Collector
চট্টগ্রামে পানিতে ডুবেছে স্বপ্ন | Collector
চট্টগ্রামে পানিতে ডুবেছে স্বপ্ন
Jagonews24

চট্টগ্রামে পানিতে ডুবেছে স্বপ্ন

চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড় ও মেডিকেল কলেজ এলাকার জমে থাকা পানি এখন আর শুধু বর্ষার মৌসুমি দুর্ভোগের নাম নয়। এটি ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে এক নগরব্যর্থতার প্রতীকে, যেখানে একই সঙ্গে ডুবে যাচ্ছে মানুষের চিকিৎসাসেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, জীবিকার ভরসা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই এই এলাকার সড়ক, দোকানপাট ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পানি ঢুকে পড়ার যে দৃশ্য তৈরি হয়েছে, তা স্থানীয়দের কাছে নতুন নয়, তবে এবারের ক্ষয়ক্ষতি তাদের ভাষায় ‘আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ’। টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে প্রবর্তক মোড়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটক, পাঁচলাইশ ও আশপাশের নিচু এলাকা হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। ব্যস্ততম এই এলাকায় স্বাভাবিক চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। অফিসগামী মানুষ, রোগী, পরীক্ষার্থী, শিক্ষার্থী সবার পথই আটকে যায় ময়লা পানিতে। কেউ জুতা হাতে নিয়ে এগিয়েছেন, কেউ মাঝপথ থেকে ফিরে গেছেন, আবার কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। পরীক্ষাগার নয়, এখন জলাবদ্ধতার প্রতীক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের একটি বেসরকারি সেন্ট্রাল ল্যাব এখন এই দুর্ভোগের এক নির্মম প্রতীক। একসময় যেখানে প্রতিদিন শত শত রোগীর রক্ত, প্রস্রাব ও অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্ট তৈরি হতো, সেই ল্যাবের প্রায় সব যন্ত্র এখন অচল। আরও পড়ুন- বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে হাওরের ৩ হাজার হেক্টর ধানের জমিপানির চাপে ভেঙে গেলো ঝিনারিয়া হাওরের রাস্তা, ডুবছে ফসলএবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের? সেন্ট্রাল ল্যাব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক রবিউল ইসলাম বলেন, প্রায় এক বছর ধরে ড্রেনেজ লাইনের কাজ চলছে, কিন্তু শেষ হচ্ছে না। নালা বন্ধ থাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি ভেতরে ঢুকে পড়ে। একটার পর একটা মেশিন নষ্ট হয়েছে। এখন রিপোর্টিং সার্ভিসও প্রায় বন্ধ। তিনি জানান, কয়েক লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন পরীক্ষার যন্ত্র পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, এতে রোগীরাও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রবিউলের কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট। তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে প্রথমে ভাবতে হয়, আজ পানি উঠবে কি না। চিকিৎসা সেবা দেওয়ার চেয়ে এখন পানি সামলানোই বড় কাজ হয়ে গেছে। এক বৃষ্টিতে পাঁচ লাখ মানুষের দুর্ভোগ মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই নগরের অন্তত ২০টি এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। নগরজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয় বলে স্থানীয়দের দাবি। প্রধান সড়ক থেকে গলিপথ, দোকান থেকে আবাসিক ভবন সব জায়গায় একই চিত্র। আরও পড়ুন- বন্যার আগে বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে হাওরের ধানঅতিবৃষ্টিতে হাওরে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধানসুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেলো এরনবিলের বাঁধ বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রবর্তক