Collector
মাওরি শিকড়, রাগবির আবহ আর ক্রিকেটে উত্থান- ক্লার্কের অনুপ্রেরণার গল্প | Collector
মাওরি শিকড়, রাগবির আবহ আর ক্রিকেটে উত্থান- ক্লার্কের অনুপ্রেরণার গল্প
Jagonews24

মাওরি শিকড়, রাগবির আবহ আর ক্রিকেটে উত্থান- ক্লার্কের অনুপ্রেরণার গল্প

রাগবি পাগল দেশে জন্ম, বাবা, দাদারা খেলেছেলন রাগবি; কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝেছেন, কেটিনি ক্লার্কের পথটা অন্যখানে। সেই পথ ধরে আজ তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জায়গা করে নিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের আপকামিং স্টার হিসেবে ধরা হচ্ছে তাকে, অধিনায়ক কোচ এমনকি টিম ম্যানেজমেন্ট সবার পছন্দের শীর্ষে এই ব্যাটার। বাংলাদেশের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচেও করেছেন ৩৭ বলে ৫১ রান। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে স্পিন মোকাবিলার প্রস্তুতি, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বদলে যাওয়া ধরণ, মাওরি শিকড় ও রাগবি থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে নিজের যাত্রা ও ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন ক্লার্ক। তারই চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো- জাগো নিউজ: আপনি একটি খেলাপ্রেমী পরিবার থেকে এসেছেন। আপনার দাদা উচ্চ পর্যায়ের রাগবি খেলেছেন এবং আপনার বাবা ও চাচাও একই পথ অনুসরণ করেছেন; কিন্তু আপনি ও আপনার ভাই তামাতি ক্রিকেট বেছে নিয়েছেন। আপনি ও আপনার ভাই কিভাবে ক্রিকেটে এলেন? কেটিনি ক্লার্ক: আমার মা-বাবা ছোটবেলা থেকেই খুব খেলাধুলাপ্রিয় ছিলেন এবং আমাদের নানা ধরনের খেলাধুলা করতে উৎসাহ দিতেন। ঠিক কিভাবে তামাতিকে ক্রিকেটে আনা হয়েছিল সেটা আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই, তবে সে আমাদের মধ্যে বড়- আমার থেকে প্রায় সাড়ে নয় বছর বড়। সে ক্রিকেটটা খুব পছন্দ করত এবং স্বাভাবিকভাবেই এতে বেশ ভালো ছিল। আমার সব ভাই’ই ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলেছে। আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন প্রায়ই মাঠের পাশে বসে তাদের খেলা দেখতাম এবং দলের পরিবেশের সঙ্গে থাকতাম। সেখান থেকেই মূলত ক্রিকেটের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। জাগো নিউজ: নিউজিল্যান্ডে রাগবি সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা এবং পুরো দেশই প্রায় রাগবি নিয়ে পাগল। এমন পরিস্থিতিতে যখন আপনার সামনে বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল, তখন রাগবি ছেড়ে ক্রিকেটে আসা কতটা কঠিন ছিল? নিশ্চয়ই এটা সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল? কেটিনি ক্লার্ক: ব্যাপারটা আসলে খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছে। ছোটবেলা থেকে রাগবি খেলতে চাওয়ার স্বপ্ন ছিল। আমার বাবা, চাচা এবং দাদাও উচ্চ পর্যায়ে খেলেছেন। ভাইয়েরাও খেলেছে। তাই রাগবি খেলাটা সবসময়ই স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে বুঝলাম ক্রিকেটে আমি অনেকটাই এগিয়ে আছি এবং হয়তো রাগবিতে সফল হওয়ার মতো যথেষ্ট বড় বা উপযুক্ত নাও হতে পারি। তাই সুযোগ যখন এসেছে ক্রিকেটে, তখন সেটাকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সব মনোযোগ এক জায়গায় রেখে চেষ্টা করেছি এবং আসা সুযোগগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। জাগো নিউজ: যেহেতু রাগবি আপনার রক্তে আছে, ক্রিকেটে মানসিক বা শারীরিক দিক থেকে কি রাগবি কোনোভাবে আপনাকে সাহায্য করেছে? কেটিনি ক্লার্ক: মানসিক দিক থেকে কতটা সাহায্য করেছে সেটা নিশ্চিত নই, তবে শারীরিকভাবে অবশ্যই সাহায্য করেছে। ছোটবেলায় সারা বছর বিভিন্ন খেলাধুলা করার ফলে স্বাভাবিকভাবেই ফিট থাকা যায়। ক্রিকেট তো সারা বছর খেলা যায় না- কিছু ইনডোর অনুশীলন করা যায়। তাই দুই ধরনের খেলাধুলা করা, অনুশীলন করা এবং সবসময় সক্রিয় থাকা ক্রিকেটের জন্যও সাহায্য করেছে। আর রাগবির দলগত পরিবেশ ক্রিকেটের থেকে