Somoy TV
কক্সবাজারের উপকূলের বাতাস এখন আর শুধু প্রাকৃতিক উপাদান নয়, এটি পরিণত হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শক্তিশালী উৎসে। দেশের অন্যতম বৃহৎ বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র এখান থেকে নিয়মিতভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অঞ্চল বায়ুবিদ্যুতের পাশাপাশি সমুদ্র ঢেউভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো আধুনিক প্রযুক্তির জন্যও অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। সব মিলিয়ে, কক্সবাজারের এই বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র শুধু একটি প্রকল্প নয়- এটি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার।সমুদ্রের হাওয়ায় ঘুরছে বিশাল বিশাল ব্লেড; প্রতিটি ব্লেডের দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার। আর ৯০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা দানবীয় টারবাইনগুলো যেন আধুনিক বাংলাদেশের নতুন শক্তির প্রতীক। কক্সবাজারে এখন বাতাসই হয়ে উঠেছে বিদ্যুতের জ্বালানি।কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল সব বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন। দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতির বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নতুন প্রযুক্তির সারি।কক্সবাজার সদর উপজেলা খুরুশকুল, পোকখালী, পিএমখালী আর চৌফলদণ্ডী- এই চারটি ইউনিয়নে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন। যেখানে খুরুশকুলে ৮টি, পিএমখালীতে ২টি, চৌফলদন্ডীতে ৭টি ও পোকখালীতে ৫টি। প্রতিটি টারবাইনের জন্য ব্যবহার করা হয় ২০ শতক জমি। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ৩ মেগাওয়াট। বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার ছাড়ালেই শুরু হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন।কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শিফট ইনচার্জ মানিক আহমেদ বলেন, ‘কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিটি টারবাইনের উচ্চতা প্রায় ৯০ মিটার এবং প্রতিটি ব্লেডের দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার। এসব টারবাইন চীনে নির্মিত হয়ে জাহাজে করে প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয় এবং পরে বার্জের মাধ্যমে কক্সবাজারে পরিবহন করে স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি টারবাইনের জন্য প্রায় ২০ শতক জমির প্রয়োজন হয়েছে।আরও পড়ুন: শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস টারবাইন স্থাপনের অনুমোদনপ্রতিটি টারবাইনের উৎপাদন ক্ষমতা ৩ মেগাওয়াট। বাতাসের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটারের বেশি হলে টারবাইনগুলো প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে, যা সাধারণত ৩০০ কিলোওয়াট থেকে ৩.৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠানামা করে। তবে বাতাসের গতি যখন প্রতি সেকেন্ডে ৯ মিটার বা তার বেশি হয়, তখন প্রতিটি টারবাইন সর্বোচ্চ ৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। এই অবস্থায় পুরো কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়।ছবি: সময় সংবাদমানিক আহমেদ আরও বলেন, এটি একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প, যেখানে গ্যাস, তেল বা কয়লার কোনো ব্যবহার নেই। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বাতাসের শক্তি ব্যবহার করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প নিয়মিতভাবে জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বর্তমানে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।প্রকল্পটি ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করেছে। এখানে ৮ জন বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার অপারেশন ও মেইনটেনেন্স টিমে কাজ করছেন, যারা চার বছরের অভিজ্ঞতায় এখন অনেক ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণ কাজ নিজেরাই সম্পন্ন করছেন।ইঞ্জিনিয়ার মানিক আহমেদ আরও বলেন, ‘কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্র থেকে আসা নিয়মিত বাতাস এই প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। যদি পুরো উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে এ ধরনের টারবাইন স্থাপন করা যায়, তাহলে আরও বড় পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে বায়ুবিদ্যুৎ একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।’এটি একটি সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প- এখানে নেই কোনো গ্যাস, তেল বা কয়লার ব্যবহার। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বাতাসের শক্তিই রূপান্তরিত হচ্ছে বিদ্যুতে। মূলত শীতকালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলেও গ্রীষ্মকালে বায়ুচাপ বেশি থাকায় বর্তমানে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ কিংবা ৬৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘণ্টায় নিয়মিতভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প সময়ন্বকারী কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, ‘কক্সবাজারে অবস্থিত বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সফলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছে। প্রকল্পটিতে টেকনিক্যাল টিম, শিফট ইনচার্জ এবং মেকানিক্যাল ইনচার্জের তত্ত্বাবধানে সার্বক্ষণিকভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে বায়ুর গতিবিধির ওপর নির্ভর করে এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ওঠানামা করছে। গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৬৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।’