এলাকায় আয়াত সার্জিক্যাল নামের আরেকটি দোকানের সামনে এখনো থইথই করছে পানি। দোকানের ভেতরের মেঝে সড়কের চেয়ে অন্তত চার-পাঁচ ফুট নিচু হওয়ায় পানি বের হয়নি। ভেতরে ঢোকার উপায় নেই। কর্মচারীরা বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন কখন পানি নামবে। দোকান মালিক তানভির আহমেদ বলেন, আগে কখনো এভাবে পানি ঢোকেনি। তাই কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। প্রথমে ভেবেছিলাম হাঁটুপানি হবে, তাই কিছু মালামাল উঁচু তাকে উঠিয়েছিলাম। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে পানি পাঁচ ফুটের ওপর উঠে গেলো। তিনি জানান, দোকানের ১০ জন কর্মচারী মিলে কিছু সরাতে চাইলেও পানির চাপ এত বেশি ছিল যে কিছুই রক্ষা করা যায়নি। লাখ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট সেন্ট্রাল ল্যাব এবং আয়াত সার্জিক্যালে পানিতে নষ্ট হয়েছে প্রায় সব চিকিৎসা সরঞ্জাম। ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার, ইলেকট্রিক বেড, নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর, ব্লাড প্রেসার মেশিন, অক্সিমিটার, সার্জিক্যাল বেল্ট, কম্পিউটার, মনিটর, সিসিটিভি ক্যামেরা, আইপিএস সবই পানির নিচে ডুবে যায়। আয়াত সার্জিক্যালের তানভির বলেন, অনেক যন্ত্রপাতি আজ সিটি করপোরেশনের গাড়িতে তুলে ফেলে দিতে হয়েছে। এগুলো আর মেরামত করার মতো অবস্থায় নেই। সেন্ট্রাল ল্যাবের রবিউল ইসলাম বলেন, নতুন করে শুরু করব কীভাবে বুঝতে পারছি না। ঋণ করে আবার দোকান চালু করতে হবে। কিন্তু সামনে তো পুরো বর্ষা। আবার যদি একই ঘটনা ঘটে! ধীরগতির প্রকল্প নিয়ে ক্ষোভ তানভিরের দোকানের পেছনেই রয়েছে ‌‘হিজড়া খাল’। বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় খালটির সম্প্রসারণ কাজ চলছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাজের ধীরগতি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। আরও পড়ুনবুড়িগঙ্গার শাখা নদী এখন ভাগাড়, দুর্ভোগে এলাকাবাসী৪০০ বছরের হরিগঞ্জ খাল এখন সরু নালাসাভারের ট্যানারি বর্জ্য কেড়ে নিচ্ছে ধলেশ্বরীর প্রাণ স্থানীয় আরেক ব্যবসায়ী বলেন, সাত-আট মাস ধরে কাজ চলছে। বলা হয়েছিল এক মাসে শেষ হবে। খালে অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। বৈশাখে বৃষ্টি হবে, এটা তো নতুন কিছু না। কিন্তু সেই হিসাব কেউ রাখেনি। তার অভিযোগ, সময়মতো বাঁধ সরিয়ে দিলে এত পানি জমত না। ওষুধের দোকানে হাঁটুসমান পানি প্রবর্তক মোড়ের কাছেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। বিপরীত পাশে শত শত ফার্মেসি। এর মধ্যে ছোট একটি ফার্মেসি ‘মা ড্রাগ হাউস’। দোকানের ভেতরে এখনো হাঁটুসমান পানি। ভেজা মেঝেতে একটি টুলের ওপর বসেছিলেন কর্মচারী বিংকি দাশ। তিনি বলেন, হঠাৎ পানি ঢুকে যায়। নিচে রাখা প্রায় সব ওষুধ নষ্ট হয়ে গেছে। দুই লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। তার ভাষায়, এত বছর এখানে কাজ করছি। আগে কখনো দোকানের ভেতরে পানি ঢোকেনি। ওষুধের দোকানে এমন ক্ষতির মানে শুধু আর্থিক লোকসান নয়, এতে রোগীরাও প্রয়োজনীয় ওষুধ পেতে সমস্যায় পড়ছেন। তরুণ চিকিৎসকের স্বপ্নে ধাক্কা প্রবর্তক এলাকার একটি ভবনের নিচতলায় দন্তচিকিৎসক উম্মে রিফাত হাসনাত নাবিলার ছোট্ট চেম্বারটি এখন অচল। কিছুদিন আগেই নিজস্ব চেম্বার শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু এক বিকেলের পানিতে তার প্রায় সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। আরও পড়ুনবিলুপ্তির ঝুঁকিতে ইরাকের ঐতিহাসিক দজলা নদীএক সময়ের খরস্রোতা নদী এখন সরু নালাকালনী-কুশিয়ারার পেটে যাচ্ছে শত বছরের জনপদ চেম্বারে ঢুকে দেখা যায়, রোগী বসার চেয়ার, টেবিল, ফাইলপত্র, দেয়ালের