোখে রাখেন। কোনটা গুড টাচ, কোনটা ব্যাড টাচ তাকে তা জানানো হয়। কিন্তু ছেলেশিশুর ব্যাপারে আমরা একেবারে উদাসীন। একটি ছেলে শিশুকে কেউ চুরি বা অপহরণ করতে পারে, কিন্তু তাকে বলাৎকার করবে, এটা তারা ভাবেন না। বাংলাদেশের সমাজে পুরুষকে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে এটা খুব অপরিচিত এবং লজ্জার বিষয়। এই সমাজ ছেলেশিশু বা পুরুষকে ভুক্তভোগী হিসেবে কল্পনা করতে শেখেনি, কারণ পুরুষ ক্ষমতাবান। সুমন আহমেদ ১৪ বছর বয়সে যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও পরবর্তী ১৫ বছর ধরে সে ঘটনা তিনি গোপনেই রেখেছেন। \"এই ঘটনার কথা আমি কখনোই কাউকে বলিনি। আমার বা তার পরিবারকেও না। কারণ, পরিবারে তার একটা ভালো অবস্থান ছিলো। আর এ ধরনের ঘটনা যে ঘটতে পারে বা ঘটলে কী করতে হবে সে বিষয়েও আমার কোনো ধারণা ছিলো না।\" (বিবিসি বাংলা) একইরকম আরেকটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন শিকদার আলী (ছদ্মনাম)। জেলা শহরে স্কুলে পড়ার সময়ে ছাত্রাবাসে থাকলেও, মাঝেমাঝে খালার বাসায় যেতেন। সেখানে তার খালাতো বড় বোন নিয়মিত তাকে যৌনাচারে বাধ্য করতো। ক্রমে ভয়ে শিকদার আলী খালার বাসায় যাওয়া বন্ধ করেছিলেন। দশম শ্রেণিতে ওঠার পর বন্ধুদের সামনে মুখ খুলতে পেরেছিলেন শিকদার। এই ঘটনা তাকে মানসিকভাবে খুব অসুস্থ করে তুলেছিল। পরবর্তীতে তাকে কয়েক বছর ট্রিটমেন্ট নিতে হয়েছে। যৌন হয়রানির শিকার এক ছেলেশিশুর অভিভাবক বলেছেন, ‘ছেলের মুখ থেকে ঘটনা শুনে লোকলজ্জার কথা ভেবে প্রথমে চুপ ছিলাম। পরে যখন চিন্তা করলাম আজকে আমার ছেলের সঙ্গে এমন হয়েছে, কাল আরেকজনের সঙ্গে করবে। পরে লজ্জা-শরম বাদ দিয়ে প্রথমে ইউএনওকে জানাইলাম। তার সহযোগিতায় থানায় গিয়ে মামলা করেছি মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে।” বলাৎকারের শিকার রাকিবের বাবা ছেলেশিশুর ধর্ষণের ঘটনায় থানায় মামলাটি দায়ের করেছিলেন দণ্ডবিধির-৩৭৭ ধারায়। অথচ এধরনের মামলা হওয়ার কথা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে। কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ছেলেশিশুর যৌন নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্ট নয় বলে এই আইনে মামলা নেয়া হয়নি। দণ্ডবিধি ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা দেওয়া আছে এবং এই সংজ্ঞাটিই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গ্রহণ করা হয়েছে। সেই সংজ্ঞায় স্পষ্টভাবে পুরুষের মাধ্যমে নারী\'র ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে এই আইনে কিছু পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছেন অনেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমীন গণমাধ্যমকে বলেছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে \'শিশু\'র কথা বলা হলেও সেটা যে ছেলেশিশুর নির্যাতনকেও অন্তর্ভুক্ত করছে সেটা বুঝতে পারেন না অনেকেই। তাই \"ধর্ষণের সংজ্ঞায় শিশুর সংজ্ঞাতে আলাদাভাবে ছেলেশিশুর বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। তাহলে ধর্ষণ মানেই যে সেটা নারী কিংবা মেয়েশিশু ধর্ষণ, সে ধারণার অবলুপ্তি ঘটবে।\" চাইল্ড অ্যাডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি’র ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে যৌন হয়রানির শিকার শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন। আর এই কাজ করতে গিয়ে তিনি যৌন হয়রানি নিয়ে ক্লিনিক্যাল গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণায় শিশুদের যৌন হয়রানি বিষয়ে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। তাতে দেখা যায়, শতকরা ৭৫ ভাগ যৌন হয়রানির ঘটনাই ঘটে পরিবারের ঘনিষ্ঠজন, বন্ধু বা আত্মীয়দের মাধ্যমে এবং ছেলে শিশুরাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে (সূত্র: ডয়েচে ভেলে)। ভুক্তভোগী শিশুটিকেও বলা হয় এ কথা প্রকাশ না করতে। নিপীড়নকারী যদি পরিবারের সদস্য হয়, তার বিরুদ্ধে সাধারণত কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয় না। কাজেই পরিবারের পরিচিত বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত এই যুক্তিতে এগুলো গোপন করা এক ধরনের অপরাধ। আমাদের পরিবার ও সমাজে মেয়েশিশুকে অনেক বাবা মা সাবধান করেন বা চোখে চোখে রাখেন। কোনটা গুড টাচ, কোনটা ব্যাড টাচ তাকে তা জানানো হয়। কিন্তু ছেলেশিশুর ব্যাপারে আমরা একেবারে উদাসীন। একটি ছেলে শিশুকে কেউ চুরি বা অপহরণ করতে পারে, কিন্তু তাকে বলাৎকার করবে, এটা তারা ভাবেন না। বাংলাদেশের সমাজে পুরুষকে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে এটা খুব অপরিচিত এবং লজ্জার বিষয়। এই সমাজ ছেলেশিশু বা পুরুষকে ভুক্তভোগী হিসেবে কল্পনা করতে শেখেনি, কারণ পুরুষ ক্ষমতাবান। সেই কারণেই বাংলাদেশে ছেলেশিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রকাশিত হয় না। গুরুতর যৌন সহিংসতার ঘটনা কেবল তখনই প্রকাশিত হয়, যখন তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ছাত্রাবাসে বা কল-কারখানায় একটি ছেলে শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হলেও তা দীর্ঘ সময় আড়ালে থেকে যায়। বিষয়টি তখনই সামনে আসে যখন শিশুর জীবন শেষ হয়ে যেতে থাকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. স্নিগ্ধা রেজওয়ানা লিখেছেন, ”বিষয়টি বোঝার জন্য তাত্ত্বিকভাবে ক্ষমতা, জ্ঞান এবং দৃশ্যমানতার সম্পর্কের দিকে ফিরে যেতে হয়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী মিশেল ফুকোর পাওয়ার/নলেজ অথবা ক্ষমতা ও জ্ঞানের ধারণা আমাদের দেখায় যে ক্ষমতা কেবল দমনমূলক নয়। এটি নির্ধারণ করে কোন অভিজ্ঞতা ভাষা পাবে এবং কোনটি নীরব থাকবে। যখন আইন ধর্ষণকে নারীভিত্তিক অভিজ্ঞতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, তখন তা কেবল একটি আইনি সীমা নির্ধারণ করে না, বরং এটি নির্ধারণ করে কে ভুক্তভোগী হিসেবে কল্পিত হতে পারে।” কাজেই এই ট্যাবুটাই ভাঙতে হবে প্রথমে। প্রচার করতে হবে, সাবধান ও সচেতন হতে হবে যে শুধু মেয়ে শিশুকেই যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ করা হয় না, ছেলে শিশুকেও করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির বিষয়টি জবাবদিহিতার সংস্কৃতির আওতায় আনতে হবে। পরিবারে বা পরিবারের বাইরে, বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে কোনো শিশু (মেয়ে কিংবা ছেলে) যৌন হয়রানির শিকার হলে তা গোপন না করে মুখ খুলতে হবে আমাকে, আপনাকে, সবাইকে। সাহায্য চাইতে হবে শিশুর হয়ে এবং শিশুর জন্য। কোনো শিশু যৌন হয়রানির শিকার হলে তাকে বকা দেওয়া, ভয় দেখানো বা লুকিয়ে থাকতে বলা যাবে না। শিশুকে বলতে হবে তার প্রতি যে অন্যায় ও খারাপ আচরণ করা হয়েছে এর জন্য তার কোনো দোষ, ভয় বা লজ্জা নেই। লজ্জা বা দোষ সেই ব্যক্তির, যে তার সঙ্গে এই খারাপ আচরণ করেছে। কথা বলতে হবে প্রফেশনাল ক্রাইসিস কাউন্সিলরের সাথে। ছেলেশিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের বিষয়টিকে আর এড়িয়ে না গিয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য একদিকে যেমন পরিবার ও সমাজকে সচেতন করতে হবে, মানসিকতা বদলাতে হবে এবং অন্যদিকে আইনে সামান্য পরিবর্তন আনতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। সময় এসেছে ছেলেশিশুর যৌন নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার। অভিভাবক ও স্কুলের বড় দায়িত্ব এই সচেতনতাবোধ জাগিয়ে তোলার। ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক। এইচআর/এমএস
Go to News Site