আলাদা। সেখানে ভিন্ন ধরনের খেলোয়াড় ও মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়। তাই দুই ধরনের দলীয় পরিবেশের অভিজ্ঞতাও ভালো ছিল। জাগো নিউজ: আপনার ইনস্টাগ্রাম ফিড দেখে খুব বেশি সক্রিয় মনে হলো না। তবে কিছু রাগবি সম্পর্কিত ছবি দেখলাম। আপনি রাগবিও খেলেছেন? কেটিনি ক্লার্ক: হ্যাঁ, স্কুলের শেষ বছর পর্যন্ত রাগবি খেলেছি। ছোটবেলা থেকে খেলেছি এবং পরে যখন অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত হলাম, তখন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তখন বোঝা গেল ক্রিকেটেই আমি এগিয়ে আছি, তাই এটাকেই বেছে নিতে হয়েছে। তবে এখনও রাগবি দেখতে ভালো লাগে। আমার অনেক বন্ধু এখনও রাগবি খেলে, তাই মাঝে মাঝে ক্লাবে গিয়ে খেলা দেখা হয়। জাগো নিউজ: আপনি নিশ্চয়ই হাকার সঙ্গে পরিচিত। নিউজিল্যান্ড জাতীয় রাগবি ইউনিয়ন দল প্রতিটি ম্যাচের আগে মাওরি ঐতিহ্যের সম্মান হিসেবে হাকা পরিবেশন করে। আপনারও তো মাওরি শিকড় রয়েছে। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? কেটিনি ক্লার্ক: ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব বেশি গভীরভাবে এর সঙ্গে যুক্ত নই, যেমন ভাষা বলতে পারি না। তবে সারাজীবন এর আশেপাশেই বড় হয়েছি। বছরে এক-দু’বার আমরা উত্তরে যাই এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাই, যারা থাকে হোয়াংগারের আশেপাশে বা পাইহিলিয়া এলাকায়। সেখানে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা হয় এবং তাদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখা হয়। জাগো নিউজ: হাকার কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে? কেটিনি ক্লার্ক: আমার কাছে এটা যেন একটা চ্যালেঞ্জের সূচনা। এটা যেন ম্যাচের আগে মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করার একটা উপায়, পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার লড়াইয়ের জন্য মাথাকে প্রস্তুত করে নেওয়া। জাগো নিউজ: ২০০৩ সালে নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মার্টিন ক্রো উইজডেনে একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন যে মাওরি খেলোয়াড়রা নাকি ভালো ক্রিকেটার হয় না, তারা একদিনও মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু এখন অনেক মাওরি ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসেছে। আগে যেমন ট্রেন্ট বোল্ট বা শেন বন্ড ছিলেন। এখন নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে মাওরি ক্রিকেটারদের অবস্থান কিভাবে বদলাচ্ছে? কেটিনি ক্লার্ক: আমার মনে হয় এখন সুযোগ অনেক বেড়েছে। শুধু মাওরি নয়, সব ক্রিকেটারের জন্যই। এখন অনেক বেশি দল আছে, গ্রাসরুট পর্যায়ে অনেক কার্যক্রম রয়েছে। এতে অনেক বেশি মানুষ ক্রিকেটে আসার সুযোগ পাচ্ছে, বিশেষ করে মাওরি জনগোষ্ঠীও। তারা এখন খেলাটা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারছে এবং সেই সুযোগ পাচ্ছে। জাগো নিউজ: নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় আপনি কিভাবে দেখেন? যেমন ইশ সোধি ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং আরও অনেকেই অন্য দেশ থেকে এসেছেন। এই বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় কিভাবে একসাথে কাজ করছে? কেটিনি ক্লার্ক: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বললে, এখানে মানিয়ে নেওয়া খুব সহজ। সবাই আপনাকে একজন নিউজিল্যান্ডার হিসেবেই স্বাগত জানায়। আপনি যে কোনো পটভূমি থেকে আসুন না কেন, সবাই সেটা সম্মান করে। আমরা চেষ্টা করি একে অপরের সঙ্গে ভালোভাবে মিশে থাকতে এবং দল হিসেবে একসাথে খেলতে। জাগো নিউজ: প্রথম ম্যাচে আপনার ব্যাটিংটা আমি দারুণ ছিল। আপনি সত্যিই দেখিয়েছেন কিভাবে স্পিনারদের চাপে ফেলতে হয়। সুইপ ও রিভার্স সুইপ খেলেছেন, আর আমি দেখেছি আপনি পায়ের ব্যবহারও খুব ভালো করেছেন। আসলে রহস্যটা কী? কেটিনি ক্লার্ক: গত কয়েক বছরে আমি অনেক কাজ করেছি, বিশেষ করে বিজে ওয়াটলিং এবং ড্যানেইল ফ্লেইনদের মতো ক্রিকেটারদের