Collector
ভয় নয়, সময়মতো সার্জারি বাঁচাতে পারে জীবন | Collector
ভয় নয়, সময়মতো সার্জারি বাঁচাতে পারে জীবন
Jagonews24

ভয় নয়, সময়মতো সার্জারি বাঁচাতে পারে জীবন

স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সচেতনতা যতই বাড়ুক, ‘সার্জারি’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে এখনও ভয়, সংশয় আর নানা ভুল ধারণা কাজ করে। অথচ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সার্জারি এখন আগের চেয়ে অনেক নিরাপদ, সহজ এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারযোগ্য একটি প্রক্রিয়া। বিশেষ করে ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির মতো প্রযুক্তির কারণে রোগীদের কষ্ট অনেকটাই কমেছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হালদার কুমার গোলাপ। তিনি জেনারেল, কোলরেক্টাল, ব্রেস্ট ও ক্যান্সার সার্জারিতে অভিজ্ঞ এবং ল্যাপারোস্কপিক সার্জারিতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ছবি: সহকারী অধ্যাপক ডা. হালদার কুমার গোলাপ জাগো নিউজ: আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি কোন ধরনের রোগী বা সমস্যা নিয়ে মানুষ আসেন?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: আমার কাছে সবচেয়ে বেশি রোগী আসেন পিত্তথলীর পাথর, হার্নিয়া, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, কোলন ও রেকটামের সমস্যা এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে। এর মধ্যে পিত্তথলীর পাথর এবং হার্নিয়া সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। জাগো নিউজ: বাংলাদেশে সার্জারি নিয়ে রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা কী কী?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো অপারেশন মানেই বড় ঝুঁকি। অনেকেই মনে করেন, একবার অপারেশন করলে সারাজীবনের জন্য সমস্যা তৈরি হবে বা শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ ভয় পান যে অজ্ঞান করলে আর জ্ঞান ফিরবে না। এগুলো সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। জাগো নিউজ: ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি কী এবং এটি ওপেন সার্জারির থেকে কীভাবে আলাদা? সব রোগীর ক্ষেত্রে কি ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি করা সম্ভব?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে শরীরে ছোট ছোট ছিদ্র করে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে অপারেশন করা হয়। এতে বড় করে কাটা লাগে না। ওপেন সার্জারিতে যেখানে বড় ইনসিশন বা কাটা লাগে, সেখানে ল্যাপারোস্কপিতে ছোট ছিদ্রই যথেষ্ট। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে এটি করা সম্ভব নয়। রোগের ধরন, জটিলতা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাগো নিউজ: এই পদ্ধতির প্রধান সুবিধা কী কী?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো-কম ব্যথা, দ্রুত সুস্থ হওয়া, হাসপাতালে কম সময় থাকতে হয়, ক্ষত ছোট হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি কম, দৈনন্দিন জীবনে দ্রুত ফিরে যাওয়া যায়। আরও পড়ুন:  হামের প্রকোপ বাড়ছে, সতর্ক করলেন ডা. শামীমা ইয়াসমীন ভরসার নাম চিকিৎসক, চ্যালেঞ্জেরও শেষ নেই জাগো নিউজ: পিত্তথলীর পাথর কী কারণে হয় এবং কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: পিত্তথলীতে কোলেস্টেরল বা পিগমেন্ট জমে পাথর তৈরি হয়। বেশি ঝুঁকিতে থাকেন- নারী, অতিরিক্ত ওজনের মানুষ, ৪০ বছরের বেশি বয়সীরা, যারা দ্রুত ওজন কমান, গর্ভবতী নারী। এছাড়া শিশু ও পুরুষদেরও হতে পারে। জাগো নিউজ: এই রোগের সাধারণ লক্ষণগুলো কী কী? অনেক সময় কি লক্ষণ ছাড়াও থাকতে পারে?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: এই রোগের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো পেটের ডান পাশের উপরের অংশে (ডান দিকের বুকের নিচে) ব্যথা। এই ব্যথা সাধারণত হঠাৎ শুরু হয় এবং কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অনেক সময় ব্যথা পিঠে বা ডান কাঁধে ছড়িয়ে পড়ে, যা রোগীদের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এছাড়া তৈলাক্ত বা ভারী খাবার খাওয়ার পর অস্বস্তি বা ব্যথা বেড়ে যাওয়া, পেট ফাঁপা বা হজমে সমস্যা, বুক জ্বালাপোড়া বা গ্যাসের মতো অনুভূতি। কিছু ক্ষেত্রে রোগীরা এই লক্ষণগুলোকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা বদহজম ভেবে অবহেলা করেন, যা পরে জটিলতার কারণ হতে পারে। যদি পাথর থেকে প্রদাহ (ইনফেকশন) বা অন্য জটিলতা তৈরি হয়, তখন লক্ষণগুলো আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। যেমন- তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা, জ্বর ও কাঁপুনি, চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস), গা খুব দুর্বল লাগা- এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে পিত্তথলীর পাথর সম্পূর্ণ লক্ষণবিহীন থাকতে পারে। এটিকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট গলস্টোন’। সাধারণত অন্য কোনো কারণে আল্ট্রাসনোগ্রাম বা পরীক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ করে এই পাথর ধরা পড়ে। এই অবস্থায় রোগী কোনো ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করেন না। তবে এর মানে এই নয় যে এটি সম্পূর্ণ নিরীহ। অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনো সমস্যা না থাকলেও হঠাৎ করেই তীব্র ব্যথা বা জটিলতা শুরু হতে পারে। জাগো নিউজ: কখন অপারেশন করা জরুরি হয়ে পড়ে? অপারেশন না করলে কী ধরনের জটিলতা হতে পারে?