Collector
মহাকালের স্রোতে আজও অমলিন মান্না দে | Collector
মহাকালের স্রোতে আজও অমলিন মান্না দে
Somoy TV

মহাকালের স্রোতে আজও অমলিন মান্না দে

‘ক'ফোঁটা চোখের জল ফেলেছো যে তুমি ভালোবাসবে, পথের কাঁটায় পায় রক্ত না ঝরালে কী করে এখানে তুমি আসবে?’- এমনই সব অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গানের গায়ক কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে। উপমহাদেশের সংগীত অঙ্গনের উজ্জ্বল এ নক্ষত্রের আজ ১০৭তম জন্মবার্ষিকী।১৯১৯ সালের ১ মে আজকের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা সংগীতশিল্পী ও সুরকার মান্না দে। তার আসল নাম প্রবোধচন্দ্র দে হলেও বিশ্বে তিনি পরিচিত পান মান্না দে নামেই। সংগীতপ্রেমী পরিবারে জন্ম হওয়ায় ছোটবেলাতেই গানের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় মান্না দে-র। সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয় তার ছোট কাকা প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে। সেই সময় মান্না দে’র কাকার কাছে গান শিখতে আসতেন দবীর খাঁ, শচীন দেব বর্মণ, পংকজ কুমার মল্লিক-এর মতো বাঘা বাঘা গায়কেরা। কাকা যখন গান গাইতেন আর শেখাতেন তখন মনোযোগ দিয়ে শুনতেন মান্না দে। গানের প্রতি ঝোঁক থাকলেও মান্না দে কখনও গায়ক হতে চাননি। বরং খেলাধুলায় বেশি আগ্রহ থাকায় কখনও শিখেছিলেন কুস্তি। কখনও হতে চেয়েছিলেন ফুটবলার। আর পরিবার চেয়েছিলেন লেখাপড়া শিখে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হোক মান্না দে। কিন্তু কাকার মতো সুরের খেলা তার জীবনে জড়িয়ে যায়। যখন মান্না দে স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়তেন তখন কলেজের অফ পিরিয়ডগুলোই তাকে অজান্তে টেনে নিয়ে যায় গানের দিকে। অফ পিরিয়ডে কমনরুমে সাহেবি কলেজের বন্ধু-বান্ধব, ছাত্ররা যখন কাপ-পিরিচ বাজিয়ে ইংরেজি গান গাইতেন তখন কৃষ্ণ দে-র ভাতিজা হিসেবে শুনে শুনে শেখা কাকার গান গেয়ে উঠতেন মান্না। কখনও গাইতেন শচীন দেব বর্মণের গানও। এভাবেই কলেজে গায়ক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। বন্ধুরাই একদিন হঠাৎ মান্না দে-র নাম আন্তঃকলেজ গানের প্রতিযোগিতায় দিয়ে দেন। প্রতিযোগিতায় ভালো করার জন্য কাকাই তালিম দেন। প্রথম দুই বছরেই সবগুলো বিভাগে প্রথম হন। পুরস্কার হিসেবে পান একটা রূপার তানপুরা। এ তানপুরাই মান্নাকে নিয়ে আসে গানের জগতে। ১৯৪২ সালে ছোট কাকার সঙ্গে প্রথম বোম্বে অর্থাৎ বর্তমান মুম্বাই যান মান্না দে। শুরুতে কাকার সহকারী হিসেবে কাজ করেন, পরে কাজ শেখেন শচীন দেব বর্মণের অধীনে। ধীরে ধীরে নিজস্ব দক্ষতায় স্বনামধন্য গীতিকার ও সুরকারদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে ‘তামান্না’ চলচ্চিত্রে গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতসহ ভিন্ন ভাষায় প্রায় ৩৫০০-এর বেশি গান গেয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে কেরালার মেয়ে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী সুলোচনা কুমারনকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে দুই কন্যা, সুরমা ও সুমিতা। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন মান্না দে। প্রায় পঞ্চাশ বছর মুম্বাইয়ে কাটানোর পর জীবনের শেষ অধ্যায় কাটান বেঙ্গালুরুর কালিয়াননগরে। আরও পড়ুন: আসছে ‘গানপোকা’র প্রথম অফিসিয়াল অ্যালবাম ক্যারিয়ারে বাংলা, হিন্দি, ভোজপুরি, গুজরাটি, পাঞ্জাবী, অসমিয়া মগধি, মৈথিলীসহ ২৪ ভাষায় অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। মান্না দে'র গানে ফুটে উঠেছে মানুষের জীবনের নানা বৈচিত্র্য। তার গানে শুধু সুরের বিন্যাস নয়, জীবনের রঙিন উপাখ্যান- কখনও দর্শন, কখনও প্রেম, কখনও বিরহ আবার কখনও প্রতিফলিত হয়েছে নিঃসঙ্গতার মৃদু প্রতিধ্বনি। সংগীতে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭১ সালে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ, ২০০৭ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ঘরে তোলেন মান্না দে। এছাড়াও চারটি জাতীয় পুরস্কার, রবীন্দ্রভারতী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানজনক ডি–লিট, আলাউদ্দিন খাঁ পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। আরও পড়ুন: মুক্তি পেল ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২’ কোটি ভক্তের হৃদয়ে গায়কের কণ্ঠ আজও বাংলা ও ভারতীয় সংগীতকে সমৃদ্ধ করছে এক অনন্য উচ্চতায়। মান্না দে-র কালজয়ী গানের মধ্যে রয়েছে ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’, ‘এই কুলে আমি, আর ওই কুলে তুমি’, ‘কথা দাও আবার আসবে’, ‘সেই তো আবার কাছে এলে’, ‘আবার হবে তো দেখা’, ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’, ‘খুব জানতে ইচ্ছে করে’, ‘কত দিন দেখেনি তোমায়’, ‘যদি কাগজে লিখো নাম’, ‘তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন সবই তোমার অভিনয়’ ইত্যাদি। ২০১২ সালে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ২০১৩ সালেই শারীরিক জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েন মান্না দে। হাসপাতালের কেবিনে প্রিয় স্ত্রীর ছবি রেখে অসুস্থ অবস্থাতেই তার জন্য চারটি গান লেখেন। স্ত্রীর স্মরণে একটা আ্যলবাম তৈরি করতে চাওয়া গায়ক প্রায়ই বলতেন, ‘আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। সুলোচনা আমার পথ চেয়ে বসে আছে’। স্ত্রী মৃত্যুর এক বছরের মাথাতেই ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর জীবনখাতার সব হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে কোটি কোটি ভক্তদের কাঁদিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই কিংবদন্তি।

Go to News Site