Collector
বেগম জিয়ার উদ্বোধন করা পাথর খনি এখন লোকসানের মুখে | Collector
বেগম জিয়ার উদ্বোধন করা পাথর খনি এখন লোকসানের মুখে
Somoy TV

বেগম জিয়ার উদ্বোধন করা পাথর খনি এখন লোকসানের মুখে

দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ পাথর খনি মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঠিক পরিকল্পনা এবং বিপণনের অভাবে এই খনিটি দেশের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। খনি ইয়ার্ডে বিপুল পরিমাণ ব্লাস্ট ও বোল্ডার পাথর অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে থাকায় জায়গার অভাবে যেকোনো সময় খনিটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত এই খনিটি গত দুই অর্থবছরে ৪৪ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। চলতি অর্থবছরেও লোকসানের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং পাথর উৎপাদনে ব্যবহৃত অতি গুরুত্বপূর্ণ বিস্ফোরক বা এক্সপ্লোসিভ ‘অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট’ আমদানির ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপই এই লোকসানের অন্যতম কারণ। খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে, মজুত পাথর দ্রুত বিক্রি করতে এবং স্টক ইয়ার্ড খালি করে উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার স্বার্থে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রতি টনে গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা কম মূল্যে পাথর বিক্রি করা হচ্ছে। খনিটিকে সচল রাখতে হলে বিস্ফোরক আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক বা সিটিভ্যাট প্রত্যাহার, পাথর আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি এবং মধ্যপাড়ার পাথরের ট্যারিফ ভ্যালু বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাথর আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি টন পাথরের বেইজ ভ্যালু ১২-১৩ ডলার নির্ধারণ করে শুল্কারোপ করায় আমদানি খরচ কম হয়। সেক্ষেত্রে পাথরের বেইজ ভ্যালু বৃদ্ধি করে শুল্কায়ন করা হলে আমদানি মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি করা সহজ হবে। জানা গেছে, মধ্যপাড়া খনির প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ ফুট নিচ থেকে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পাথর উত্তোলন করা হয়। ভূগর্ভে পাথর ভাঙতে প্রথমে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এর জন্য প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের তিন টন বিস্ফোরক ব্যবহার করতে হয়, যা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্ফোরকের দাম অনেক বেড়ে যায়। পরে অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক সংকটে এই দাম আরও বাড়ে। বিদেশে ভূপৃষ্ঠ বা সারফেসে পাথর পাওয়া যায় বলে উৎপাদন খরচ অনেক কম। কিন্তু মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি করতে হয় আমদানি মূল্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে। আরও পড়ুন: দিনাজপুর বোর্ডে এবার এসএসসিতে বসছেন এক লাখ ৮১ হাজার শিক্ষার্থী চুক্তির সময় ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা, যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১২৩ টাকা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদন ঠিকাদারের বিলের ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় ও ২০ শতাংশ দেশীয় মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে ঠিকাদারের বিল পরিশোধে অতিরিক্ত প্রায় ৪৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এর বাইরে আগে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোকে (বিএমডি) বিক্রিত পাথরের ওপর ২.৫ শতাংশ রয়্যালটি দিতে হতো, যা এখন ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বিস্ফোরক আমদানিতে আগে কোনো শুল্ক না থাকলেও এখন ৩৭ শতাংশ সিটিভ্যাট দিতে হচ্ছে। এসব কারণে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে খনিতে প্রতিদিন রেকর্ড পরিমাণ পাথর উৎপাদন হলেও বিক্রি সে অনুযায়ী হচ্ছে না। ফলে খনি ইয়ার্ডে প্রায় ১৫ লাখ টন পাথরের বিশাল মজুত গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রেলপথে ব্যবহৃত ‘ব্লাস্ট’ এবং নদী শাসন কাজে ব্যবহৃত ‘বোল্ডার’ পাথরের পরিমাণই প্রায় ১৩ লাখ ২৭ হাজার টন। প্রতিদিন এই মজুত আরও বাড়ছে। মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের জন্যই ব্লাস্ট ও বোল্ডার উৎপাদন করা হয়। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে কয়েকটি মেগা প্রকল্পে নতুন রেলপথ নির্মাণে ভারত থেকে আমদানি পাথরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে গত চার বছর ধরে রেলপথে মধ্যপাড়ার ব্লাস্ট ব্যবহার কমে যাওয়ায় এই বিপুল মজুত গড়ে উঠেছে। দ্রুত এসব পাথর বিক্রি করে গতি বাড়াতে না পারলে স্থানাভাবে খনির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর উৎপাদন বন্ধ হলে প্রায় ৮০০ খনি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের এই খনিটি ১৯৯৪ সালে বেগম খালেদা জিয়া উদ্বোধন করেন এবং ২০০৭ সাল থেকে এটি উৎপাদনে যায়। তিনি বলেন, ‘২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে টানা পাঁচ বছর খনিটি লাভ করে ১০০ কোটি টাকা এবং দেনা পরিশোধ করে ৪০ কোটি টাকা পেট্রোবাংলাকে দেয়। কিন্তু হঠাৎ করে ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করতে অতিরিক্ত প্রায় ৪৫ শতাংশ টাকা লাগছে।’ তিনি আরও জানান, এর ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৭ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরও খনিটি লোকসানে চলছে। আরও পড়ুন: উৎপাদনে ফিরল বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের এক নম্বর ইউনিট এমজিএমসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী ডি. এম. জোবায়েদ হোসেন গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জানান, মধ্যপাড়ায় পাথর উত্তোলন খরচ বেশি হওয়ায় সরকারের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘খনি সচল রাখার জন্য বিস্ফোরক আমদানির ক্ষেত্রে ট্যাক্স ছাড় পাওয়া গেলে উৎপাদন খরচ কমে যাবে। উৎপাদন বাড়লে সরকারি কোষাগারে ভ্যাট ও ট্যাক্স বেশি জমা হবে। মধ্যপাড়ার খনি আছে বলেই আমদানি মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।’ তিনি জানান, গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত খনি ইয়ার্ডে মজুত পাথরের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে ব্লাস্ট প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন এবং বোল্ডার ৩ লাখ ৭৭ হাজার টন। খনির মোট উৎপাদনের ৫১ শতাংশই ব্লাস্ট ও বোল্ডার পাথর। দেশে প্রতি বছর পাথরের চাহিদা ৩ কোটি টনের বেশি, সেখানে মধ্যপাড়ায় উৎপাদন হয় ১৫-১৬ লাখ টন, যা মোট চাহিদার ৫-৭ শতাংশ। বাকি পাথর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ২০০৭ সালের ২৫ মে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। ২০১৪ সাল থেকে খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে বেলারুশের জেএসসি ট্রেস্ট সকটোস্ট্রয় এবং দেশীয় মাইনিং প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া করপোরেশন লিমিটেডের সমন্বয়ে গঠিত ‘জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম’ (জিটিসি)।

Go to News Site