Jagonews24
কংস নদীর পানি বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ওপরে হাওড়ের ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে ধনু নদের খালিয়াজুরি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টরে বোরো আবাদ করা হয়েছে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে যেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়েছে কৃষকদের। টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওর ও নদ-নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। এতে একদিকে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান, অন্যদিকে কাটা ফসলও শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে ফসল বাঁচাতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ঝাঞ্জাইল এলাকায় কংস নদীর পানি এরই মধ্যে বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ‘দুদিন আগেও জমিতে পাকা ধান ছিল। রাতে বৃষ্টিতে সকালে এসে দেখি সব পানির নিচে। সাত বিঘার মধ্যে মাত্র এক বিঘা তুলতে পেরেছি’ খালিয়াজুরী উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এখন পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে বাকি অর্ধেক জমির ধান এখনো মাঠে রয়েছে, যা পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। আরও পড়ুনধান হারিয়ে হাওরজুড়ে কৃষকের বোবাকান্নাএক সময়ের আশীর্বাদ কমলা নদী এখন কৃষকের জন্য ‘অভিশাপ’কালনী-কুশিয়ারার পেটে যাচ্ছে শত বছরের জনপদ পানিতে তলাচ্ছে ফসল, বাড়ছে আতঙ্ক অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বজ্রপাতের আশঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা। অনেক এলাকায় জমিতে জলাবদ্ধতা থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করাও সম্ভব হচ্ছে না। মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর এলাকার কৃষক মানিক সরকার বলেন, ‘দুদিন আগেও জমিতে পাকা ধান ছিল। রাতে বৃষ্টি হয়েছে। সকালে এসে দেখি সব পানির নিচে। সাত বিঘার মধ্যে মাত্র এক বিঘা তুলতে পেরেছি।’ পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হাওর থেকে ধান রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন কৃষক/ ছবি: জাগো নিউজ খালিয়াজুরীর কৃষক কুদ্দুস মিয়া বলেন, ‘বন্যার আশঙ্কায় আধাপাকা ধানও কেটে ফেলেছি। পানিতে তলিয়ে যাওয়ার থেকে যা পাই তাই ভালো।’ শুকানোর সুযোগ না থাকায় নতুন সংকট অনেক কৃষক মাড়াই করার জন্য ধান কাটলেও টানা বৃষ্টিতে সেগুলো শুকাতে পারছেন না। ফলে সেগুলোও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। কোথাও কোথাও খলায় রাখা ধানেও পানি উঠে গেছে। ‘ধনু নদে পানি কিছুটা বেড়েছে তবে এখনো হাওর নিরাপদ আছে। কৃষকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কাটতে পারেন, সে জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি আমরা বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে’ কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক শাহিন মিয়া বলেন, সকালে উঠে দেখি খলায় রাখা ধান পানিতে ভেসে গেছে। এখন কী করবো বুঝতে পারছি না। আরও পড়ুনএক সময়ের খরস্রোতা নদী এখন সরু নালাএবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?প্রিয়জনের হলুদ খাম এখন অতীত, যা আসে আইনি-তালাক নোটিশ ঝুঁকিতে ফসলরক্ষা বাঁধ হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধগুলোও এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। মোহনগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। ‘সব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিকে (পিআইসি) বাঁধ পাহারার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, সব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিকে (পিআইসি) বাঁধ পাহারার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। পাকা ধান কাটছেন কৃষকরা/ ছবি: জাগো নিউজ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা নতুন করে ঢল নামিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৮০ শতাংশ পাকা ধান মাঠে রাখা এখন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত কেটে ফেলাই সবচেয়ে নিরাপদ। ‘ধনু নদের খালিয়াজুরি পয়েন্টে পানি এখন বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। আর সবগুলো বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। তবে আজ থেকে আরও পানি বাড়বে, এতে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই বাঁধ হুমকির মুখে পড়বে’ এদিকে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সারা বছরের জীবিকা নির্ভর করে বোরো ফসলের ওপর। এই ফসল হারালে ঋণ শোধ, সংসার চালানো, এমনকি খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাঁচহাট গ্রামের কৃষক জলিল মিয়া বলেন, চোখের সামনে সব ডুবে যাচ্ছে। কেমনে ঋণ শোধ করবো, পরিবার চালাবো কিছুই বুঝতে পারছি না। আরও পড়ুনলোডশেডিং-ডিজেল সংকটে কপাল পুড়ছে কৃষকেরতাঁত শিল্পে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বিদ্যুৎ বিভ্রাট জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ধনু নদের খালিয়াজুরী পয়েন্টে পানি এখন বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। আর সবগুলো বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। তবে আজ থেকে আরও পানি বাড়বে, এতে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই বাঁধ হুমকির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনকে নিয়ে আমরা এলাকায় অবস্থান করছি। ফসল রক্ষা এবং বাঁধ রক্ষায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। হাওরাঞ্চলে বৃষ্টি-উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেত/ ছবি: জাগো নিউজ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওর অঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ধনু নদে পানি কিছুটা বেড়েছে তবে এখনো হাওর নিরাপদ আছে। কৃষকরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কাটতে পারেন, সেজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইউএনওরা মাঠে আছেন, তাদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে জিও ব্যাগ ফেলার দরকার, সেখানে তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পানি বাড়লে ঝুঁকি বাড়বে, সেক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এনএইচআর/এফএ/এএসএম
Go to News Site