Collector
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির উত্থান কেন? | Collector
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির উত্থান কেন?
Jagonews24

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির উত্থান কেন?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতি গত এক দশকে যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে, তা কেবল আঞ্চলিক নয় বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে ‘পরিবর্তন’-এর যে রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি হয়েছিল, তা ক্রমে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে আরেকটি প্রবণতা তা হলো ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র দ্রুত উত্থান। প্রশ্ন হলো, এই উত্থানের রহস্য কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক কাঠামো, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির বিকাশ, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সমসাময়িক নির্বাচনী কৌশল—সবকিছুকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে। ঐতিহাসিক মেরুকরণ থেকে নতুন বাস্তবতা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দ্বিমেরু কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ১৯৭৭ থেকে শুরু করে তিন দশকেরও বেশি সময় বামফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ছিল প্রধান বিরোধী শক্তি। এই সময়ের রাজনীতি মূলত শ্রেণিভিত্তিক ও আদর্শিক বিভাজনের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম এবং ২০১১ সালের ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এই চিত্র পাল্টে যায়। শ্রেণি-রাজনীতির জায়গা দখল করতে শুরু করে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি। রাজবংশী, গোর্খা, মতুয়া, মুসলমান—এমন বিভিন্ন গোষ্ঠী আলাদা রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে সামনে আসে। এই বহুমাত্রিক ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতি তৃণমূলের জন্য কার্যকর হলেও বিজেপির আদর্শিক কাঠামোর সঙ্গে তা আপাতদৃষ্টিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ‘হিন্দুত্ব’ বনাম বহুবচন: বিজেপির কৌশল বিজেপির মূল শক্তি নিহিত রয়েছে তার ‘একত্ববাদী’ রাজনৈতিক দর্শনে, যার কেন্দ্রবিন্দু হিন্দুত্ব। পশ্চিমবঙ্গের বিচ্ছিন্ন পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে একক ছাতার নিচে আনার জন্য বিজেপি এই হিন্দুত্ববাদী পরিচয়কে ব্যবহার করেছে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে। বিশেষ করে মতুয়া ও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই কৌশল সফল হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে যাদের সঙ্গে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের দূরত্ব ছিল। তাদের মধ্যেও ‘গর্বিত হিন্দু’ পরিচয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা Citizenship Amendment Act (সিএএ)-এর মতো ইস্যু এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এই কৌশলের ফলে ২০২১ সালের নির্বাচনে নমঃশূদ্র ভোটের একটি বড় অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল। অর্থাৎ, বিচ্ছিন্ন পরিচয়কে একক ধর্মীয় পরিচয়ে রূপান্তর—এটাই বিজেপির উত্থানের অন্যতম মূল চাবিকাঠি। ধর্মীয় মেরুকরণ: দ্বিমুখী রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে ধর্মীয় মেরুকরণ। বিজেপি যেমন হিন্দু ভোটকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছে, তেমনই তৃণমূল কংগ্রেসও মুসলমান ভোটব্যাঙ্ককে সুসংহত রাখতে চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনী সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ মুসলমান ভোট তৃণমূলের পক্ষে গেছে। অন্যদিকে, যে সব আসনে মুসলমান জনসংখ্যা বেশি, সেখানে বিজেপি হিন্দু ভোটের ব্যাপক মেরুকরণ ঘটাতে পেরেছে। যেমন রায়গঞ্জ বা মালদার মতো অঞ্চলে এই প্রবণতা স্পষ্ট। এই পরিস্থিতি এক ধরনের ‘বাইনারি পলিটিক্স’ তৈরি করেছে। যেখানে ভোটাররা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করছে। এর ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক বা উন্নয়নমূলক ইস্যুগুলি পেছনে চলে যাচ্ছে। নারী ভোটব্যাঙ্ক: তৃণমূলের পাল্টা শক্তি যেখানে বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরণের ওপর নির্ভর করছে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছে একটি শক্তিশালী ‘মহিলা ভোটব্যাঙ্ক’। বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি তারা হাতে নিয়েছে: যেমন কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার।  