Collector
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মে ফুলের সমাহার | Collector
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মে ফুলের সমাহার
Jagonews24

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মে ফুলের সমাহার

ইসরাত আলম তন্বী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যজগৎ প্রকৃতির রঙে রঙিন, গন্ধে ভরপুর এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের ভুবন। তাঁর কবিতা, গান, গল্প কিংবা উপন্যাস—সবকিছুর গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় প্রকৃতি সেখানে প্রকাশিত পটভূমি নয় বরং এক জীবন্ত চরিত্র। এই প্রকৃতির মধ্যেও ফুল তাঁর কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ফুলের রং, গন্ধ, রূপ ও ঋতুভিত্তিক আবির্ভাব রবীন্দ্রনাথের কাব্যিক অনুভূতিকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। শুধু তা-ই নয়, তিনি অনেক অপরিচিত বা বিদেশি ফুলকে নিজের কল্পনা ও ভাষার সৌন্দর্যে নতুন নাম দিয়েছেন, যা বাংলা সাহিত্যে যাপিত জীবনের এক অভিনব সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়। শৈশব থেকেই রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রীতির সূচনা। ‘জীবনস্মৃতি’তে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন কীভাবে ছোটবেলায় আতার বিচি পুঁতে জল দিতেন কিংবা কৃত্রিম পাহাড় বানিয়ে সেখানে গাছ লাগাতেন। এই সহজ অথচ গভীর অনুভূতির মধ্য দিয়েই তাঁর মধ্যে গড়ে ওঠে উদ্ভিদ ও ফুলের প্রতি এক নিবিড় মমত্ববোধ। পরবর্তীকালে এই ভালোবাসা তাঁর সাহিত্যজীবনে পূর্ণতা পায়। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ফুল স্বাতন্ত্র্য অলংকার নয় বরং ভাব ও অনুভূতির প্রতীক। ‘গীতাঞ্জলি’তে তিনি ফুলকে আত্মসমর্পণ, ভক্তি ও সৌন্দর্যের উদ্দীপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন—‘ফুলের মতন আপনি ফুটাও গান’ পঙ্‌ক্তিতে ফুল যেন মানুষের অন্তরের বিকাশের প্রতিরূপ। আবার ‘নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগল’—পঙ্‌ক্তিতে ফুল হয়ে ওঠে আবেগের বিস্ফোরণ, প্রেম ও উচ্ছ্বাসের রূপক।রবীন্দ্রনাথের বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু ফুলকে কবিতায় স্থান দেননি, সেই সঙ্গে তাদের নতুন পরিচয়ও দিয়েছেন। বিদেশি নামের কাঠিন্য বা অপরিচিতির পরিবর্তে তিনি বাংলা ভাষার মাধুর্যে তাদের নতুন নামকরণ করেছেন। যেমন- Bougainvillea glabra নামক ফুলটির নাম তিনি দেন ‘বাগানবিলাস’। এই নামের মধ্যেই ফুটে ওঠে ফুলটির রঙিন, উৎসবমুখর আবেদনময়তা এবং বাগানকে সজ্জিত করার ক্ষমতা। আবার Allamanda cathartica-কে তিনি নাম দেন ‘অলকানন্দা’—যার মধ্যে রয়েছে স্বর্গীয় স্রোতের ইঙ্গিত, যা ফুলটির উজ্জ্বল হলুদ রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। Cassia fistula, যা আমাদের দেশে সোনালু নামে পরিচিত, তাকে তিনি ‘অমলতাস’ নামে অভিহিত করেন। নামটি হিন্দি শব্দের সঙ্গে মিল থাকলেও রবীন্দ্রনাথের ব্যবহারে তা হয়ে ওঠে আরও কাব্যময়। বসন্তের শেষে ঝুলন্ত সোনালি ফুলের এই গাছ তাঁর কাছে ছিল প্রকৃতির এক অনন্য অলংকার। