Somoy TV
বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় ম্যাচের সময় তখন ২২ মিনিট। রেফারির ইশারা ডাগআউটের দিকে যেতেই সহকারী রেফারি বদলি বোর্ড উঁচিয়ে ধরলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে কিংস অ্যারেনায় তৈরি হলো গভীর আবেগে ভরা এক দৃশ্য।এটি কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ছিল না; ছিল ঘরোয়া লিগের ম্যাচ, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল ফর্টিস এফসি ও রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি। তবু পরিবেশটা যেন বিশ্বমঞ্চের বিদায়ী মুহূর্তকে ছুঁয়ে গেল। চতুর্থ রেফারির টেবিলের সামনে দুই দলের খেলোয়াড়রা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তৈরি করলেন সম্মানের পথ— পোশাকি ভাষায় যাকে বলা হয় ‘গার্ড অব অনার’। সেই করিডোরের মাঝ দিয়ে ধীর, সংযত পদক্ষেপে মাঠ ছাড়লেন মামুনুল ইসলাম। দুই দশকের বর্ণিল ক্যারিয়ারের পর্দা নামল ঠিক তখনই। দেশের ফুটবলে সৃজনশীল মিডফিল্ডের প্রতীক হিসেবে পরিচিত মামুনুলের বিদায়ের সেই মুহূর্তে পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এক ধরনের নীরব আবেগ— যেখানে বিষাদ আর সৌন্দর্য মিশে তৈরি করেছিল এক অনন্য দৃশ্য। মাঠের সীমানা অতিক্রম করার মুহূর্তে ডাগআউটে থাকা সতীর্থ, কোচিং স্টাফ ও কর্মকর্তারা তাকে জানালেন আন্তরিক বিদায়। একের পর এক ফুলের তোড়া তার হাতে তুলে দেওয়া হলো, গলায় জড়িয়ে দেওয়া হলো সম্মানের মালা— যেন কৃতজ্ঞতার প্রতীক হয়ে উঠল প্রতিটি মুহূর্ত। ক্লাব কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাফুফে প্রতিনিধিরাও শুভেচ্ছা জানাতে এগিয়ে এলেন, আর সবার ভালোবাসায় সিক্ত হলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম। গ্যালারিতে দর্শক খুব বেশি না থাকলেও আবেগের ঘাটতি ছিল না মোটেই। আরও পড়ুন: ইসরাইলি প্রতিনিধির সঙ্গে ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির করমর্দন করতে অস্বীকৃতি ২০০৫ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়ন-এর জার্সি গায়ে দেশের শীর্ষ ফুটবলে যাত্রা শুরু করা সেই তরুণ কি কখনো ভেবেছিলেন— দুই দশকেরও বেশি সময় পর, এমন সম্মান আর রাজকীয় আয়োজনে শেষ হবে তার বর্ণাঢ্য পথচলা? মাঠে কাটানো শেষ ২২ মিনিটেও মাঠে দেখা গেল সেই চেনা জাদু— মামুনুল ইসলামের বাঁ পায়ের কোমল টাচ, মাপা চিপ আর নিখুঁত পাসে বারবার ছন্দ ফিরে পেল খেলা। ম্যাচের উত্তেজনা যেন থামতেই চাইছিল না; অল্প সময়ের মধ্যেই হলো চারটি গোল। দুবার পিছিয়ে পড়েও ফর্টিস এফসি সমতায় ফিরল। বিদায়বেলায় সবার শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম। ছবি: ফর্টিস এফসি ২০২০ সালে বুরুন্ডির বিপক্ষে জাতীয় দলে শেষবার মাঠে নামার পর ঘরোয়া ফুটবলে গত মৌসুমে তিনি খেলেছিলেন বদলি হিসেবে সাতটি ম্যাচ। আর চলতি মৌসুমে এই ম্যাচই ছিল তার প্রথম উপস্থিতি— যা শেষ পর্যন্ত হয়ে থাকল পেশাদার ক্যারিয়ারের বিদায়ী অধ্যায়। শেষ হাসিটা অবশ্য ফর্টিসেরই; ৩-২ গোলের জয় মামুনুলের বিদায়কে করে তুলল আরও বর্ণিল ও স্মরণীয়। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন তিনি। চারপাশে দর্শকদের উচ্ছ্বাস, করতালি আর ভালোবাসা— সব মিলিয়ে চোখেমুখে ফুটে উঠল এক ধরনের তৃপ্তির ছাপ। শেষ বিকেলের অনুভূতিতে যেন ধরা দিল তার পুরো ক্যারিয়ারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গল্প। নিজের অবসর প্রসঙ্গে তিনি জানান, তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দলের সাফল্য। ‘অবসর নেওয়ার দিন আমার সতীর্থদের প্রতি বার্তা ছিল, আমাদের ৩ পয়েন্ট দরকার। কারণ, লিগে চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ হওয়ার দৌড়ে থাকতে হলে এই ৩ পয়েন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি চেয়েছিলাম, আমার অবসরের সিদ্ধান্ত যেন মাঠের খেলায় কোনো প্রভাব না ফেলে এবং আমার দল যেন সেরা ম্যাচটি খেলে। এবং আমরা ভালো খেলেই তিনটি পয়েন্ট নিয়ে ফিরছি।’ আরও পড়ুন: নিজের কেনা ক্লাবের প্রতি মেসি যে বার্তা দিলেন ক্যারিয়ারের অর্জন নিয়ে তার কণ্ঠে ছিল সন্তুষ্টির সুর। দেশের বিভিন্ন ক্লাবে খেলে নানা অভিজ্ঞতা আর সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ক্লাবে খেলে আমি কিছু না কিছু অর্জন করেছি। তবে চার বছর ধরে পাশে থাকা এই ক্লাবের (ফর্টিস) হয়ে একটি ট্রফি জেতার প্রবল ইচ্ছা আছে। ক্লাব আমাকে যে সম্মান দিয়েছে এবং যেভাবে আমার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে আমি নিজেকে একজন সুখী ও ভাগ্যবান মানুষ মনে করি।’ সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুললেন না এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার। টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে সতীর্থদের সঙ্গে তার সুসম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, জামাল ভূঁইয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টও তার প্রতি সহমর্মিতা ও ভালোবাসার প্রতিফলন। ‘খেলোয়াড় হিসেবে সব সময় নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি এবং ক্লাব ফুটবলে সফল হয়েছি। টিম ম্যানেজমেন্ট, অফিশিয়াল এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক ছিল। এমনকি জামাল ভূঁইয়াও আমাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছে, যা আমার প্রতি সহকর্মীদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।’ যাত্রার শুরুটা ২০০২ সালে, চট্টগ্রামের কল্লোল সংঘ-এর হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবলে। সেই শহর থেকেই উঠে এসে টানা প্রায় দুই যুগ মাঠে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে ২০২৬ সালে এসে টানলেন ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। বিদায়ের এই বিশেষ মুহূর্তে গ্যালারিতে ছিলেন তার স্ত্রী ও কাছের মানুষরা— যা পুরো আবহটাকে আরও আবেগঘন করে তুলেছিল। ম্যাচের ২২ মিনিটে যখন বদলি বোর্ড ওপরে উঠল, তখন শুধু একজন ফুটবলারের মাঠ ছাড়াই হয়নি; যেন শেষ হয়ে গেল এক দীর্ঘ, আলোচিত অধ্যায়। বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার সেই বিকেল ধীরে ধীরে শেষের দিকে গড়ালেও, মামুনুল ইসলামের বাঁ পায়ের নিখুঁত পাস, খেলার সূক্ষ্ম বোধ আর সৃজনশীলতা থেকে যাবে স্মৃতির পাতায়। জয়ের রঙে রাঙানো এই বিদায় যেন আরেকবার মনে করিয়ে দিল— মামুনুলদের মতো খেলোয়াড়রা আসলে হারেন না; তারা সবসময়ই বিজয়ের আভা নিয়েই মাঠ ছাড়েন।
Go to News Site