Somoy TV
২০২৬ সাল বিশ্ব জলবায়ুর ইতিহাসে এক রহস্যময় সন্ধিক্ষণ। একদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে জমছে বিশাল উত্তাপ, অন্যদিকে আমাদের এই বদ্বীপ খ্যাত বাংলাদেশে বইতে শুরু করেছে গরম বাতাসের হলকা। বিজ্ঞানীদের কপালে এরইমধ্যে দুশ্চিন্তার ভাঁজ দেখা দিয়েছে। কারণটাও পরিস্কার। প্রকৃতিতে ফিরছে এক দানবীয় শক্তি, যার নাম ‘এল নিনো’। কিন্তু এবারের এল নিনো কোনো সাধারণ পরিবর্তন নয়। এবার একে বলা হচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’। যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ভাতের থালায়।এল নিনো (El Niño) স্প্যানিশ শব্দ। যার অর্থ ‘ছোট বালক’। তবে এর প্রভাব মোটেও ছোট নয়। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাস পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে যায়, যা ঠান্ডা পানিকে উপরে তুলে আনে। কিন্তু এল নিনোর সময় এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সাগরের বিশাল জলরাশি অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।বাংলাদেশের জন্য এল নিনো মানে হলো মৌসুমি বায়ুর দুর্বলতা। এ দেশে চাষাবাদ অনেকটা বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এল নিনোর কারণে আকাশে মেঘ জমবে কম, বৃষ্টি হবে নামমাত্র। গবেষণা বলছে, এল নিনোর বছরে বাংলাদেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাত গড়ে প্রায় ১৪৫ মিলিমিটার কমে যায়। যার প্রভাব পড়ে বেশ কয়েক জাতের ধানের ওপর। বৃষ্টির অভাবে আমন ধানের জীবনকাল বেড়ে যাচ্ছে, অর্থাৎ ধান পাকতে দেরি হচ্ছে। অন্যদিকে বোরো মৌসুমে দেখা দিচ্ছে তীব্র পানির সংকট। সেচ দিতে গিয়ে কৃষকের খরচ বাড়ছে কয়েক গুণ। ফলে চালের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।শুধু ধানই নয়, মাছ অথবা মাংসের দামও বাড়িয়ে দিতে পারে এল নিনো। যখন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়, তখন পুকুরের পানিতে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়, ফলে শুরু হয় মাছের মড়ক। অন্যদিকে অতিরিক্ত গরমে মুরগি মারা যায় কিংবা ডিম দেওয়া কমিয়ে দেয়। একে বলা হয় ‘হিট স্ট্রেস’। ২০২৬ সালের সুপার এল নিনোর প্রভাবে প্রাণিজ আমিষের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার পূর্বাভাস দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পাঁচ শতাংশ। কিন্তু সুপার এল নিনো এই পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যখন মাঠে ফসল কমবে, তখন বাজারে চাল, পেঁয়াজ আর মাছের দাম বাড়তে শুরু করবে। ইতিমধ্যেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক সীমা বা ‘থ্রেশহোল্ড’ অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। এটিই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আমরা একটি ‘সুপার এল নিনো’র দিকে ধাবিত হচ্ছি, যা ১৯৮২ বা ২০১৫ সালের ভয়াবহ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। মার্কিন ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার জানিয়েছে, এই গ্রীষ্মে এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৬২ শতাংশ। ‘সুপার এল নিনো’ বলতে বোঝানো হয় যখন সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়। ১৯৫০ সালের পর থেকে এটি মাত্র কয়েকবার ঘটেছে।এল নিনো বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল, ভারত এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে খরা ও তীব্র গরম দেখা দেওয়ার আশঙ্কা আছে। অ্যামাজনের বনাঞ্চলেও এর প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে এর উল্টো প্রভাব পড়বে কিছু জায়গায়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশ এবং দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ায় ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ২০১৫ সালের সুপার এল নিনোর সময় ইথিওপিয়ায় ভয়াবহ খরা হয়েছিল। পুয়ের্তো রিকোতে পানির সংকট তৈরি হয়েছিল। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে ভয়ংকর হ্যারিকেন মৌসুমও দেখা গিয়েছিল।অনেকেই ভাবেন এসি বা ফ্যান চালিয়ে গরমে স্বস্তিতে থাকবেন। কিন্তু সেখানেও বাগড়া দিতে পারে এল নিনো। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হিট পেনাল্টি’। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অতিরিক্ত গরমে ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির উপরে উঠলে উৎপাদন ক্ষমতা ৫ থেকে ৭ শতাংশ কমে যায়। এমনকি বাড়ির সোলার প্যানেলও তীব্র তাপে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ফলে চাহিদা তুঙ্গে থাকা স্বত্তেও লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি বাড়তে পারে। আরও পড়ুন: বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে হাওড়াঞ্চলেসরকারের সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে এরইমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। চরম আবহাওয়ায় নিজের শরীর ঠিক রাখাতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইসিডিডিআর,বি। অধিদপ্তর বলছে দুপুর ১২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত কড়া রোদ এড়িয়ে চলা উচিত। এছাড়া হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক তুলনামূলক স্বস্তি এনে দিতে পারে। শরীর ঠান্ডা রাখতে পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি বা স্যালাইন পান করা উচিত। এছাড়া এ সময় শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর রাখা বাঞ্চনীয়।বাংলাদেশ আজ জলবায়ু অভিযোজনে বিশ্বের রোল মডেল। সরকার ইতিমধ্যেই খরা মোকাবিলায় খাল পুনর্খনন শুরু করেছে। কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিতে চালু করা হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। এবার ‘অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন’ বা আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ দুর্যোগ আসার আগেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা।২০২৬ সালের এই সুপার এল নিনো বাংলাদেশের জন্য এক বড় পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। তবে এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা হয়তো নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু প্রস্তুতি আমাদের হাতেই আছে। সঠিক সময়ে সঠিক বীজ রোপণ, পানির অপচয় রোধ এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ালেই আমরা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে হয়তো জয় করতে পারবো!
Go to News Site