Collector
ইরান যুদ্ধ কি শেষ? | Collector
ইরান যুদ্ধ কি শেষ?
Somoy TV

ইরান যুদ্ধ কি শেষ?

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ইতি টেনেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার (৫ মে) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ হয়েছে, কারণ এর সব লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। ওয়াশিংটন এখন ‘শান্তির পথে যাবে’।একইদিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে নিরাপদে পার করার জন্য মার্কিন সামরিক অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করা হয়েছে। যা গত সোমবার (৪ মে) শুরু হয়েছিল। তবে আজ বুধবার (৬ মে) রুবিওর সুনির্দিষ্ট অবস্থানের আপাত বিরোধিতা করে ট্রাম্প এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন যে, ইরান যদি ‘চুক্তি অনুযায়ী সবকিছু দিতে রাজি হয়’, তাহলে এই মহা তাণ্ডবের ‘অবসান ঘটবে’। অন্যথায় বোমাবর্ষণ শুরু হবে এবং দুঃখজনকভাবে তা আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রা ও তীব্রতায় হবে।’ প্রশ্ন হলো, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ কি শেষ? যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত পরিবর্তনশীল বক্তব্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ এখানে তুলে ধরা হলো- অপারেশন এপিক ফিউরি নিয়ে রুবিও যা বলেছেন মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে রুবিও সাংবাদিকদের জানান যে, অপারেশন এপিক ফিউরি শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি সমাপ্ত হয়েছে। আমরা এই অভিযানের উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করেছি।’ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনার ব্যবস্থা করার জন্য পাকিস্তানের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না যে নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক। আমরা শান্তির পথই বেছে নেব। প্রেসিডেন্ট যেটা চান, সেটা হলো একটি চুক্তি।’ গত মাসের শুরুর দিকে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর পাকিস্তানের ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তা কার্যত কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয়। এরপর দ্বিতীয় দফার বৈঠকের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও ইরান তাতে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও পরোক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেয়ছে। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি উভয় পক্ষই একে অপরকে নতুন প্রস্তাব পাঠায়। আরও পড়ুন: রয়টার্সের প্রতিবেদন / যুদ্ধ শেষ করতে সমঝোতার খুব কাছাকাছি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো বুরচু ওজচেলিক আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে বারবার শুরু ও বন্ধ হওয়া আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালী থেকে জাহাজগুলোকে বের করে আনার জন্য ‘অপারেশন ফ্রিডম’ নিয়ে ট্রাম্পের আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন উপসাগরীয় অঞ্চলে এক অনাকাঙ্ক্ষিত উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে।’ ‘এটা পারমাণবিক ইস্যুতে তেহরানের কাছ থেকে গভীর ছাড় আদায়ের লক্ষ্যে পরিচালিত অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ কূটনৈতিক গোপন যোগাযোগের প্রতিফলনও বটে। এই ছাড়গুলো পূর্বের শর্তগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে রাজি করাবে, যার ফলে কার্যকরভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটবে।’ ওজচেলিক আরও বলেছেন, অন্যদিকে ইরান এই নিশ্চয়তা চায় যে, কেবল যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধের পুরো অবসান হতে হবে। প্রজেক্ট ফ্রিডম নিয়ে ট্রাম্প যা বলেছেন গত মঙ্গলবারই ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন যে, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের ‘অনুরোধের ভিত্তিতে’ এবং ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ‘একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তির দিকে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হওয়ায়’ প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত করা হয়েছে। প্রজেক্ট ফ্রিডমকে ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতি একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। শান্তিকালীন সময়ে এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান কার্যত প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে রেখেছে। এরপর ইসলামাবাদ শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে, যা প্রণালীটিকে ঘিরে অচলাবস্থাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এতেও খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে চলতি সপ্তাহে প্রজেক্ট ফ্রিডম শুরুর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এই ঘোষণার পর ইরান জানায়, তাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অনুমতি ছাড়া প্রণালীটি ব্যবহার করার চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজের ওপর গুলি চালানো হবে। তেহরানের এই হুমকি ফের যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কাকে উস্কে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কথার লড়াই শুরু হয় এবং এরপর সোমবার হামলা নিয়ে একে অপরের দাবি ও পাল্টা দাবি চলতে থাকে। আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত, এক পৃষ্ঠার স্মারকে কী কী আছে? প্রথমে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি দাবি করে যে, হরমুজ প্রণালী থেকে ফিরে যাওয়ার আদেশ অমান্য করায় তারা একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড মার্কিন জাহাজে হামলার কথা অস্বীকার করে এবং এর পরিবর্তে আইআরজিসির অন্তত ছয়টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়ার দাবি করে। ইরান তা অস্বীকার করে। এরপর তেহরান একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের দাবিকৃত নিয়ন্ত্রণ এলাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমা পর্যন্ত প্রসারিত করা হয়, যা একটি নতুন আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে। ওইদিনই সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তারা জানায়, তাদের ফুজাইরাহ বন্দরে শিল্প এলাকায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে একটি তেল শোধনাগারে আগুন লেগেছে। ফুজাইরাহ বন্দরে একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন অবস্থিত। এরপর মঙ্গলবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ করে দিতে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন সামরিক অভিযানটি স্থগিত করা হয়েছে। তিনি তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লেখেন, ‘আমরা পারস্পরিকভাবে সম্মত হয়েছি যে, [মার্কিন] অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে ও কার্যকর থাকলেও ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ (হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল) স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হবে, যাতে চুক্তিটি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরিত হতে পারে কি না তা দেখা যায়।’ আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের নতুন বার্তা ইরান তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এদিকে ট্রাম্পের এই বক্তব্য নিয়ে শুরু হয় চুলচেরা বিশ্লেষণ। অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশীয় রাজনীতির অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ আল জাজিরাকে বলেছেন যে, ট্রাম্প ঠিক কী কারণে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করেছেন তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন হলেও যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধবিরোধী জনমতের প্রেক্ষাপটে এই স্থগিতাদেশ এসেছে। আকবরজাদেহ বলেন, ‘একই সাথে ট্রাম্প হয়তো এই যুদ্ধ নিয়ে ধৈর্য হারাচ্ছেন; তিনি একদিকে বলছেন যে এই অবস্থা দীর্ঘায়িত করার জন্য তার হাতে সময় আছে। কিন্তু বাস্তবে ট্রাম্পের মনোযোগ বেশিক্ষণ থাকে না এবং তার এখন দ্রুত একটা জয় নিশ্চিত করা দরকার। প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত করলে কূটনীতি গতি পাবে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এমন একটি চুক্তির কাছাকাছি নিয়ে আসবে, যেটাকে ট্রাম্প একটি জয় হিসেবে আখ্যা দেবেন।’ ইরান যুদ্ধ কি এখানেই শেষ? ঠিক তা নয়। আকবরজাদেহ বলছেন, প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত করা ‘যুদ্ধের সমাপ্তির সূচনা’ করতে পারে। তার কথায়, ‘আমরা জানি যে ইরানিরা এর অবসানের জন্য মরিয়া, তাই ট্রাম্প যদি কূটনীতির জন্য সবুজ সংকেত দেন, তাহলে তাদের দিক থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর ফের হামলা শুরু করার সম্ভাবনা খুবই কম।’ আকবরজাদেহ আরও বলেন, ‘তবে সমস্যা হলো, আমরা আগেও এই পরিস্থিতিতে পড়েছি। আগের সুযোগগুলো নষ্ট হয়েছিল কারণ ইসরাইল জোরাজুরি করছিল এই বলে যে, যুক্তরাষ্ট্র আরও ভালো চুক্তি পেতে পারে, অথবা ট্রাম্প পরিস্থিতি ভুল বুঝেছিলেন এবং আশা করেছিলেন যে সামরিক পদক্ষেপই তাকে আরও বেশি লাভবান করবে।‘ এরপর কী ঘটবে? আকবরজাদেহ বলছেন, তার পূর্বাভাস দেয়া কঠিন, কিন্তু কোনো পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরতে চায় বলে মনে হচ্ছে না, তাই উভয় পক্ষই সম্ভবত একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথকে অগ্রাধিকার দেবে। এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘কোনো পক্ষই পরাজিত হিসেবে পরিচিত হতে চায় না। তারা মনে করছে যে নিজ নিজ দেশের জনগণের কাছে তাদের ভাবমূর্তি রক্ষা করা প্রয়োজন। এটাই আলোচনা এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পথকে জটিল করে তুলছে।’ তিনি বলেন, এরপর কী ঘটবে তা ‘পারমাণবিক বিষয়ে তেহরানের বিভক্ত নেতৃত্ব কী প্রতিশ্রুতি দেয় তার ওপর নির্ভর করবে’। তার কথায়, ‘যদিও তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে, এই ধরনের ভঙ্গি প্রদর্শনের লক্ষ্য হলো অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থি এবং ইরানি জাতীয়তাবাদীদের শান্ত করা, যারা মার্কিন-ইসরাইল হামলায় বিচলিত এবং পারমাণবিক বিষয়গুলোকে একটি জাতীয়তাবাদী, সার্বভৌম অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে।’ আরও পড়ুন: যুদ্ধে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান, ইরানের ‘নিশানায়’ আরব আমিরাত এই বিশ্লেষকের পূর্বাভাষ, হরমুজ প্রণালী অবরোধ করার জন্য জাতিসংঘ শিগগিরই ইরানের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক নিন্দা জ্ঞাপন করতে পারে। ‘কিন্তু আসল চাপ, যা দিন দিন বাড়ছে, তা হলো অর্থনৈতিক চাপ – প্রণালীটি বন্ধ করে দেয়ায় ইরানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে,’ বলেন তিনি। ‘সহনশীলতা ও টিকে থাকার বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও ইরানের অবশিষ্ট নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে যুদ্ধের ব্যয়ভার নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নতুন করে সামরিক হামলার সম্ভাবনা এবং এর অনিবার্য অস্থিতিশীল প্রভাব হয়তো শেষ পর্যন্ত তেহরানকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে,’ উপসংহার টানেন এই বিশ্লেষক।

Go to News Site