Jagonews24
খাতা মূল্যায়নে শুরুতেই হোঁচট, ফল প্রকাশে দেরির শঙ্কা ২৩৫ পরীক্ষককে জরুরি নোটিশ, তবু খাতা নিতে অনীহা খাতা মূল্যায়নে ভুল পরীক্ষক নিয়োগ, দায় নিচ্ছে না বোর্ড শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের শাস্তির আওতায় আনার পরামর্শ রাজধানীর উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাথমিক স্তরের সহকারী শিক্ষক রীনা পারভীন। তিনি কখনো শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া কোনো পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেননি। কিন্তু এবারের এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন তালিকায় পরীক্ষক হিসেবে তার নাম এসেছে। এমনকি তার জন্য বরাদ্দ বাংলা প্রথমপত্রের ৩০০ খাতা বোর্ড থেকে নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহণ না করায় জারি করা হয়েছে নোটিশও। অথচ রীনা পারভীন এসবের কিছুই জানেন না! বিষয়টি নিয়ে জানতে মঙ্গলবার (৫ মে) রাতে যোগাযোগ করা হলে ‘যেন আকাশ থেকে পড়েন’ সহকারী শিক্ষক রীনা পারভীন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি কোনো দিন তো এসএসসির খাতাই দেখিনি, দেখতেও চাইনি। কে বা কারা আমার নাম দিয়েছেন, তাও জানি না। আমি তো প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক, এসএসসির খাতা দেখবো কীভাবে?’ শুধু রীনা পারভীন নন, আরও অন্তত ১০ জন এমন পরীক্ষকের খোঁজ মিলেছে। তাদের সঙ্গে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে কেউ জানান, তিনি খাতা দেখার জন্য আবেদনই করেননি। আবার কারও ভাষ্য, ‘তিনি কখনো এসএসসির খাতা দেখেননি, দেখতেও আগ্রহ প্রকাশ করেননি।’ পরীক্ষক হিসেবে নিজের নিয়োগ সম্পর্কে না জানা শিক্ষকদের এমন বক্তব্যের পর ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কীভাবে পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ এ কাজে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা কতটা অবহেলা করেন; তা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। একই সঙ্গে খাতা মূল্যায়নে এমন হ-য-ব-র-ল অবস্থায় নির্দিষ্ট সময়ে মূল্যায়ন শেষে এসএসসির ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। যদিও বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, পরীক্ষক নিয়োগে এমন ভুলের পেছনে তাদের কোনো দায় নেই। পাশাপাশি যারা খাতা নিচ্ছেন না, তাদের জন্য বরাদ্দ খাতাগুলো মূল্যায়নে দ্রুত নতুন পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। শিক্ষকদের উত্তরপত্র গ্রহণ সংক্রান্ত নোটিশ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২১ এপ্রিল এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়। এতে অংশ নিচ্ছেন প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ পরীক্ষার্থী। প্রথমদিনে বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ খাতা সংগ্রহের পর ৩০ এপ্রিলের মধ্যে তা মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৪ মে পর্যন্ত সময়ে ২৩৫ জন পরীক্ষক খাতা গ্রহণ করেননি। এতে খাতা মূল্যায়নে বিলম্ব ও জটিলতার আশঙ্কা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বোর্ড থেকে অতীব জরুরি নোটিশ জারি করা হয়। ওই নোটিশের সঙ্গে ২৩৫ জন পরীক্ষকের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়। বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, এসএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথমপত্রের উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য ই-টিআইএফভুক্ত শিক্ষকদের পরীক্ষক হিসেবে বোর্ড থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। উত্তরপত্র গ্রহণ করার জন্য বোর্ড থেকে তাদের মোবাইলে এসএমএস দেওয়া হলেও উল্লিখিত পরীক্ষকরা অনুপস্থিত রয়েছেন। ফলে উত্তরপত্র মূল্যায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আরও পড়ুনএসএসসির খাতা নিতে পরীক্ষকদের