Jagonews24
প্রিয়জন হারানো মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর মানসিক আঘাতগুলোর একটি। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, স্ত্রী বা খুব কাছের কাউকে হারানোর পর কোনো কোনো স্বামী বাইরে থেকে খুবই ঠান্ডা বা আবেগহীন প্রতিক্রিয়া দেখান। কেউ কেউ ভাবেন, তিনি হয়তো ভালোবাসতেন না, বা অনুভূতিহীন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি এতটা সরল নয়। বরং এটি একাধিক জটিল মানসিক প্রতিক্রিয়ার ফল। শোকের প্রথম ধাপ হলো অস্বীকার ও মানসিক শক প্রিয়জনের মৃত্যুর পর মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সময় বাস্তবতাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করতে পারে না। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ডিনায়াল স্টেজ’ বা অস্বীকারের ধাপ। স্বামী তখন মানসিকভাবে এমন এক শকে থাকেন যে, তার অনুভূতি কাজ করা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে থেকে তাকে শান্ত বা নির্বিকার মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তিনি বাস্তবতাকে গ্রহণ করার লড়াইয়ে থাকেন। এই পর্যায়ে আবেগ প্রকাশ না হওয়া স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। আবেগ দমন করার সামাজিক শিক্ষা অনেক পুরুষ ছোটবেলা থেকেই শিখে বড় হন যে ‘পুরুষরা কাঁদে না’ বা ‘দুর্বলতা দেখানো ঠিক নয়।’এই সামাজিক কাঠামো তাদের আবেগ প্রকাশে বাধা তৈরি করে। ফলে স্ত্রী বা প্রিয়জন হারানোর মতো গভীর শোকের সময়েও তারা নিজেদের অনুভূতি চেপে রাখেন। এটি কোনো অনুভূতির অভাব নয়, বরং শেখানো আচরণের ফল। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’ বা আবেগ দমন। শোকের ব্যক্তিগত প্রক্রিয়া প্রত্যেক মানুষ শোক প্রকাশ করে আলাদা উপায়ে। কেউ কাঁদে, কেউ চুপ থাকে, কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আবার কেউ একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। যাদের প্রতিক্রিয়া ঠান্ডা মনে হয়, তারা অনেক সময় ‘ইনট্রোভার্ট গ্রিভিং স্টাইল’ অনুসরণ করেন। তারা আবেগ প্রকাশ না করে ভেতরে ভেতরে শোক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এটি এক ধরনের ব্যক্তিগত কোপিং মেকানিজম। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সচেতন বা অচেতন প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। মানসিক বিচ্ছিন্নতা বা ডিসোসিয়েশন গভীর শোকের সময় মস্তিষ্ক নিজেকে রক্ষা করার জন্য বাস্তবতা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, যাকে বলা হয় ‘ডিসোসিয়েশন।’ এই অবস্থায় ব্যক্তি আবেগহীন বা যান্ত্রিক আচরণ করতে পারেন। স্ত্রী বা প্রিয়জন হারানোর পর কেউ কেউ যেন স্বাভাবিক কাজ করে যান, কথা বলেন বা সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু আবেগগতভাবে সংযুক্ত থাকেন না। এটি মানসিক ট্রমার একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। দীর্ঘ সম্পর্কের শূন্যতা ধীরে ধীরে ধরা পড়ে অনেক সময় শোক একসঙ্গে আসে না। প্রথমে শূন্যতা বা শক থাকে, পরে ধীরে ধীরে বাস্তবতা বুঝতে শুরু হয়। তখনই গভীর দুঃখ, একাকীত্ব এবং বিষণ্নতা প্রকাশ পায়। তাই শুরুতে নির্বিকার মনে হওয়া মানে এই নয় যে ব্যক্তি দুঃখ অনুভব করছেন না বরং দুঃখটি পরে আরও গভীরভাবে প্রকাশ পেতে পারে। পুরুষদের শোক প্রকাশের ভিন্ন ধরণ গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষরা সাধারণত শোক প্রকাশে কম শব্দ ব্যবহার করেন এবং বেশি ‘অ্যাকশন-অরিয়েন্টেড’ আচরণ দেখান। যেমন: কাজে ডুবে যাওয়া, একা থাকা বা দৈনন্দিন রুটিন ধরে রাখা। এটি তাদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার একটি উপায়। স্ত্রী বা প্রিয়জন হারানোর পর স্বামীর ঠান্ডা বা নির্বিকার আচরণকে শুধু অনুভূতির অভাব হিসেবে দেখা ঠিক নয়। প্রতিটি মানুষের শোক প্রকাশের ধরন আলাদা। কেউ চোখের জল দিয়ে, কেউ নীরবতায়, আবার কেউ আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে তার ভেতরের কষ্ট প্রকাশ করেন। তাই এমন পরিস্থিতিতে বিচার না করে বোঝার চেষ্টা করাই সবচেয়ে মানবিক প্রতিক্রিয়া। সূত্র: মিডিয়াম,সাইকোলজি টুডে, আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন আরও পড়ুন: হার্টের রোগীরা দ্রুত সুস্থ হন সঙ্গীর ভালোবাসায় সঙ্গীর সঙ্গে গসিপ করার উপকারও আছে এসএকেওয়াই
Go to News Site