সকেট- সবকিছু ভেজা। পানির নিচে ডুবে গেছে ডেন্টাল চেয়ার ইউনিট, স্কেলার মেশিন, মাইক্রোমোটর, এয়ার কম্প্রেসার, অটোক্লেভসহ প্রায় সব সরঞ্জাম। নাবিলা বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে চেম্বারটা সাজিয়েছিলাম। নতুনভাবে পেশাজীবন শুরু করেছি। কিন্তু একদিনের পানিতে সবকিছু থেমে গেলো। তিনি বলেন, এখন নতুন করে শুরু করতে হবে। কিন্তু সেই সামর্থ্য নাই। কিন্তু চলার জন্য হলেও ধারকর্জ করে শুরু করতে হবে। রোগীর স্বজনের প্রশ্ন চিকিৎসার জন্য আসা রোগীর স্বজনদের দুর্ভোগ ছিল আরও বেশি। মাকে অপারেশনের জন্য নিয়ে আসা নাছির উদ্দীন বলেন, গতকালও কয়েক ঘণ্টা পানিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ডাক্তারের কাছে পৌঁছাতে পারিনি। আজও একই অবস্থা। অসুস্থ মানুষ নিয়ে বারবার ফিরে যেতে হচ্ছে। আমাদের অপরাধ কী? তার এই প্রশ্নই যেন প্রবর্তকের জলাবদ্ধতায় আটকে পড়া হাজারো মানুষের প্রশ্ন। সেলুন ছেড়ে রিকশার হ্যান্ডেল প্রবর্তক মোড়ে অনিক নামের এক তরুণ আগে ছোট একটি সেলুন চালাতেন। দুই দিনের পানিতে তার দোকানের চেয়ার, আয়না, যন্ত্রপাতি সব নষ্ট হয়ে গেছে। দোকানের ভেতরে এখনো কাদা আর দুর্গন্ধ। অনিক বলেন, দোকান বন্ধ। আয় বন্ধ। পরিবার চালাতে হবে। তাই রিকশা চালাচ্ছি। একটু থেমে তিনি বলেন, চুরি-ডাকাতি তো করতে পারি না। তাই রিকশাই চালাচ্ছি। তার কথায়, জলাবদ্ধতা শুধু দোকান নষ্ট করেনি, বদলে দিয়েছে জীবনের পথও। কেন বাড়ছে জলাবদ্ধতা স্থানীয়দের মতে, পানি নিষ্কাশনের খাল দখল, অপরিষ্কার নালা, জলাধার ভরাট, সিলট্র্যাপ না থাকা এবং অসমাপ্ত উন্নয়নকাজ সব মিলিয়ে নগরের জলাবদ্ধতা ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে কর্ণফুলি নদীতে জোয়ারের সময় ভারী বৃষ্টি হলে নগরের পানি নদীতে নামতে পারে না। ফলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই বড় এলাকা ডুবে যায়। আরও পড়ুন:আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্পবন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্যপ্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’ পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৪৫ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। একই সময়ে আমবাগানে ৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ আরও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এর আওতাধীন খাল সংস্কার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান। বিশেষ করে হিজড়া খাল ও জামালখান খালের সংস্কার কাজ চলমান থাকায় কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে, যার ফলে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, এসব উন্নয়ন কাজ চলমান থাকার কারণে সাময়িক দুর্ভোগ তৈরি হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, আগামী ১৫ মে’র মধ্যে সিডিএ’র খাল সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের উন্নতি ঘটবে এবং জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। চলতি বর্ষা মৌসুমেই নগরীর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একটি শহরের ব্যর্থতা শুধু রাস্তার ওপর জমে থাকা পানিতে মাপা যায় না। তা বোঝা যায় নষ্ট হয়ে যাওয়া পরীক্ষাগারের মেশিনে, বন্ধ হয়ে যাওয়া চিকিৎসাকেন্দ্রে, পানিতে ভেসে যাওয়া ব্যবসায়, কিংবা সেলুনের কাঁচি ছেড়ে রিকশার হ্যান্ডেলে হাত রাখা একজন মানুষের চোখে। প্রবর্তক ও মেডিক্যাল কলেজ এলাকার জমে থাকা পানি তাই শুধু বৃষ্টির পানি নয়। এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ধীরগতির প্রকল্প আর অব্যবস্থাপনার জমে থাকা এক নীরব হিসাব যার বোঝা বয়ে চলেছেন সাধারণ মানুষই। এমআরএএইচ/এমআরএম

Go to News Site