Jagonews24
মির্জা ফারিহা ইয়াসমিন স্নেহা কথায় আছে, ‘একটি শিশুকে সুশিক্ষা দেওয়া মানে একটি শক্তিশালী জাতি গড়ে তোলা।’ কারণ আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তারাই একদিন দেশকে নেতৃত্ব দেবে এবং দেশকে নিয়ে যাবে উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়ায়। কিন্তু বর্তমানে নানা কারণে অনেক শিশুকে শৈশবের সুন্দর জীবন উপভোগ করা বাদ দিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়। তাদের কাজ করতে হয় অনেক ভয়াবহ ও বিপজ্জনক জায়গায়; যেমন কল-কারখানা, পাথর ভাঙা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বাসাবাড়ি, গ্যারেজ কিংবা কৃষিক্ষেত্রে বেতনভুক্ত বা অবৈতনিক শ্রমিক হিসেবে। এমনই একজন এতিম পথশিশু রায়হান। তার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। সে রেলস্টেশনে পানি বিক্রি করে এবং সেখানেই রাত যাপন করে। অধিকাংশ সময় তাকে না খেয়েই থাকতে হয়। শিহাব নামে আট বছর বয়সী আরেকটি শিশু আছে। তার বাবা তাদের ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। তার বাসায় অসুস্থ মা ও ছোট বোন রয়েছে। সংসার চালানোর জন্য সে নিয়মিত রিকশা চালায়। কিন্তু এত অল্প বয়সে রিকশা চালানোর কারণে সে দুইবার সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। তাছাড়া অনেক মেয়ে শিশুও শিশুশ্রমের শিকার হয়। রহিমা খাতুন একজন মা-হারা শিশু। তার সৎ মা তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। সে মানুষের বাড়িতে কাজ করে এবং সেখানেও বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। উল্লিখিত সব ঘটনাই শিশুশ্রমের অন্তর্ভুক্ত। এখন প্রশ্ন হলো শিশুশ্রম কী? শিশুশ্রম বলতে বোঝায় এমন কাজ, যা শিশুদের শৈশব, সম্ভাবনা ও মর্যাদা কেড়ে নেয় এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। সাধারণত ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো, যা তাদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়া বাধাগ্রস্ত করে বা বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করে, তাকে শিশুশ্রম বলা হয়। এটি সাধারণত দারিদ্র্য ও পারিবারিক চাপের কারণে ঘটে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর মতে, যে কাজ শিশুদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকর এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, তাই শিশুশ্রম। আইন অনুযায়ী, সাধারণত ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের দিয়ে কাজ করানো শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে ১২-১৪ বছর বয়সীদের হালকা কাজ এবং ১৫-১৭ বছর বয়সীদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগও এর আওতাভুক্ত। শিশুশ্রমের মূল কারণ হলো দারিদ্র্য, অসচেতনতা, বাবা-মায়ের কর্মসংস্থানের অভাব এবং সস্তা শ্রমের চাহিদা। এটি শিশুদের স্বাস্থ্য নষ্ট করে, শিক্ষার সুযোগ কেড়ে নেয় এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। শিশুশ্রম বন্ধে প্রধান আন্তর্জাতিক আইনগুলো আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃক প্রণীত হয়েছে, যা শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আইএলও কনভেনশন ১৩৮ (কাজের ন্যূনতম বয়স, সাধারণত ১৫ বছর) এবং কনভেনশন ১৮২ (শিশুশ্রমের নিকৃষ্ট রূপ, যেমন-দাসত্ব, পাচার বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, যা ১৮ বছরের নিচে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)। এছাড়াও, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের (ইউএনসিআরসি) অনুচ্ছেদ ৩২-এ শিশুদের অর্থনৈতিক শোষণ থেকে সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে শিশুশ্রম সংক্রান্ত আইন মূলত বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩ ও ২০১৮) দ্বারা পরিচালিত হয়। আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনো ধরনের কাজে নিয়োগ করা নিষিদ্ধ। ১২-১৪ বছর বয়সীরা হালকা কাজ করতে পারলেও তা যেন তাদের শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ১৮ বছরের কম বয়সী কারো নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শিশুশ্রম বন্ধে দারিদ্র্য নিরসন, বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (যেমন-ভাতা ও রেশন ব্যবস্থা) জোরদার করতে হবে, যাতে তারা শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য না হয়। সব শিশুর জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির প্রসার ঘটাতে হবে। পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুশ্রমের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপগুলো হলো-দাসত্ব, পাচার, যৌন শোষণ, মাদক উৎপাদন বা বিপজ্জনক মেশিনে কাজ। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এটি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে। এ ধরনের কোনো ঘটনা দেখলে বা শিশুশ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য ১০৯৮ নম্বরে কল করে জানাতে হবে। শিশুশ্রমের কুফল সম্পর্কে সমাজ ও পরিবারকে সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগ না দিতে মালিকদের উৎসাহিত করতে হবে। তাহলেই আমাদের সমাজ থেকে শিশুশ্রম নামক অভিশাপ দূর করা সম্ভব হবে। লেখক: শিক্ষার্থী মার্কেটিং বিভাগ, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী। আরও পড়ুনসদরঘাট: যেখানে প্রতিদিন গড়ে ওঠে হাজারো জীবিকার গল্পশ্রমিকদের ভাগ্য কি বদলাচ্ছে? কেএসকে
Go to News Site