‘উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ কক্সবাজারের খুরুশকুল সাবস্টেশনের মাধ্যমে প্রায় ৪০টি গ্রিড টাওয়ার হয়ে ঝিলংজা গ্রিড উপকেন্দ্রে সংযুক্ত হচ্ছে। সেখান থেকে এটি দেশের জাতীয় গ্রিডে প্রবাহিত হয়ে সারাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে অবদান রাখছে।’আরও পড়ুন: রূপপুরে ‘জ্বালানি লোডিং’ কার্যক্রম শুরু কবে?এনামুল হক বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে বায়ুবিদ্যুৎ প্রযুক্তি এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। বিশেষ করে সমুদ্রবেষ্টিত ও উপকূলীয় অঞ্চলে এই প্রযুক্তির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশও এই খাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজারের ৬০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের একটি অনন্য ও পাইলট প্রকল্প হিসেবে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বর্তমানে এটি সফলভাবে উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।’এনামুল হক আরও বলেন, ‘এই অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে- বায়ু ও সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশের আমদানি নির্ভরতা- বিশেষ করে কয়লা, এলএনজি এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এতে শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও দেশ লাভবান হবে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিকল্পনায় বায়ু ও অন্যান্য সবুজ জ্বালানিকে অগ্রাধিকার প্রদান করেন। কক্সবাজারের এই বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র এরইমধ্যে জাতীয় গ্রিডে অবদান রেখে দেশের জ্বালানি খাতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’উৎপাদিত বিদ্যুৎ খুরুশকুল সাবস্টেশন হয়ে ৪০টি গ্রিড টাওয়ার অতিক্রম করে যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে এই সবুজ শক্তি।এ ব্যাপারে কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি বলেন, ‘বর্তমানে বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির স্থাপিত সক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট। বাতাসের গতি যদি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ মিটার থাকে, তাহলে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় অর্থাৎ ৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করতে সক্ষম হয়।’তিনি আরও বলেন, ‘বায়ুবিদ্যুৎ সম্পূর্ণভাবে বাতাসের গতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় উৎপাদন সবসময় পরিবর্তনশীল থাকে। বর্তমানে বাতাসের গতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম থাকলেও কক্সবাজার শহর ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ১৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ নিয়মিতভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।’এদিকে কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের মতে, এই অঞ্চল শুধু বায়ুবিদ্যুৎ নয়- সমুদ্র ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো নতুন প্রযুক্তির জন্যও অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।কক্সবাজার চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বহুমুখী উদ্যোগ না থাকলে সংকটকালীন সময়ে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। তাই বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলো কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার একটি উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এখানে সমুদ্র থেকে দক্ষিণমুখী বাতাস নিয়মিতভাবে প্রবাহিত হয় এবং এর গতিবেগও তুলনামূলকভাবে ভালো। পাশাপাশি এখানে পাহাড় ও সমুদ্রের সমন্বয় থাকায় প্রাকৃতিকভাবে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’ছবি: সময় সংবাদ তিনি আরও উল্লেখ করেন, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তর ও দক্ষিণ দিকের বাতাসের প্রবাহ অনেকটাই স্থিতিশীল। এসব এলাকার বায়ুর গতিবেগ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে যদি কার্যকরভাবে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে দেশের বিদ্যুৎ সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।চৌফলদন্ডিতে স্থাপিত বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কক্সবাজারের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এটি ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের পথ আরও সুগম করবে।আরও পড়ুন: রূপপুরে নতুন ইতিহাস /আগস্টের মাঝামাঝি জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎতিনি বলেন, ‘শুধু বায়ুবিদ্যুৎই নয়, কক্সবাজারে আরও কিছু অপ্রচলিত জ্বালানি সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের (ওয়েভ এনার্জি) সম্ভাবনাও এখানে রয়েছে। উন্নত দেশগুলো যেমন জাপান, চীন, তাইওয়ান ও ফিলিপাইন এরইমধ্যে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।’আবিদ আহসান সাগরের মতে, এসব নবায়নযোগ্য ও অপ্রচলিত জ্বালানি উৎস কাজে লাগাতে পারলে কক্সবাজার শুধু জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের অবদানই রাখতে পারবে না, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এতে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ সংকট অনেকাংশেই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।যেখানে বাতাসই হয়ে উঠছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন শক্তি এবং সেই শক্তিই যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে, কক্সবাজারের এই বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের উন্নয়নের ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে এটি জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।গত দু’বছরে কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
Go to News Site