Somoy TV
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান। পরিবর্তনের ঢেউয়ে প্রথমবার এই রাজ্যে ফুটেছে ‘পদ্ম’। স্থানীয় রাজনীতির অতীত ট্রেন্ড বলে, পরিবর্তনের নির্বাচনে শাসক দল ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। এবারও বিশেষ ব্যতিক্রম নয়। খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবে ২শ’র বেশি আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসতে চলেছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু কোন ম্যাজিকে?ধর্মীয় মেরুকরণ অনেকের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বড় জয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ধর্মীয় মেরুকরণ। শুভেন্দু অধিকারীর লাগাতার হিন্দুত্বের প্রচার, অমিত শাহর অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রতিশ্রুতি, সর্বোপরি বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দুদের মধ্যে ‘অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গা’দের ভয় ধরানো। বিজেপির এই প্রচার কৌশল পশ্চিমবঙ্গে একপ্রকার অকল্পনীয় কাজটি করে দেখিয়েছে। এতে হিন্দু ভোট এবং মুসলমান ভোটও বিভক্ত হয়ে গেছে। ভোটের ফল বলছে, অনেক কেন্দ্রে মুসলিম ভোট কিছুটা বিভক্ত হয়েছে, কিন্তু সে তুলনায় হিন্দু ভোটাররা অনেক বেশি একজোট হয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। অন্তত প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তেমনটাই মনে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বিজেপির জয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে অবশ্যই বলতে হয় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কথা। রাজ্যে ১৫ বছর ধরে সরকার চালানোর কারণে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একটা ক্ষোভের জায়গা তৈরি হয়েছিল। রাজ্যে কর্মসংস্থানের সমস্যা, বড় শিল্পের অভাব, নিয়োগ দুর্নীতি, রাস্তাঘাটের খারাপ অবস্থা–এসব শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গেছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে স্থানীয় স্তরের তৃণমূল নেতাদের মধ্যে দাদাগিরির মনোভাব তৈরি হয়েছিল। আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন: নিজ আসনেই কি হারছেন মমতা? সেসব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ জমা হচ্ছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। বিজেপি সেই ক্ষোভকে কাজে লাগাতে নিজেদের উপযুক্ত বিকল্প হিসাবে তুলে ধরেছে। ভুল থেকে শিক্ষা ২০২১ সালের প্রচারে যে ভুলগুলো বিজেপি করেছিল, সেগুলোর একটিও এবার করেনি। আগেরবার প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ, ‘দিদি ও দিদি’ স্লোগান, ভিনরাজ্যের নেতাদের দাপাদাপি– মানুষ এসব ভালোভাবে নেয়নি। বস্তুত ২০২১ সাল পর্যন্ত বিজেপির সভা সমিতিতে মূলত ভিনরাজ্যের নেতাদেরই দাপট দেখা যেত। কৈলাস বিজয়বর্গীয়র মতো ভিনরাজ্যের নেতারা প্রায় নিত্যদিন সংবাদমাধ্যমে মুখ দেখিয়ে বেড়াতেন। তাছাড়া দলের ভেতরে গোষ্ঠীকোন্দল, কামিনিকাঞ্চনের অভিযোগ রীতিমতো জর্জরিত করে রেখেছিল গেরুয়া শিবিরকে। এবার ভোটের অনেক আগে থেকে খোদ অমিত শাহ সেসব নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্রচারে কেন্দ্রীয়ভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ না করে তৃণমূলের প্রশাসনিক ব্যর্থতা তুলে আনা বা স্থানীয় স্তরের ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার মতো কৌশল বিজেপির কাজে লেগেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেভাবে চিরাচারিত ‘বিরোধিতা’র রাজনীতি করার সুযোগই পাননি। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে শত্রু হিসেবে বেছেছেন নির্বাচন কমিশনকে। কিন্তু সেই কৌশল কাজে দেয়নি। আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গে জয় প্রায় নিশ্চিত বিজেপির, বাঙালিবাবু সাজে হাজির মোদি! বিজেপির ‘বাঙালিয়ানা’ ২০২১ থেকে ২০২৬- এই পাঁচ বছর ধরে গেরুয়া শিবির ধীরে ধীরে বহিরাগত তকমা ঝেড়ে ফেলার মরিয়া চেষ্টা করে গেছে। সেই উদ্দেশেই শমীক ভট্টাচার্যের মতো বাঙালি ‘ভদ্রলোক’কে রাজ্য সভাপতি করা। ‘জয় শ্রী রামের’ আগে ‘জয় মা কালী’ স্লোগান তুলে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে ঝালমুড়ি খেয়েছেন, গঙ্গায় হাওয়া খেয়েছেন। বিজেপি প্রার্থীরা মাছ হাতে প্রচারে বেরিয়েছেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারাও রাজ্যে এসে মাছ-ভাত খেয়েছেন। উদ্দেশ্য একটাই, বহিরাগত তকমা ঝেড়ে বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে নিজেদের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা। সেটা তারা সফলভাবে করতে পেরেছে। গেরুয়া শিবির এতদিন তৃণমূলের ভাতা’র রাজনীতি নিয়ে কটাক্ষ করত। কিন্তু এবার ভাতা দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে অন্তত বিজেপি তৃণমূলকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। সেটারও প্রভাব পড়েছে ভোটে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা বিজেপি স্বীকার করুক না করুক, গেরুয়া শিবিরের এই জয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। এসআইআর-এর জেরে যে লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার বাতিল হলো, যেভাবে ভোটের ঠিক আগে আগে তৃণমূলের ভোট মেশিনারি কার্যত বিধ্বস্ত করে দেয়া হলো, সেগুলো আখেরে সুবিধা দিয়েছে বিজেপিকে। অন্তত তৃণমূলের তেমনই অভিযোগ। রাজ্যের শাসকদল বলছে, সেই দু’দফা নির্বাচন থেকে শুরু করে ভোটগণনা পর্যন্ত, সর্বস্তরে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। বিজেপি অবশ্য কমিশনের নিরপেক্ষতাকে ধন্য ধন্য করছে। আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে, জনশক্তির জয় হয়েছে: মোদি তাছাড়া এসবের বাইরে যে ফ্যাক্টরকে উপেক্ষা করা যায় না, সেটা হলো পরিবর্তনের হাওয়া। গোটা রাজ্যে পরিবর্তনের চোরাস্রোত তৈরি হয়েছিল। তথাকথিত ফ্লোটিং ভোটার, তৃণমূলের দাপটে অতিষ্ঠ নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা সেই চোরাস্রতে গা ভাসিয়েছেন। যার অবধারিত ফল বঙ্গে গেরুয়া শিবিরের এই জয়।
Go to News Site