অনীহা, ঢাকা বোর্ডের কঠোর নির্দেশনাটেলিগ্রামে এসএসসি প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা, আটক ২রাস্তায় পাওয়া গেলো এসএসসি পরীক্ষার ২৬৮টি খাতা এতে আরও বলা হয়, পরীক্ষকদের ৫ মে বেলা ১১টার মধ্যে বোর্ডে উপস্থিত হয়ে উত্তরপত্র গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসএসসি পরীক্ষা শুরুর পর প্রথম লটে বাংলা প্রথমপত্র খাতা মূল্যায়নের জন্য বিতরণ শুরু করেছে বোর্ডগুলো। তাতে শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। বাংলা প্রথমপত্রের মোট তিন লাখের মতো খাতার মধ্যে প্রায় এক লাখই পড়ে আছে। এসব খাতা নির্ধারিত সময়ে মূল্যায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে খাতা নিতে অনীহা দেখানো শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করে হিতে-বিপরীত হয় বোর্ডের। দেখা যায়, অসংখ্য পরীক্ষককে নোটিশ পাঠানো হয়নি। মোবাইলে মেসেজও দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক, অসুস্থ শিক্ষক, খাতা মূল্যায়নে আগ্রহী নন- এমন শিক্ষকদেরও পরীক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বোর্ড। রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষকের নাম রয়েছে তালিকায়। ওই শিক্ষিকার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি তিন বছর ধরে ব্রেস্ট ক্যানসারে ভুগছি। নানা রকম শারীরিক জটিলতায় রয়েছি। গত বছরও আমি এসএসসির কোনো খাতা দেখিনি। এবার আমি খাতা দেখার জন্য আবেদনও করিনি। আমার নাম কেন তালিকায় দিয়েছে, তা বলতে পারবো না। তবে আমি খাতা দেখবো না।’ কিশোরগঞ্জের আরেক শিক্ষক তার নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ করে বলেন, ‘আমি পারিবারিক ঝামেলার মধ্যে রয়েছি। চার বছর ধরে এসএসসির খাতা দেখি না। এবারও আবেদন করিনি। খাতা মূল্যায়ন করা ঝামেলার কাজ। মাথায় অশান্তি নিয়ে খাতা দেখা উচিত নয়। এজন্য আমি খাতা দেখতে অনাগ্রহ জানিয়েছি। তারপরও কেন নাম এলো বুঝতে পারছি না।’ কীভাবে পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় শিক্ষকদের অনীহা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, আবার প্রাপ্যতা নেই এমন শিক্ষকরাও নিয়োগ পেয়েছেন। কেন তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, জানতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি খাতা দেই। পরীক্ষক নিয়োগের কাজটি করেন আরেকজন উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। বিষয়টি নিয়ে আমি বলতে পারবো না।’ খাতা নিতে অনীহা দেখানো শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করে হিতে-বিপরীত হয় বোর্ডের। দেখা যায়, অসংখ্য পরীক্ষককে নোটিশ পাঠানো হয়নি। মোবাইলে মেসেজও দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক, অসুস্থ শিক্ষক, খাতা মূল্যায়নে আগ্রহী নন- এমন শিক্ষকদেরও পরীক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বোর্ড। পরে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (গোপনীয় শাখা) নুরুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা নিয়োগ করি এটা ঠিক। কিন্তু সেটা কাউকে জোর করে দেওয়া হয় না। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কাছে আমরা চিঠি দেই। তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের কোন কোন শিক্ষক খাতা দেখতে আগ্রহী, তার তালিকা পাঠান। আমরা সেখান থেকে পরীক্ষক নিয়োগ দেই। যদি অনাগ্রহী, অসুস্থ ও অপারগতা প্রকাশ করা শিক্ষককে পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাতে বোর্ডের কোনো দায় নেই। দায় স্কুল-কলেজের প্রধান শিক্ষক এবং অধ্যক্ষদের।’ একজন পরীক্ষক কত খাতা পান ঢাকা বোর্ড সূত্র জানায়, একজন পরীক্ষককে ৩০০টি করে খাতা দেওয়া হয়। তবে প্রধান পরীক্ষকদের ৪০০-৫০০ খাতা দেওয়া হয়। এ খাতা মূল্যায়নে সাধারণত ১২-১৫ দিন সময় দেওয়া হয়। কিন্তু বোর্ড থেকে খাতা গ্রহণ ও তা পাঠানোর কাজে দুই থেকে চার কর্মদিবস লেগে যায়। প্রকৃতপক্ষে ৭ দিন সময় পান শিক্ষকরা। প্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষাসহ অন্যান্য কাজ করেও দিনে ৫০-৬০টি খাতা মূল্যায়ন করতে হয় শিক্ষকদের। খাতাপ্রতি শিক্ষকরা পান ৩৫ টাকা। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের এসএসসির উত্তরপত্র টাঙ্গাইলের একজন পরীক্ষক জাগো নিউজকে বলেন, ‘বোর্ড থেকে খাতা গ্রহণ ও বোর্ডে মূল্যায়নের পর খাতা পাঠানো বিরাট ঝামেলার কাজ। এ কাজটা করে খাতাপ্রতি নামমাত্র কিছু টাকা পাওয়া যায়। এ খাতা দেখার টাকা পেতেও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।’ খাতা নিতে অনীহা, ফল প্রকাশে বিলম্বের শঙ্কা এসএসসি পরীক্ষা শুরুর পর প্রথম লটে বাংলা প্রথমপত্র খাতা মূল্যায়নের জন্য বিতরণ শুরু করেছে বোর্ডগুলো। তাতে শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। বাংলা প্রথমপত্রের মোট তিন লাখের মতো খাতার মধ্যে প্রায় এক লাখই পড়ে আছে। এসব খাতা নির্ধারিত সময়ে মূল্যায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আরও পড়ুনহাঁটু পানিতে এসএসসি পরীক্ষা, চেয়ারে পা তুলে বসে শিক্ষকফেসবুকে ইনস্ট্যান্ট কফির মতো ইনস্ট্যান্ট গুজব বেরোচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রীভুল প্রশ্নে এসএসসি পরীক্ষা, ৬ শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি বোর্ড সূত্র জানায়, পাবলিক পরীক্ষা আইন অনুযায়ী—লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিন থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ করতে হবে। তবে এবার শিক্ষামন্ত্রী সেশনজট কমানোর জন্য দেড় মাসের মধ্যে ফল প্রকাশের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে জুনের মধ্যেই ফল প্রকাশ করা হবে। জরুরি নোটিশ জারির পর অনেকে এসে খাতা নিয়ে গেছেন। ১০০-১৫০ জনের মতো বাকি আছে। তারা যদি না আসেন, খাতা না নেন; তাহলে আমরা নতুন পরীক্ষক নিয়োগ দেবো। তারা খাতা দেখবেন। যথাসময়ে ফল প্রকাশে সমস্যা হবে না।- নুরুল হক উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড খাতা মূল্যায়ন এবং আনুষঙ্গিক কাজ শেষে সফটওয়্যারে ইনপুট দেওয়া সময়সাপেক্ষ। এ কারণে খাতা দেখার কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি। কিন্তু অসংখ্য পরীক্ষক খাতা গ্রহণ না করায় এ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হতে পারে। সেক্ষেত্রে পিছিয়ে যেতে পারে ফল প্রকাশের সময়ও। ঢাকা বোর্ডের সাবেক একজন চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ কাজটি বেশ দুরূহ। শিক্ষকরা খাতা নিতে চান না। এ কাজে আয় কম, ঝামেলা এবং ঝুঁকি বেশি হিসেবে দেখেন তারা। এজন্য সরকারের উচিত খাতা মূল্যায়নের ফি আরও বাড়ানো।’ তিনি বলেন, ‘বাংলা প্রথমপত্রে যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে, আরও ৮-১০টা সাবজেক্টের খাতা তো বাকি। সেগুলোতেও এমন অনীহা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে জটিলতা বাড়তে পারে। এসব শিক্ষকের সঙ্গে বোর্ডের পক্ষ থেকে দ্রুত যোগাযোগ করা এবং ভুল পরীক্ষক দেওয়া হেড মাস্টার বা প্রিন্সিপালদের শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। তা না হলে এ সংকট দূর হবে না।’ যা বলছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড বিষয়টি নিয়ে জানতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার এবং চেয়ারম্যান খন্দোকার এহসানুল কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। অবশ্য উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নুরুল হক দাবি করেছেন, ফল প্রকাশে কোনো বিলম্ব হবে না। তার ভাষ্য, ‘জরুরি নোটিশ জারির পর অনেকে এসে খাতা নিয়ে গেছেন। ১০০-১৫০ জনের মতো বাকি আছে। তারা যদি না আসেন, খাতা না নেন; তাহলে আমরা নতুন পরীক্ষক নিয়োগ দেবো। তারা খাতা দেখবেন। যথাসময়ে ফল প্রকাশে সমস্যা হবে না।’ এএএইচ/ইএ
Go to News Site