Somoy TV
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ড্রোনের পাল্টা আঘাতে কাতারে থাকা আমেরিকার এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের লংরেঞ্জ রাডার ধ্বংসের মাধ্যমে যে ক্ষতির সূচনা হয়েছিল তার মাশুল এখন পর্যন্ত দিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার সেনাবাহিনী। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতে সামরিক অভিযান যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট, এই যুদ্ধ শুধু ইরানের জন্য নয়, আমেরিকাকেও এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। ট্রাম্প যতই লুকানোর চেষ্টা করুন না কেন আমেরিকা যে আঘাত পেয়েছে তার আর্থিক মূল্য তো বিরাট, এর প্রভাবও সুদূরপ্রসারী।একটা প্রশ্ন আরও জোরে উঠছে এই যুদ্ধের দাম কে দিচ্ছে? আর কতটা দিচ্ছে আমেরিকা? অফিসিয়াল ব্রিফিংয়ে আমেরিকা ক্ষতির সংখ্যা সীমিত দেখানো হলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট বলছে, “বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান এতটাও কম না যতটা ট্রাম্প ফাঁকা বুলি উড়াচ্ছেন”। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আর্থিক ক্ষতির দিক থেকেও দুই পক্ষই বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। মার্কিন সামরিক অবকাঠামো, জরুরি অপারেশন ও ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামতে প্রায় ২.৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। এছাড়া যুদ্ধে মোট খরচ ছাপিয়ে গেছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ২১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির কারণ হতে পারে । যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন সৈন্যদের আহত নিহত হওয়ার যে সংখ্যা প্রকাশ পাচ্ছে তা পেন্টোগনের প্রকাশ করা আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট থেকে অনেক বেশি। অনেকের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রকৃত তথ্য গোপন করছে। ১. কতজন মার্কিন সেনা মারা গেছে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন! এই যুদ্ধে আমেরিকা কতজন সেনা হারিয়েছে? পেন্টাগনের আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছে আর্মি, এয়ারফোর্স এবং ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা। তবে সব মৃত্যুর কারণ এক নয়। কিছু সেনা সরাসরি ইরানি হামলায় নিহত হয়েছেন, আবার কিছু ঘটনাকে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরের দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করছে আমেরিকা।কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিকল্প ও স্বাধীন কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ১৩ থেকে ১৫-এর মধ্যে হতে পারে। অর্থাৎ, অফিসিয়াল সংখ্যা আর বিকল্প দাবির মধ্যে এখনো রয়ে গেছে প্রশ্নের জায়গা।২. আহতের সংখ্যা কত? পেন্টাগনের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪০০-এর বেশি মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছে আর্মির ২৭১ জন সদস্য। এছাড়া নেভির ৬৪ জন, মেরিন কর্পসের ১৯ জন, এবং এয়ারফোর্সের ৪৬ জন সদস্য আহত হয়েছেন।কিন্তু এখানেও রয়েছে বিতর্ক। স্বাধীন কিছু রিপোর্ট বলছে, প্রকৃত আহতের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৭৫০-এর মধ্যে হতে পারে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে বিস্ফোরণে আঘাত, বিস্ফোরক বোমার টুকরোর আঘাত এবং আঘাতজনিত মস্তিষ্কের জখম-এর মতো জটিল আঘাতগুলো প্রাথমিক রিপোর্টে পুরোপুরি উঠে আসেনি, এমন অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি সংখ্যা যেখানে ৪০০-এর কথা বলছে, বিকল্প বিশ্লেষণ সেখানে আরও বড় ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ৩. সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হওয়া মানে শুধু একটি মেশিন হারানো নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় বিপুল অর্থ, প্রযুক্তি এবং দীর্ঘদিনের সামরিক বিনিয়োগ। রিপোর্ট অনুযায়ী, যদি একটি এফ-১৫ই শ্রেণির ফাইটার জেট ভূপাতিত হয়, তাহলে এর একক মূল্য প্রায় ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বছরে আনুমানিক ১৮ থেকে ২৪টি এফ-১৫ইএক্স তৈরি করতে সক্ষম হলেও, প্রতিটি ক্ষতি তাদের উৎপাদন ও অপারেশনাল পরিকল্পনায় বড় চাপ তৈরি