Somoy TV
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার এক হতদরিদ্র পরিবারের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর ভালোবাসার প্রতীক ছিলেন দিপালী আক্তার। সেই দিপালীই এবার ফিরলেন নিজ গ্রামে— তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দী নিথর দেহ হয়ে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিহত এই প্রবাসী নারীর মরদেহ শুক্রবার সকালে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকের মাতমে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।শুক্রবার (৮ মে) সকাল ১০টায় চরভদ্রাসন উপজেলার চর হরিরামপুর ইউনিয়নের চরশালেপুর পূর্ব মুন্সিরচর গ্রামে জানাজা শেষে বাড়ির পাশেই দাফন করা হয় দিপালী আক্তারকে।এর আগে, বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাত ১১টা ২০ মিনিটে সরকারি ব্যবস্থাপনায় তার মরদেহ দেশে আনা হয় এবং রাতেই পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৮ এপ্রিল রাতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের হামারা এলাকায় ইসরায়েলি বোমা হামলায় গৃহকর্তার পরিবারের আরও ছয় সদস্যের সঙ্গে নিহত হন দিপালী আক্তার (৩৪)।ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে ২০১১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে লেবাননে পাড়ি জমান দিপালী। প্রবাস জীবনের কঠোর পরিশ্রমে শুধু নিজের নয়, বদলে দিয়েছিলেন পুরো পরিবারের ভাগ্য। তার পাঠানো অর্থে বোনদের বিয়ে, ভাইদের কর্মসংস্থানসহ সংসারে আসে স্বচ্ছলতা। পরিবারের জন্য নিজের সংসারও গড়েননি তিনি।শুক্রবার সকালে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কফিন জড়িয়ে ধরে আহাজারি করছেন স্বজনরা। কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, কেউবা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। পুরো গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহত দিপালীর ছোট বোন লাইজু আক্তার বলেন, ‘ছোট বয়সে মা মারা যান। এরপর সংসারের হাল ধরতে দিপালী আপা ২০১১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে লেবানন যান। তার পাঠানো টাকায় আমাদের (বোনদের) বিয়ে দেয়া হয়। ভাইদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।’আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে নিহত দীপালীর মরদেহ গ্রহণ করে যা বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীতিনি আরও বলেন, ‘আপা আমাদের জন্য বিয়ে পর্যন্ত করেনি। আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছে আপা। ২০১৮ সালে একবার দেশে আসেন আপা। এরপর সবশেষ ২০২৪ সালে দেশে এসে কিছুদিন থেকে পুনরায় লেবানন চলে যান। মারা যাওয়ার আগের দিন কথা হয় আপার সঙ্গে। সরকারকে ধন্যবাদ জানাই, আপার মরদেহ দ্রুত দেশে আনার জন্য।’নিহত দিপালীর ছোট বোন লাইজু আক্তার বলেন, ‘আপা আমাদের জন্য নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেছে। আমাদের বিয়ে দিয়েছে, ভাইদের কাজের ব্যবস্থা করেছে। নিজের বিয়েও করেনি। মারা যাওয়ার আগের দিনও কথা হয়েছিল আপার সঙ্গে।’তিনি আরও জানান, ২০১৮ সালে একবার দেশে এসেছিলেন দিপালী। পরে ২০২৪ সালে কয়েক মাস দেশে থেকে আবার লেবাননে ফিরে যান। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যেই বোমা হামলায় প্রাণ হারান তিনি।চর হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। দিপালীর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তার পরিবারের পাশে ইউনিয়ন পরিষদ থাকবে।’চরভদ্রাসন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জায়েদ হোসাইন জানান, সরকারের পক্ষ থেকে মরদেহ দেশে আনা ও দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি নিহতের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে।প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার ফরিদপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আশিক ছিদ্দিকী বলেন, ‘দ্রুত মরদেহ দেশে আনতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে গ্রামে মরদেহ পরিবহন ও জানাজার খরচ বাবদ পরিবারকে ৩৫ হাজার টাকার চেক দেয়া হয়েছে। এছাড়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে আরও তিন লাখ টাকা সহায়তা দেয়া হবে।’নিহত দিপালী আক্তার ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন উপজেলার চর হরিরামপুর ইউনিয়নের চরশালেপুর পূর্ব মুন্সিরচর গ্রামের মোফাজ্জেল শেখের মেয়ে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ সন্তান।
Go to News Site