Somoy TV
সজনে গাছ আমাদের দেশের আর দশটা গাছের মতো খুবই সাধারণ একটি গাছে। কিন্তু এর রয়েছে নানা ভেষজ গুণ। পুষ্টিবিদরা বলছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে পুষ্টিগুণে ভরপুর উদ্ভিদগুলোর একটি এই সজনে। এ কারণে একে ‘মিরাকল ট্রি’ তথা ‘অলৌকিক গাছ’ বলা হয়।তবে নতুন এক গবেষণায় এর আরও এক চমকপদ গুণ বা বড় উপকারিতার কথা সামনে এসেছে। জানা গেছে, এটি পানির ভেতরের মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতে খুবই কার্যকর। ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, এই গাছের বীজ থেকে তৈরি নির্যাস পানির মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাতে প্রচলিত রাসায়নিকের মতোই কার্যকর। তাদের এই গবেষণা চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়েছে। সজনে গাছকে ইংরেজিতে মরিঙ্গা ট্রি বলে। বৈজ্ঞানিক নাম মরিঙ্গা ওলিফেরা। হাজার বছর ধরে গাছটি পানি পরিষ্কার করতে ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মিশরীয়রাও এটি ব্যবহার করত বলে জানা যায়। গবেষণার একজন লেখক এবং সাও পাওলো স্টেট ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক আদ্রিয়ানো গনসালভেস দোস রেইস এ কথা জানিয়েছেন। তিনি ও তার সহকর্মীরা প্রায় ১০ বছর ধরে এই গাছের বীজ নিয়ে গবেষণা করছেন। বিশেষ করে বীজগুলো কীভাবে ‘কোয়াগুল্যান্ট’ হিসেবে কাজ করে তা নিয়ে। কোয়াগুল্যান্ট এমন একটি পদার্থ যা পানির ছোট ছোট কণাগুলোকে একত্রিত করে বড় দলায় পরিণত করে, যাতে সহজে ফিল্টার করে সরানো যায়। পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে এই মরিঙ্গা বা সজনে বীজ এই অনাকাঙ্ক্ষিত কণাগুলো দূর করতে কতটা কার্যকর, সেটাই দেখিয়েছে গবেষকরা। মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো খুবই ছোট প্লাস্টিকের কণা, যার আকার এক ইঞ্চির প্রায় ১/২৫,০০০ ভাগের সমান (প্রায় ১ মাইক্রোমিটার)। এগুলো বর্তমানে পানিতে প্লাস্টিক দূষণের একটি গুরুতর সমস্যা। আরও পড়ুন: ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে সজনে পাতা এই কণাগুলো এখন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র পাওয়া যাচ্ছে—গভীর সমুদ্র থেকে শুরু করে উঁচু পাহাড় পর্যন্ত। এগুলো আমাদের খাবার ও পানিতেও মিশে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে পরীক্ষা করা কলের পানির ৮৩ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, এই কণাগুলো এরই মধ্যে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করেছে—মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ এবং হৃদ্যন্ত্রের সিস্টেমেও এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর পুরো প্রভাব এখনো বিজ্ঞানীরা পরিষ্কারভাবে বুঝে উঠতে পারেননি। তবে প্রাণীর ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রজনন সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্য নষ্টের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে পিভিসি (PVC) ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর নজর দেন, কারণ এগুলো সবচেয়ে ক্ষতিকরগুলোর একটি এবং পানীয় পানিতে প্রায়ই পাওয়া যায় বলে জানান গবেষক গনসালভেস দোস রেইস। তারা গড়ে ১৮.৮ মাইক্রোমিটার আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে পরীক্ষা করেন—যা মানুষের চুলের গড় পুরুত্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফিল্টার ব্যবস্থায় ব্যবহার করলে সজনে বীজের নির্যাস প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে সক্ষম। এই কার্যকারিতা প্রচলিত রাসায়নিক কোয়াগুল্যান্ট অ্যালুমিনিয়াম সালফেট (অ্যালাম)-এর সঙ্গে প্রায় সমান। আরও পড়ুন: সজনে ফুলের উপকারিতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পানির ক্ষারীয়তা বেশি হলে মরিঙ্গা বীজ অ্যালামের চেয়েও ভালো কাজ করে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। সজনে বীজ ব্যবহারের বড় সুবিধা হলো—এটি নবায়নযোগ্য, সহজে পচনশীল, কম বর্জ্য (স্লাজ) তৈরি করে এবং বিষাক্ততার ঝুঁকিও কম। অন্যদিকে, অ্যালুমিনিয়াম বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর হতে পারে এবং এটি স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও উল্লেখ করেছেন গবেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন (তিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না) বলেন—অ্যালুমিনিয়ামভিত্তিক ফিল্টার ব্যবস্থার বদলে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করলে এটি পিভিসি মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের জন্য আরও সস্তা ও টেকসই সমাধান হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এতে অ্যালুমিনিয়াম খননের প্রয়োজনও কমবে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সজনে বীজ দিয়ে প্রায় ১০ লিটার পানি পরিশোধন করা যায়। এটি আশাব্যঞ্জক হলেও বড় শহরের পানি পরিশোধন কেন্দ্রে যেখানে বিপুল পরিমাণ পানি প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সেখানে প্রচুর পরিমাণ বীজের প্রয়োজন হবে বলে জানান গবেষক গনসালভেস দোস রেইস। আরও পড়ুন: সজনে ডাটার জাদুকরী ১০ গুণের কথা আগে জানতেন? তার মতে, এই পদ্ধতি ছোট কমিউনিটি বা যেখানে রাসায়নিক কোয়াগুল্যান্ট সহজলভ্য নয়—সেসব জায়গার জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে। আরেকটি সম্ভাব্য সমস্যা হলো, বেশি পরিমাণ বীজ ব্যবহার করলে পানিতে জৈব বর্জ্য বাড়তে পারে, যা পরে আলাদাভাবে অপসারণ করতে হবে। এই পদ্ধতি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন—সজনে বীজের নির্যাস কীভাবে ভেঙে যায়, ধরা পড়া পিভিসি কণাগুলোর পরিণতি কী, আর এটি বড় পরিসরে কতটা কার্যকর ও সাশ্রয়ী হবে—এসব বিষয় এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পেন। তিনি আরও বলেন, সজনে শুধু পিভিসি নয়, অন্যান্য ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ন্যানোপ্লাস্টিকের ক্ষেত্রেও কতটা কার্যকর—সেটিও জানা জরুরি। ন্যানোপ্লাস্টিক হলো আরও ক্ষুদ্র কণা, যা মানুষের চুলের গড় প্রস্থের প্রায় এক হাজার ভাগের এক ভাগ, এবং এগুলোই সবচেয়ে সহজে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষক গনসালভেস দোস রেইস মনে করেন, সজনে বীজ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে, এবং ভবিষ্যৎ গবেষণায় তারা এ বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ক্যাম্পেনের মতে, এখনই মাইক্রোপ্লাস্টিক মোকাবিলার সমাধান খুঁজে বের করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের শরীরে এসব কণার উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে এবং এই প্রবণতা আগামী বহু বছর ধরে পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।তথ্যসূত্র: সিএনএন
Go to News Site