Somoy TV
বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে এক চরম দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন সুনামগঞ্জের বোরো চাষিরা। একদিকে খলায় (মাড়াইয়ের স্থান) রাখা ভেজা ধান শুকাতে না পেরে তা পচে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে হাওড়ের পাকা ধান। খেত বাঁচাবেন নাকি খলার ধান রক্ষা করবেন এমন দিশেহারা পরিস্থিতিতে কৃষকদের অবস্থা এখন ঠিক যেন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’।টানা বৃষ্টির কারণে গত প্রায় দশ দিন ধরে সুনামগঞ্জের হাজার হাজার কৃষক খলায় রাখা ভেজা ধান শুকাতে পারছেন না। আগে কেটে রাখা ধান যেমন বৈরী আবহাওয়ায় মাড়াই-ঝাড়াই করা যাচ্ছে না, তেমনই মাঠে থাকা পাকা ধানও পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। খলায় স্তূপ করে জাঁক দিয়ে রাখা ধানে এরই মধ্যে শেকড় গজাতে শুরু করেছে। বৃষ্টির পানিতে ভিজে ধানের মুঠ পচে খড়কুটোর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ভিজে থাকায় জাঁক দেয়া ধানের স্তূপ থেকে প্রচণ্ড গরমে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এতে চালের স্বাদ, রং ও গন্ধে পরিবর্তন আসায় তা মানুষের খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। পচে যাওয়া ধান হাঁসের খামারিদের কাছে বিক্রি করতে চাইলেও প্রতি মন তিনশো টাকার বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে না। সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের শফিকুল আলম বলেন, ‘অতিবৃষ্টিতে পাকা ধানখেত ডুবে যাচ্ছে। ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিক এনে খেতের ধান কাটাতে হয়। কিন্তু খলার ভেজা ধান শুকাতে না পারায় লম্বা শেকড় গজিয়েছে। জাঁক দেয়া ধানের মুঠ নরম হয়ে নাড়ায় (খড়) পরিণত হওয়ায় অর্ধেক ধানই নাড়ার সঙ্গে চলে যায়।’ একই এলাকার চান মিয়া জানান, ১৫ দিন আগে খেতের পাকা ধান কেটে খলায় জাঁক দিয়ে রাখলেও বৃষ্টির কারণে তা মাড়াই করা যাচ্ছে না। কৃষকরা এমন বিপদে আগে কখনো পড়েননি। আরও পড়ুন: হাওড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৩ মাস সহায়তা দেবে সরকার: কৃষিমন্ত্রী টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সুনামগঞ্জের কাদামাখা মাঠে ধান রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন কৃষকরা। ছবি: সময় সংবাদ হালুয়ারগাঁও গ্রামের মনসির আলী বলেন, ‘বৃষ্টিপাতে খেতের ধান জলাবদ্ধতায় ডুবছে, আর খলার ধানে শেকড় গজিয়েছে। জাঁকের ধান ভিজে গরম হয়ে ধোঁয়া উঠছে এবং পচা দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে। রোদ না ওঠায় খলা ও জাঁকের ধান দুটোই নষ্ট হচ্ছে।’ হবতপুর গ্রামের বাবু মিয়া জানান, বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে তারা বসতঘরের বারান্দা, বেডরুম ও গেস্টরুমের মেঝেতে ধান রেখে ফ্যানের বাতাসে ঠান্ডা রাখছেন। নয়তো এই ধানেও শেকড় গজিয়ে শস্যদানা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। রোববার (৩ মে) দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত টানা রোদ ওঠায় ধান শুকানোর জন্য কৃষকরা কোমর বেঁধে খলায় নেমে পড়েন। জানিগাঁও গ্রামের কৃষক আলম নূর বলেন, ‘রোদ ওঠায় পরিবারের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধ সবাই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা কাজ করেছেন। এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে মাড়াই খলা ভিজলে গোবর-পানি দিয়ে লেপে-পুছে মাটি শুকাতে তিন ঘণ্টা চলে যায়, এরপর ধান বিছিয়ে শুকাতে হয়।’ তবে গোবিন্দপুর গ্রামের আব্দুল মালেক আক্ষেপ করে বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টা রোদ ওঠায় কৃষকরা আশান্বিত হলেও সূর্য ডোবার পর আকাশ মেঘে ছেয়ে যায়। একদিনের রোদে ভেজা ধান শুকিয়ে গোলাজাত করা সম্ভব নয়, এর জন্য অন্তত তিন দিন টানা রোদ প্রয়োজন।’ বাহাদুরপুর গ্রামের মনির উদ্দিনের মতে, ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরি দিয়ে ধান কাটার পর তা শুকাতে না পারলে ক্ষতি দ্বিগুণ হবে। তাই খেত কাটার চেয়ে খলার ধান রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আরও পড়ুন: হাওড়ে এ এক অন্যরকম লড়াই কৃষকের বৃষ্টির কারণে খলায় শুকাতে না পারায় সুনামগঞ্জে ভিজে যাওয়া ধানে শেকড় গজিয়েছে। ছবি: সময় সংবাদ কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বিভিন্ন হাওড়ে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এরপর ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয় অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে টানা চার দিন কৃষকরা হাওড়ে নামতেই পারেননি। জেলায় এবার ১৩৭টি হাওড়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে নিচু অংশে জমির পরিমাণ ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর। রোববার (৩ মে) পর্যন্ত হাওড় ও নন-হাওড় মিলিয়ে ১ লাখ ৩৯ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। তবে ১৫ মার্চ থেকে ৩ মে পর্যন্ত জলাবদ্ধতায় ২২ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে, যাতে লক্ষাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রাথমিক ধারণা, এই জলাবদ্ধতা ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের বাজারদর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, ‘টানা কয়েকদিন রোদ উঠলে ধান কাটা, শুকানো এবং মাড়াই-ঝাড়াই করে গোলাজাত করা সম্ভব হবে। তবে জলাবদ্ধতায় খেতের পাকা ধান তলিয়ে যাওয়া এবং বৃষ্টির কারণে খলার ধান নষ্ট হওয়া কৃষকদের জন্য এক চরম দ্বিমুখী সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।’
Go to News Site