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: যখন বারবার ব্যথা হয়, ইনফেকশন হয় বা পাথর থেকে জটিলতা তৈরি হয়, তখন অপারেশন জরুরি হয়ে পড়ে। অপারেশন না করলে পিত্তথলীর প্রদাহ, প্যানক্রিয়াটাইটিস, জন্ডিসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। জাগো নিউজ: বর্তমানে পিত্তথলীর পাথরের অপারেশন কোন পদ্ধতিতে বেশি করা হয়?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: বর্তমানে ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতিতেই অধিকাংশ অপারেশন করা হয়, কারণ এটি নিরাপদ ও রোগীর জন্য আরামদায়ক। জাগো নিউজ: একটি ল্যাপারোস্কপিক অপারেশন করতে সাধারণত কত সময় লাগে?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: সাধারণত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার মধ্যে এই অপারেশন সম্পন্ন করা যায়, তবে রোগীর অবস্থার ওপর সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে। জাগো নিউজ: পিত্তথলীর পাথরের অপারেশনে মোট খরচ সাধারণত কত হতে পারে?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: বাংলাদেশে বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণত ৪০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকার মধ্যে খরচ হতে পারে। তবে সরকারি হাসপাতালে এই খরচ অনেক কম। জাগো নিউজ: এই খরচ কি হাসপাতাল ও রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়? একটু ব্যাখ্যা করবেন?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: অবশ্যই। হাসপাতালের মান, কেবিন বা ওয়ার্ড, অপারেশনের জটিলতা, রোগীর শারীরিক অবস্থা সবকিছুর ওপর খরচ নির্ভর করে। কোনো জটিলতা থাকলে খরচ বাড়তে পারে। জাগো নিউজ: সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে খরচের পার্থক্য কেমন?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: সরকারি হাসপাতালে খরচ কম হলেও অনেক সময় ভিড় ও অপেক্ষার সমস্যা থাকে। বেসরকারি হাসপাতালে দ্রুত সেবা পাওয়া যায়, তবে খরচ তুলনামূলক বেশি। জাগো নিউজ: খরচ কমানোর জন্য রোগীরা কী কী বিষয় মাথায় রাখতে পারেন?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: রোগকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া, জটিল হওয়ার আগেই অপারেশন করা, অভিজ্ঞ সার্জনের পরামর্শ নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এড়িয়ে চলা। জাগো নিউজ: অপারেশনের আগে ও পরে রোগীদের কী কী বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: অপারেশনের আগে সবচেয়ে জরুরি চিকিৎসক ও হাসপাতাল নির্ধারণ করা। যেখানে অপারেশন করা হবে সেখানকার সেবার মান সম্পর্কে আগে সচেতন হওয়া। বর্তমানে বিভিন্ন ক্লিনিক রয়েছে যেখানে অপারেশনের জন্য পর্যাপ্ত ‍সুযোগ-সুবিধা না থাকা সত্বেও অপারেশন করা হচ্ছে, তাই সে বিষয়ে বিশেষভাবে সর্তক হওয়া। একই সঙ্গে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করাও জরুরি। অন্যদিকে অপারেশনের পরে বিশ্রাম, নির্দিষ্ট ডায়েট, নিয়মিত ফলোআপ করা জরুরি। জাগো নিউজ: ‘অপারেশন মানেই বড় ঝুঁকি’ এই ভয় কতটা বাস্তব? রোগীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: অপারেশনে কিছুটা ঝুঁকি থাকবেই। তবে বর্তমানে ‘অপারেশন মানেই বড় ঝুঁকি’ এই ভয় অনেকটাই অমূলক। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ সার্জনের কারণে অপারেশন এখন অনেক নিরাপদ। তাই রোগীদের উচিত ভয় না পেয়ে সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। জাগো নিউজ: একজন সার্জন হিসেবে মানসিক চাপ কীভাবে সামলান?ডা. হালদার কুমার গোলাপ: সার্জনদের কাজে চাপ থাকেই। তবে আমি কাজের চাপ সামলেও চেষ্টা করি নিজের ও পরিবারের জন্য সময় বের করতে। এমনকি আমি সুযোগ পেলেই বই পড়ি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেই, সিনেমা দেখি, সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করি এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করি। জাগো নিউজ: অনেক ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য। সবশেষে যদি আমাদের পাঠকদের জন্য কিছু বলতেন।ডা. হালদার কুমার গোলাপ: আপনাকেও ধন্যবাদ। সবশেষে একটা কথাই বলবো, সার্জারি নিয়ে ভয় বা দ্বিধা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক তথ্য। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে ছোট সমস্যা বড় হয়ে জীবনঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই লক্ষণ অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। জেএস/

Go to News Site