যা নারী ভোটারদের মধ্যে তৃণমূলের প্রভাব বাড়িয়েছে। ফলে হিন্দু ভোটের সম্পূর্ণ মেরুকরণ সম্ভব হয়নি। ২০২১ ও ২০২৪ সালের সমীক্ষা দেখায়, নারী ভোটের একটি বড় অংশ এখনও তৃণমূলের পক্ষে রয়েছে। এটি বিজেপির জন্য একটি বড় সীমাবদ্ধতা। ২০২৬ সালের নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি হবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চরিত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রশ্ন থেকে যায়—মেরুকরণের রাজনীতি কি বিজেপিকে চূড়ান্ত সাফল্য এনে দেবে, নাকি বহুত্ববাদী সামাজিক বাস্তবতা আবারও তাকে আটকে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ভোটারদের মনস্তত্ত্বে। যেখানে গণতন্ত্রের অঙ্ক কখনওই কেবল সংখ্যার সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিচয় রাজনীতির ভাঙন  বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন প্রবণতা স্পষ্ট তা হলো পরিচয়ভিত্তিক গোষ্ঠীগুলির ভেতরেই বিভাজন (Fragmentation)। মতুয়া সমাজে সিএএ ও নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। একইভাবে ওবিসি গোষ্ঠীগুলিও আর একক রাজনৈতিক অবস্থানে নেই। তাদের মধ্যে ও দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান। মুসলমান ভোটব্যাঙ্কও এখন একমুখী নয়। যেমন: ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)। এটি মূলত ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী-র নেতৃত্বে ২০২১ সালের ২১শে জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম)। যা হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার উপর কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট। সবাই এই ভোটব্যাঙ্কে ভাগ বসানোর চেষ্টা করছে। এই ‘ফ্র্যাকশনালাইজেশন’ নির্বাচনী অঙ্ককে আরও জটিল করে তুলেছে, যা বিজেপির জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনই অনিশ্চয়তাও বাড়াচ্ছে। জোট রাজনীতির অবসান ও চতুর্মুখী লড়াই ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো জোট রাজনীতির অবসান। তৃণমূল, বিজেপি, বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস—সবাই প্রায় এককভাবে নির্বাচনে লড়ছে। এই চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভোটের ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলবে। কারণ, ভোট ভাগাভাগি হলে কম শতাংশ ভোট পেয়েও আসন জেতা সম্ভব। বিজেপি এই পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে চাইছে। এসআইআর ও ভোটার রাজনীতি সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) একটি নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্ক নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। বিজেপি মনে করছে, এতে হিন্দু ভোটের সংহতি বাড়তে পারে। তবে বাস্তবে মুসলমান ও হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়েরই ভোটার বাদ পড়েছে, যা ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। রাজনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, চরম মেরুকরণ গণতন্ত্রের জন্য একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করে। Jennifer McCoy-এর মতে, মেরুকরণ মানুষকে এমনভাবে বিভক্ত করে যে তারা ‘অন্য’ পক্ষকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই তত্ত্বের প্রতিফলন স্পষ্ট। ভোটাররা এখন আর কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং পরিচয় ও আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পেছনে কয়েকটি মূল কারণ কাজ করছে। তা হলো:  ধর্মীয় মেরুকরণের সফল প্রয়োগ বিচ্ছিন্ন পরিচয়কে একক হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ে রূপান্তর বিরোধী ভোটের বিভাজন জোট রাজনীতির ভাঙন তবে এই উত্থান এখনও অসম্পূর্ণ। নারী ভোটব্যাঙ্ক, আঞ্চলিক পরিচয় এবং সামাজিক সুরক্ষা রাজনীতি বিজেপির সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালের নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি হবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চরিত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রশ্ন থেকে যায়—মেরুকরণের রাজনীতি কি বিজেপিকে চূড়ান্ত সাফল্য এনে দেবে, নাকি বহুত্ববাদী সামাজিক বাস্তবতা আবারও তাকে আটকে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ভোটারদের মনস্তত্ত্বে। যেখানে গণতন্ত্রের অঙ্ক কখনওই কেবল সংখ্যার সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকে না। লেখক : গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। vprashantcu@gmail.com  এইচআর/জেআইএম

Go to News Site