করে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত চারটি এফ ১৫ যুদ্ধবিমান হারিয়েছে আমেরিকা। অন্যদিকে এ-১০ ওয়ার্থগ হলো এমন একটি বিমান, যা এখন আর নতুন করে উৎপাদন করা হয় না। ফলে একটি এ-১০ হারানো মানে সেটি আর সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতায় স্থায়ী ঘাটতি তৈরি করে। এছাড়া কেসি-১৩৫ ট্যাংকার এর পরিবর্তে বর্তমানে কেসি-৪৬ পেগাসাস ব্যবহার করা হচ্ছে, যার একটির মূল্য প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। বোয়িং বছরে সীমিত সংখ্যক। প্রায় ১৫ থেকে ১৮টি ট্যাংকার সরবরাহ করতে পারে, ফলে এই ধরনের ক্ষতি দ্রুত পূরণ করা কঠিন। সবচেয়ে বড় কৌশলগত ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয় বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি (এডব্লিউএসিএস) বিমান। এর ঐতিহাসিক মূল্য প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ডলার হলেও বর্তমান হিসাবে এটি ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি সমমূল্যের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মডেলটি এখন আর উৎপাদনে নেই। অর্থাৎ একটি ধ্বংস হলে সরাসরি নতুন করে তৈরি করা সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে, যদি এই ক্ষতির রিপোর্টগুলো সত্যি হয়, তাহলে শুধু কয়েকটি যুদ্ধবিমান হারানোর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ৮০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু অর্থ নয়। এই বিমানগুলোর সঙ্গে হারিয়ে যায় অভিজ্ঞ পাইলট, ক্রু এবং অপারেশনাল দক্ষতা, যা টাকা দিয়ে দ্রুত পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। ৪. নৌবাহিনীর ক্ষতি যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গাগুলোর একটি হলো নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী। এমনই একটি ঘটনায় ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড-এ আগুন লাগার পর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। ঘটনার ফলে জাহাজের ভেতরে থাকা কয়েকজন নাবিক আহত হন এবং আরও অনেকেই ধোঁয়ার কারণে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও এই ধরনের ঘটনা যুদ্ধজাহাজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অপারেশনাল প্রস্তুতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে, রণতরীটিকে সাময়িকভাবে যুদ্ধ মিশন স্থগিত করতে হয় এবং রিপেয়ার ডক-এ পাঠানো হয় মেরামতের জন্য। ফলে নির্ধারিত সামরিক অপারেশন ব্যাহত হয় এবং নৌবাহিনীর মোতায়েন কৌশলেও প্রভাব পড়ে। যদিও এই ঘটনা সরাসরি ইরানি হামলার ফল ছিল না, তবুও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল লস। কারণ একটি বিমানবাহী রণতরী সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়া মানে পুরো যুদ্ধক্ষেত্রের শক্তি ভারসাম্যে প্রভাব ফেলা। ৫. অর্থনৈতিক ক্ষতি এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু মাঠের যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় ধাক্কা লেগেছে অর্থনীতিতেও। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধ ব্যয় ইতোমধ্যেই কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিদিনের এমিউনিশন খরচ, বিমান হামলার অভিযান ব্যয় এবং উন্নত অস্ত্র ব্যবহারের ব্যয়। একই সঙ্গে, দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে তাদের প্রিসিশন মিসাইল স্টকপাইল-এ, যা দ্রুত ব্যবহার হওয়ায় ভবিষ্যৎ যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে, এই সংঘাতের একটি বড় অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা গেছে বৈশ্বিক তেল বাজারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, শিপিং রুটে বিঘ্ন ঘটে এবং বৈশ্বিক সাফ্লাই চেইন–এ চাপ সৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে, • সেনা হতাহত বেড়েছে • ইকসপেনসিভ ওয়েপনজ স্টকপাইল কমেছে • আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি ঝুঁকিতে পড়েছে • নৌ ও বিমান সক্ষমতায় চাপ তৈরি হয়েছে • দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যুদ্ধ এখনও শেষ না হলেও এত অভিঘাত এতটাই লেগেছে আমেরিকার গায়ে, যে এর অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। যেখানে হয়তো ক্ষতি লুকিয়েও পার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই ট্রাম্পের সামনে।
Go to News Site