সঙ্গে। প্রথমে নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনে আমার স্পিন খেলার দক্ষতা উন্নত করার জন্য কাজ করেছি। এরপর যখন জানলাম এই সফরে আসব, তখন তারা উপমহাদেশে খেলার যে অভিজ্ঞতা পেয়েছে সেখান থেকে যতটা সম্ভব শেখার চেষ্টা করেছি। তাদের অভিজ্ঞতাগুলো নিজের খেলায় যুক্ত করার চেষ্টা করেছি যাতে এখানে যে কোনো বোলারের বিপক্ষে তা কাজে লাগে। তারা আমার স্পিন খেলার উন্নতিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আর মূল বিষয় হলো মাঠে গিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে সেটা প্রয়োগ করা। জাগো নিউজ: আপনি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের মাধ্যমে বেশ আলোচনায় এসেছেন। বর্তমান সময়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট কিভাবে বদলাচ্ছে বলে মনে হয়? সুপার স্ম্যাশে আপনি টানা দুই মৌসুমে প্রায় ১৫০ স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন। এখনকার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বিবর্তন আপনি কিভাবে দেখেন? কেটিনি ক্লার্ক: এখনকার টি-টোয়েন্টি আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিময়। খেলাটা অনেক বেশি অনিশ্চিত ও আক্রমণাত্মক হয়ে গেছে। ব্যাটাররা এখন প্রথম বল থেকেই আক্রমণে যেতে প্রস্তুত থাকে। আবার যদি প্রথম দুই-তিন ওভারে সেটা কাজ না করে, তাহলে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করে। এখনকার খেলাটা খুবই আক্রমণাত্মক এবং ব্যাটাররা সত্যিই ২৫০ বা অন্তত ২০০ রান করার লক্ষ্য নিয়ে নামে। এখন মনে হয় ২০০ রান প্রায় সব জায়গাতেই গড় স্কোর হয়ে গেছে। বড় স্কোর ও উচ্চ স্ট্রাইক রেটই এখন টি-টোয়েন্টির মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশা করি এভাবেই চলবে, তবে ভবিষ্যতে কী হয় সেটা দেখা যাবে। জাগো নিউজ: আবার ক্রিকেটে ফিরি। অনেকেই বলেন আপনি দেখতে ফিন অ্যালেনের মতো। আপনি নিশ্চয়ই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের ম্যাচটা দেখেছেন? তার ব্যাটিং ছিল অসাধারণ। কেটিনি ক্লার্ক: অবশ্যই। ভোরে থাকায় খেলা দেখিনি, হাইলাইটস দেখেছিলাম, অবিশ্বাস্য ব্যাটিং করেছে। সে এখন যেভাবে সারা পৃথিবী ঘুরে শর্ট ফরম্যাট ক্রিকেট খেলছে এবং ভালো অর্থ উপার্জন করছে- সেটা অবশ্যই অনুপ্রেরণাদায়ক। দেখা যাক ভবিষ্যতে কী হয়। জাগো নিউজ: কয়েকদিন আগে একটি নিবন্ধে পড়লাম ফিন টি-টোয়েন্টিতে ‘৪০ বল মন্ত্র’ অনুসরণ করে। তার মতে, যদি সে ১২০ বলের ইনিংসে ৪০ বল খেলতে পারে, তাহলে তার স্বাভাবিক হিটিং বাকি কাজ করে দেবে। আপনার টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং মন্ত্র কী? কেটিনি ক্লার্ক: সত্যি বলতে নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্র নেই। আমি চেষ্টা করি যত দ্রুত সম্ভব উইকেট ও পরিস্থিতি বুঝতে। যদি আমরা আগে ব্যাট করি তাহলে দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে নেওয়া জরুরি। আর যদি রান তাড়া করি, তাহলে সঙ্গীর সঙ্গে ভালো যোগাযোগ রেখে ঠিক করতে হয় কোন বিকল্পগুলো ভালো এবং ইনিংসের কোন পর্যায়ে কী করা উচিত। জাগো নিউজ: আপনার অধিনায়ক ও নির্বাচকরা আপনাকে খুব সমর্থন করছেন। তারা আপনাকে অনেক উচ্চমানের খেলোয়াড় মনে করেন। এটা কেমন লাগে? কেটিনি ক্লার্ক: এটা অবশ্যই দারুণ অনুভূতি। এটা আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করে দলের জন্য সেরাটা দেওয়ার। সুযোগ যখন আসে তখন সেটা কাজে লাগানো এবং দলের জন্য যতটা সম্ভব ভালো পারফরম্যান্স দেওয়া- এটাই লক্ষ্য। জাগো নিউজ: রাগবি থেকে ক্রিকেটে আসা এবং এখন জাতীয় দলে খেলা- এই যাত্রার দিকে এখন ফিরে তাকালে কেমন লাগে? কেটিনি ক্লার্ক: শুরুটা যেখান থেকে হয়েছিল আর এখন যেখানে এসেছি- সেটা ভেবে ভালোই লাগে। গত দেড়-দুই বছরে সবকিছু খুব দ্রুত ঘটেছে। খুব বেশি দূরের কথা ভাবিনি, শুধু পারফরম্যান্সের দিকে মনোযোগ দিয়েছি। এখন নিউজিল্যান্ডের হয়ে খেলছি- এটা সত্যিই ভালো লাগছে। আশা করি এখানে দীর্ঘদিন থাকতে পারব। এসকেডি/আইএইচএস/

Go to News Site