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় রং ছিল নীল এবং সেই ভালোবাসার প্রতিফলন দেখা যায় Petria volubilis ফুলটির নামকরণে। তিনি একে নাম দেন ‘নীলমণি লতা’—যেন নীল রঙের মণির মালা গাছে ফুটে আছে। এই নামের সঙ্গে তিনি একটি কবিতাও রচনা করেন, যেখানে ফুলটি হয়ে ওঠে দূরের দূতী, নতুন বার্তার বাহক। আরও পড়ুনছোটগল্প ‘দাফন’: দায়বদ্ধতা ও সমাজ বাস্তবতা  Quisqualis indica ফুলটিকে তিনি ‘মধুমঞ্জরি’ নামে অভিহিত করেন। এই নামের মধ্যে রয়েছে মাধুর্য ও স্নিগ্ধতার ছোঁয়া। তিনি নিজেই লিখেছেন কীভাবে একটি অজানা ফুলকে তিনি নিজের মতো করে নাম দিয়ে আপন করে নিয়েছেন। তাঁর কাছে নামকরণ ছিল শুধু ভাষাগত প্রতিচ্ছবি নয়, পাশাপাশি এক ধরনের আত্মীকরণ। Clematis gourian ফুলটির নাম তিনি দেন ‘তারাঝরা’—যেখানে ফুলের সাদা রূপ ও সুগন্ধ যেন রাতের আকাশ থেকে ঝরে পড়া তারার মতো মনে হয়। এই নামকরণে দৃশ্যকল্প ও কল্পনার অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। Gloriosa superba, যা স্থানীয়ভাবে উলটচন্ডাল বা কাকমারা ফুল নামে পরিচিত, তাকে তিনি ‘অগ্নিশিখা’ নাম দেন। এই নামের মধ্য দিয়ে তিনি ফুলটির আগুনের শিখার মতো রূপকে তুলে ধরেছেন এবং কদর্য নামকে রূপান্তর করেছেন নতুন অবয়বে। Magnolia grandiflora-কে তিনি নাম দেন ‘উদয়পদ্ম’—যেখানে ফুলের প্রস্ফুটনকে সূর্যোদয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই নামকরণে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মিক সংযোগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও অনেক ফুলের নামকরণ করেছেন, যেমন- আকাশমণির ফুলকে ‘সোনাঝুরি’, মাদারকে ‘পারিজাত’, বনফুলকে ‘বনপুলক’, ‘বনজোৎস্না’, ‘পলক জুঁই’ ইত্যাদি। এ নামগুলো শব্দের বিপরীতে একেকটি কাব্যিক চিত্র। আরও পড়ুনআবৃত্তি মানসিক বিকাশের শক্তিশালী মাধ্যম  রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মে ফুলের উপস্থিতি শুধু কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর উপন্যাস ‘মালঞ্চ’ মূলত একটি বাগানকেন্দ্রিক কাহিনি, যেখানে গাছপালা ও ফুল মানুষের সম্পর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ছোটগল্প ‘বলাই’তে একটি শিমুলগাছের প্রতি এক শিশুর ভালোবাসা ফুটে উঠেছে, যা লেখকের নিজস্ব অনুভূতিরই প্রতিফলন। তাঁর প্রবন্ধ, চিঠিপত্র ও নাটকেও ফুল ও গাছপালার উল্লেখ রয়েছে। ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে তিনি প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছেন। আবার ‘সহজ পাঠ’র মাধ্যমে শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত করে তুলেছেন সহজ ভাষায়। শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রকৃতিপ্রীতিকে বাস্তব রূপ দেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গাছ লাগান এবং বৃক্ষরোপণ উৎসবের সূচনা করেন। তাঁর উদ্যোগে ‘বর্ষামঙ্গল’, ‘বৃক্ষরোপণ’ ও ‘হলকর্ষণ’ উৎসব চালু হয়, যা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে দৃঢ় করে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ফুল প্রকৃতির একটি অংশ হিসেবে আবির্ভাব ঘটে এবং মানবমনের অনুভূতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দেয়। তাঁর দেওয়া ফুলের নামগুলো বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আমাদের প্রকৃতিকে নতুন করে দেখার দৃষ্টি দিয়েছে। আজকের দিনে যখন মানুষ প্রকৃতি থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে; তখন রবীন্দ্রনাথের এই প্রকৃতিপ্রীতি আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাঁর মতো করে যদি আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখি, তবে হয়তো আমাদের চারপাশের এই সুন্দর পৃথিবীকে আরও যত্নে রক্ষা করতে পারবো। এসইউ

Go to News Site