Somoy TV
উদ্বোধনের দুই দশক পেরিয়ে গেলেও পুরোপুরি চালু হয়নি একটি ২০ শয্যার হাসপাতাল। এতে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। শুধু বহির্বিভাগ চালু থাকলেও নিয়মিত দেখা মেলে না চিকিৎসকের। রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ বিতরণ করেন ফার্মাসিস্ট।ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে চরাঞ্চল ২০ শয্যা হাসপাতাল। সদর উপজেলার চরাঞ্চলের লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ২০০৬ সালে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি। দোতলা এই হাসপাতালে নারীদের জন্য ১২টি ও পুরুষদের জন্য আটটি শয্যা থাকার কথা। চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য রয়েছে চারটি আবাসিক ভবনও। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফাঁকা ওয়ার্ডে ধুলোর স্তর জমেছে। অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) বাতি থাকলেও নেই টেবিল। বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে অ্যানেসথেসিয়া মেশিনসহ নানা যন্ত্রপাতি। হাসপাতালের পেছনের আবাসিক ভবনগুলোও পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ। হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, রোগীরা কলাপসিবল গেটের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের নাম লেখাচ্ছেন। রোগীদের নাম খাতায় লেখেন ওয়ার্ড বয় হিসেবে কর্মরত মো. হাসিম উদ্দিন। এরপর পাশের জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রোগীরা বলছেন তাদের কী কী ওষুধ লাগবে। মাস্টার রোলে কর্মরত আয়া শাহিনা আক্তারের কাছে প্যারাসিটামল, গ্যাসের ওষুধ, চুলকানির ওষুধ কিংবা শিশুদের জ্বরের সিরাপ; রোগীরাই বলে দিচ্ছেন তাদের কী প্রয়োজন। অথচ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) অনুযায়ী ফার্মাসিস্টের ওষুধ বিতরণ করার কথা থাকলেও এখানে রোগীরাই চিকিৎসকের মতো ওষুধ বলে যাচ্ছেন এবং ফার্মাসিস্ট তা বিতরণ করছেন। ছাতিয়ানতলা গ্রামের জান্নাত আক্তার গ্যাসের বড়ি, স্যালাইন ও ডায়রিয়ার ওষুধ চান এবং কথামতো তা পেয়েও যান। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার দেখাইনি। বলেছি ওষুধ দিতে, তারা দিয়ে দিয়েছে।’ মুর্শিদা বেগম নামের এক নারী বলেন, ‘সকাল ৯টায় এসেছি, লোকজন দেরিতে আসে। বড় ডাক্তার আসতে দেখি না। আমরা যা চাই, তা-ই দেয়।’ বোররচর গ্রামের ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘এখানে কোনো চিকিৎসা নেই। জ্বর, পেট খারাপ ও গ্যাসের কয়েকটি ওষুধ দেয়। বুক ধড়ফড় করছে, এর কোনো চিকিৎসা নেই। এখানে ডাক্তার নেই, কাকে দেখাব। আমরা টাকার ভয়ে ময়মনসিংহ যেতে পারি না। এখানে ডাক্তার থাকলে অনেক ভালো হতো।’ আরও পড়ুন: ব্রহ্মপুত্রের মাঝখানে জেগে ওঠা চরে বৈশাখী আয়োজন, নদকে বাঁচাতে আকুতি হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এখানে পাঁচজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শুধু ওষুধ বিতরণ করা হয়। প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ জন সেবা নেন বলে জানান ফার্মাসিস্ট মিন্টু চন্দ্র দে। তিনি বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ রোগীর ওষুধ দেয়া হয়। রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের সমস্যার কথা বলেন, আমরা ওষুধ দিয়ে দিই। রোগীরা ডাক্তারের কাছে প্রেসক্রিপশনের জন্য আসেন না। সর্বোচ্চ দু-চারজন প্রেসক্রিপশন করাতে আসেন।’ রোগীদের কথায় ওষুধ দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রোগীরা বললে ওষুধ দেয়ার সুযোগ নেই। আমি ২০২০ সালে এখানে যোগদানের পর থেকেই এভাবে ওষুধ দেয়া হতে দেখছি। এখনো এভাবেই চলছে!’ এদিকে অন্তর্বিভাগ চালু না থাকায় নার্সদেরও কোনো কাজ নেই। পাঁচজন নার্সের মধ্যে বৃহস্পতিবার উপস্থিত ছিলেন তিনজন। তাদের একজন চন্দনা রানী দত্ত বলেন, ‘অন্তর্বিভাগ থাকলে রোগী ভর্তি, ইনজেকশন দেয়াসহ সব কাজ থাকত। এখন শুধু মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য শিক্ষা দিই, প্রেশার মাপি।’ নবনিযুক্ত নার্স সাইফুর রহমান বলেন, ‘চাকরিতে ভালো কাজ করার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু এখানে সে সুযোগ নেই।’ জনবলকাঠামো অনুমোদন না হওয়ায় দুই দশকেও হাসপাতালটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হয়নি বলে জানান ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালটিতে গাড়িতে যেতে ঘণ্টা দেড়েক সময় লেগে যায়। চরাঞ্চলের মানুষের সেবার জন্য এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা খুবই জরুরি। জনবলকাঠামো অনুমোদনের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে আছে। এটি অনুমোদন হলে আমরা জরুরি ভিত্তিতে অন্তর্বিভাগ চালু করতে চাই। এতে ধীরে ধীরে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।’ রোগীদের চাওয়া অনুযায়ী ওষুধ বিতরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। আমি মনে করি এটি একটি অপরাধের মতো ব্যাপার। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।’
Go to News Site